বাংলাদেশের নগরায়ণে বিদেশি মডেলের অন্ধ অনুকরণ না করে দেশের ভূপ্রকৃতি, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন দর্শন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। এ জন্য পুকুর, উঠান, খেলার মাঠ ও পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রগুলো সংরক্ষণ এবং আধুনিক নগর পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিশ্ব শহর দিবস উপলক্ষে অনলাইনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বক্তারা।
‘বাংলাদেশের নগরায়নের উন্নয়ন দর্শন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তারা বলেন, বাংলাদেশের শহরগুলোকে সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, টোকিও, লন্ডন কিংবা নিউইয়র্কের আদলে গড়ে তোলার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। নগর উন্নয়নের সাফল্য শুধু বহুতল ভবন, প্রশস্ত সড়ক, উড়ালসড়ক কিংবা আবাসন প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না। বরং শহর কতটা বাসযোগ্য, পরিবেশবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক, তা দিয়ে উন্নয়নের মান নির্ধারণ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাড়া-মহল্লা, পুকুর, উঠান ও খেলার মাঠ একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এসব জায়গা শুধু বসবাস কিংবা বিনোদনের জন্য নয়, মানুষের পারস্পরিক পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগ, সহযোগিতা এবং শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবেও ভূমিকা রাখত।
কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট, উন্মুক্ত স্থান দখল এবং বিচ্ছিন্ন আবাসনব্যবস্থার বিস্তারে এসব সামাজিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, আমাদের নগরায়ণ দর্শন হতে হবে বাংলাদেশের মাটি, পানি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা কেন এমন শহর গড়ে তুলতে পারব না, যেখানে আধুনিক অবকাঠামোর পাশাপাশি পুকুর থাকবে, শিশুদের খেলার মাঠ থাকবে, মানুষের মিলনস্থল থাকবে এবং প্রতিবেশীরা একে অপরকে চিনবে? উন্নয়ন মানে শুধু বহুতল ভবন নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জন্য একটি সুস্থ ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করা।
আরও পড়ুন:
তিনি বলেন, পরিকল্পনাহীন ও বিচ্ছিন্ন আবাসনব্যবস্থা নগরের সামাজিক যোগাযোগ দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে কিছু আবাসিক কমপ্লেক্সে শ্রেণিভিত্তিক বিচ্ছিন্নতা, জনপরিসরে সীমিত প্রবেশাধিকার এবং বাইরের সমাজের সঙ্গে কম যোগাযোগের প্রবণতা দেখা যায়।
অন্যদিকে, খেলার মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান কমে যাওয়ায় শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। পাশাপাশি বসবাস করেও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেশীদের মধ্যে পরিচিতি ও যোগাযোগ গড়ে উঠছে না। শিশু-কিশোরদের জীবন ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং ও ডিজিটাল পর্দার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়লে খেলাধুলা, দলগত কর্মকাণ্ড, নেতৃত্ব, সহযোগিতা ও বিরোধ মীমাংসার মতো সামাজিক দক্ষতা বিকাশের সুযোগ কমে যায়।
আইপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, কিশোর গ্যাং ও কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা কমাতে নিরাপদ খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, স্থানীয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং ইতিবাচক সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এ কারণে নগর পরিকল্পনাকে শুধু অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় হিসেবে না দেখে সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের নগরায়ণে ‘পুকুর-উঠান-পাড়াভিত্তিক নগরায়ণ’ ধারণাকে আধুনিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে আইপিডি। এ ধারণায় পুকুর ও জলাশয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং পানি ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রাখবে। উঠান, কমিউনিটি স্পেস ও উন্মুক্ত স্থান হবে মানুষের সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্র। আর পাড়া-মহল্লাভিত্তিক পরিকল্পনা স্থানীয় পরিচয়, নাগরিক অংশগ্রহণ ও প্রতিবেশীদের সম্পর্ক শক্তিশালী করবে।
আইপিডির মতে, এ প্রস্তাব অতীতের নগরব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার আহ্বান নয়। বরং ঐতিহ্যের ইতিবাচক উপাদানগুলোকে আধুনিক, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ।
অনুষ্ঠানে আইপিডির উপদেষ্টা অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, শুধু মোট দেশজ উৎপাদন বা বড় অবকাঠামো নির্মাণকে নগরায়ণ বলা যায় না। প্রকৃত নগরায়ণ হতে হবে মানুষের কল্যাণে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হবে।
