শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

পেট্রোবাংলায় নতুন কর্মকর্তাদের মুনাফা বঞ্চিত করার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম

শেয়ার করুন:

পেট্রোবাংলায় নতুন কর্মকর্তাদের মুনাফা বঞ্চিত করার অভিযোগ
পেট্রোবাংলা। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) অধীন একাধিক কোম্পানিতে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বার্ষিক মুনাফার অংশ থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুনাফা বণ্টনে নতুন ব্যাচের কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, বাংলাদেশ শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলেও নানা অজুহাতে তাদের প্রাপ্য অর্থ দেওয়া হচ্ছে না।

এ নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (পিজিসিএল) কর্মকর্তারা কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন। গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) ৪৭ কর্মকর্তা নিয়েছেন আইনি মতামত। এ ছাড়া পেট্রোবাংলার অধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড (বাপেক্স), সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল), কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) ও বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডসহ (বিজিডিসিএল) কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কোম্পানিভেদে মুনাফা পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে ভিন্ন ব্যাখ্যা অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ বলছেন, এ ক্ষেত্রে আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কোম্পানিগুলো শ্রম আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করেই মুনাফা বণ্টন করে থাকে।

পিজিসিএলে আইনি নোটিশ, ১৫ দিনেও সমাধান হয়নি

পিজিসিএলে নতুন কর্মকর্তাদের মুনাফার অংশ থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগটি স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। কোম্পানিটিতে নিরীক্ষা ও বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) সম্পন্ন হওয়ার আগেই গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি কর্মকর্তাদের মধ্যে আগাম মুনাফার অর্থ বণ্টন করা হয়। তবে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর কোম্পানিতে যোগ দেওয়া নতুন ব্যাচের কর্মকর্তাদের ওই বণ্টনের বাইরে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

এ অবস্থায় নিজেদের প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করতে প্রথমে উচ্চ আদালতের একজন আইনজীবীর কাছ থেকে আইনি মতামত নেন কর্মকর্তারা। পরে গত ১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. লিয়াম রহমতুল্লাহর মাধ্যমে কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়।

নোটিশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর পিজিসিএলে যোগ দেন। তাদের চাকরির ছয় মাস পূর্ণ হওয়ায় ২০২৬ সালের ২৩ মে তারা স্থায়ী হন। নোটিশে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২৪১(২) ধারা উল্লেখ করে বলা হয়, কর্মকর্তারা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিলের অর্থ পাওয়ার যোগ্য।

নোটিশে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিলের অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে। ওই তারিখের আগেই কর্মকর্তারা প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেছেন। তারপরও তাদের প্রাপ্য অর্থ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে নোটিশে অভিযোগ করা হয়।

এতে নোটিশ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তহবিলের সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে অর্থ পুনর্বণ্টন এবং এ বিষয়ে অবহিত করার দাবি জানানো হয়। অন্যথায় প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।

নোটিশে প্রেরক হিসেবে পিজিসিএল অফিসার্স ব্যাচ ২০২৫-২৬-এর কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রাপকের তালিকায় রয়েছেন কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এম তারিকুল ইসলাম, পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এস এম ওয়ালিউর রহমান এবং ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবুল হোসেন।

তবে নোটিশে নির্ধারিত ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও নতুন কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করে মুনাফা পুনর্বণ্টন করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পিজিসিএলের একজন বঞ্চিত কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা সাক্ষাৎ করতে গেলে তাঁরা আমাদের জানান, ‘আপনারা আইনে প্রাপ্য হলে পাবেন।’পরবর্তী সময়ে আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী আমরা প্রাপ্য হওয়া সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ আইন ও বিধিমালার তোয়াক্কা না করে এবং পূর্ণাঙ্গ হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন না করেই প্রফিট শেয়ারের অর্থ অগ্রিম গ্রহণ করেছেন। এর ফলে সদ্য যোগদানকারী ৪০ জন কর্মকর্তা ডব্লিউপিপিএফের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।’

পিজিসিএলের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করার জন্য কর্তৃপক্ষকে অনেক কূটকৌশল, অনেক গোপনীয়তার আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এটা দেখে আমরা একইসাথে বিস্মিত, হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছি। আইনকে পাশ কাটিয়ে শুধু গায়ের জোরে আমাদের বঞ্চিত করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। একজন নতুন অফিসার চাকরির শুরুতে একটা ভালো অংকের বোনাস পেলে তার জীবন গুছিয়ে নেওয়া অনেক সহজ হবে। সেখানে কর্মচারী ইউনিয়ন দ্বারা একরকম ভয় দেখিয়ে, হুমকি-ধামকি দিয়ে, ছলাকলা-প্রতারণার মধ্য দিয়ে নতুন অফিসারদের পাওনা টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।’

আইনের ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্ক

মুনাফা বণ্টনের যোগ্যতা নির্ধারণে শ্রম আইন ও শ্রম বিধিমালার কোন বিধান কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার পার্থক্য রয়েছে।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২৩৩(১)(ঝ) ধারায় সুবিধাভোগী নির্ধারণে শিক্ষানবিশকালসহ কোনো কোম্পানিতে অন্তত নয় মাস চাকরিতে নিয়োজিত থাকার শর্ত উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে একই আইনের ২৪১(২) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো হিসাব বছরে কোনো সুবিধাভোগী সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে অন্তত ছয় মাস চাকরি পূর্ণ না করলে তিনি ওই বছরের জন্য তহবিলে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।