তিনি বলেন, নগর এলাকায় পাড়া, প্রতিবেশী ব্লক ও শহরের বিভিন্ন স্তরে নাগরিক সুবিধার সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন বিকেন্দ্রীকরণে অর্থনৈতিক করিডোরভিত্তিক উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন এই পরিকল্পনাবিদ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, নগর উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট দর্শনের পরিবর্তে ব্যবসায়িক ও গোষ্ঠীস্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে শহরগুলো ক্রমেই বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। ময়মনসিংহের মতো মাঝারি ও দ্বিতীয় পর্যায়ের শহরেও এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আবাসিক এলাকাগুলো এখন অনেক ক্ষেত্রে শুধু ঘুমানোর জায়গায় পরিণত হয়েছে। অথচ নগর পরিকল্পনার দর্শন অনুযায়ী, এসব এলাকা প্রাণবন্ত ও কমিউনিটিভিত্তিক হওয়ার কথা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের শিক্ষক মুহাম্মদ উল্লাহ নগরের ন্যায়বিচারের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নগরের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে পুঁজি, নিখুঁত নকশা কিংবা মানুষের অংশগ্রহণ নয়। মানুষের সুখ ও কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নগরের প্রকৃত যাত্রা এখনো শুরু হয়নি।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশে নগরবাসীর জীবনমান উন্নত বলে মনে হতে পারে। নগরকে অর্থনীতি ও উন্নত জীবনের কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে মানবিক নগর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে নগর উন্নয়নের মূল লক্ষ্য নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে আইপিডির রিসার্চ ফেলো অধ্যাপক ফরহাদুর রেজা বলেন, উন্নয়নকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির আলোচনাকেই উন্নয়ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে প্রকৃত উন্নয়নের বিষয়গুলো আড়ালে থেকে যায়। তিনি নগরের সব জায়গায় সাধারণ মানুষের অধিকার এবং জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান।
প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ সজীব বলেন, নগরায়ণ মানেই নতুন নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়। মানুষ যেখানে বসবাস করছে, সেখানেই প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা নগরায়ণের অন্যতম প্রধান শর্ত। নগরের প্রতিটি মানুষের এসব সুবিধা সহজে পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে।
আইপিডির রিসার্চ ফেলো কে এম আসিফ ইকবাল আকাশ বলেন, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, জলাভূমি ও উন্মুক্ত স্থান ধ্বংস এবং কর্মসংস্থানের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন নগর সংকটকে আরও গভীর করছে।
ভূমি পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে নগরের ওপর সামগ্রিক চাপ কমানোর বিষয়ে বক্তব্য দেন পরিকল্পনাবিদ জিনিয়াস জান্নাত। তিনি বলেন, সঠিক নীতি ও পরিকল্পনা থাকলে সরকারকে অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি উদ্যোগ নিতে বা বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয় না।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়ের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসে। পরিকল্পনাবিদ কাজী তাসনিয়া তাবাসসুম বলেন, বড় পরিকল্পনা মানেই বড় অবকাঠামো নির্মাণ নয়। সব মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত পরিকল্পনা গড়ে তোলাই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
অনুষ্ঠানে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করতে ছয়টি সুপারিশ তুলে ধরে আইপিডি। সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু, সংস্কৃতি, সামাজিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে জাতীয় নগরায়ণ নীতি ও পরিকল্পনায় মানবিক নগরায়ণের দর্শন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
পুকুর, খাল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা চিহ্নিত করে সেগুলোর আইনগত সুরক্ষা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে এসব সম্পদের ব্যবস্থাপনায় পাড়া-মহল্লার বাসিন্দাদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন আবাসন প্রকল্পে শিশুদের খেলার জায়গা, উন্মুক্ত স্থান, কমিউনিটি স্পেস, হাঁটার পথ ও সামাজিক যোগাযোগের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দিয়েছে আইপিডি। পাশাপাশি পুরনো আবাসিক এলাকায় এসব সুবিধা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের প্রাপ্যতা মূল্যায়ন করে ঘাটতি নিরূপণ এবং শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য খেলার জায়গা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। আবাসন পরিকল্পনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহাবস্থান, জনপরিসরে প্রবেশাধিকার ও প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ রাখার কথাও বলেছে সংস্থাটি।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে শিশু-কিশোরদের জন্য নিয়মিত খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক উদ্যোগ পরিচালনার সুপারিশ করা হয়েছে।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের নগরায়ণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা জমির অর্থনৈতিক মূল্য বৃদ্ধিকে প্রাধান্য দিলে চলবে না। নগর পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে মানুষ, প্রকৃতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ।
একটি শহরে কতগুলো বহুতল ভবন নির্মিত হয়েছে, তার পাশাপাশি কত শিশু নিরাপদে খেলতে পারে, কত মানুষ সবুজ ও উন্মুক্ত স্থানে যাওয়ার সুযোগ পায় এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে কতটা সামাজিক যোগাযোগ রয়েছে, সেগুলোকেও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করতে হবে বলে মত দেন তারা।
এএইচ/এসআই