অর্থাৎ, সুবিধাভোগী হিসেবে গণ্য হওয়ার জন্য নয় মাসের শর্ত এবং নির্দিষ্ট হিসাব বছরে তহবিলে অংশগ্রহণের জন্য ছয় মাসের শর্ত—দুটি পৃথক বিধান।

বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫-এর ২৩৩ বিধিতে তহবিলের অর্থ বণ্টনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, তহবিলে লভ্যাংশ স্থানান্তরের তারিখে যাদের চাকরির মেয়াদ নয় মাস পূর্ণ হয়েছে, তাদের মধ্যে পদমর্যাদা নির্বিশেষে নির্ধারিত অর্থ বণ্টন করতে হবে। বিধিটির ভাষা অনুযায়ী, নয় মাসের চাকরির শর্তটি অর্থবছরের ৩০ জুনের মধ্যে পূর্ণ হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে বলা নেই; বরং তহবিলে লভ্যাংশ স্থানান্তরের তারিখের কথা উল্লেখ রয়েছে।

পিজিসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর চাকরিতে যোগ দেন। তাদের নয় মাস পূর্ণ হয় ২০২৬ সালের ২৩ আগস্ট। কোম্পানিটির ক্ষেত্রে তহবিলে অর্থ স্থানান্তরের তারিখ হিসেবে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর কথা আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, নোটিশে বর্ণিত তারিখগুলো অনুযায়ী তহবিলে অর্থ স্থানান্তরের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরির মেয়াদ নয় মাস পূর্ণ হয়েছিল।

পিজিসিএল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

মুনাফা বণ্টন নিয়ে আইনের ব্যাখ্যা ও আইনি নোটিশের জবাব সম্পর্কে জানতে পিজিসিএল ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবুল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অন্যদিকে পিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম তারিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিষয়টা এখন আদালতে গিয়েছে। আদালত আর ট্রাস্টি বোর্ড দেখবে। এটা ম্যানেজম্যান্টের কোনো কাজ না।’

জিটিসিএলে ৪৭ কর্মকর্তার একই অভিযোগ

পেট্রোবাংলার আরেক প্রতিষ্ঠান জিটিসিএলেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানিটির ৪৭ জন নতুন কর্মকর্তাকে মুনাফা বঞ্চিত করার অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ করছেন নতুন কর্মকর্তারা। তারাও ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর যোগদান করেন।

মুনাফা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় তার কয়েক মাস আগে সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীর আইনি মতামত নিয়েছেন। আইনজীবী আবদুল্লাহিল মারুফ ফাহিমের দেওয়া ওই মতামতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরিতে যোগদানের তারিখ, শ্রম আইন এবং শ্রম বিধিমালার প্রাসঙ্গিক বিধান পর্যালোচনা করা হয়েছে।

Petro2

মতামতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর ২৪১(২) ধারা অনুযায়ী কোনো হিসাব বছরে অন্তত ছয় মাস চাকরি পূর্ণ করা সুবিধাভোগীরা ওই বছরের তহবিলে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করেন। সংশ্লিষ্ট ৪৭ কর্মকর্তা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাত মাসের বেশি চাকরি করেছেন। এ কারণে মতামতে তাদের ওই অর্থবছরের তহবিলের সুবিধাভোগী হওয়ার যোগ্য বলে অভিমত দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া শ্রম আইনটির ২৩৩(১)(ঝ) ধারা এবং শ্রম বিধিমালার ২৩৩ বিধি উল্লেখ করে মতামতে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নয় মাসের চাকরির শর্ত পূরণ হলে তাদের সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটিতে এখনো আগাম মুনাফা বণ্টন করা হয়নি বলে জানা যায়। তবে কর্মকর্তাদের দাবি, এর আগে ২০১৮ ও ২০২০ ব্যাচের কর্মকর্তারা ডিসেম্বর মাসে যোগদান করেও মুনাফা পাওয়ার নজির রয়েছে। এছাড়াও কোম্পানিতে যেসব কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার তাদের কয়েকজনকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। যেসব প্ল্যান্টে গত ৮-১০ বছরেও কোনো অফিসারের পোস্টিং হয়নি, সেখানে পর্যন্ত শাস্তিমূলক বদলি হয়েছে নতুন ব্যাচের অফিসারদের। এভাবে সম্পূর্ণ ব্যাচের হয়রানিমূলক বদলির মাধ্যমে মানসিক ও পারিবারিকভাবে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত করতে কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপ বলে অভিযোগ এসেছে।

জিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হারুন ভুঁইয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের এখানে এখনো বোর্ড মিটিং, এজিএম হয়নি। এজিএম হওয়ার পর এটা ফাইনাল হবে কারা পাবে, কারা পাবে না। এজিএমের পরে ওদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে। আমাদের ১৩টা কোম্পানি আছে, সব কোম্পানিই একই নীতিমালা অনুসরণ করবে। আমাদের এজিএম একটু দেরিতে হবে, অন্যান্য কোম্পানিগুলো কী করে আমরা দেখব; তারপর তাদের অনুসরণ করব। আমরা তাদের বঞ্চিত করার কোনো চিন্তাভাবনা করিনি, আমরা আমাদেরটা রেখে তাদেরটা আলাদা করে রাখব। বিষয়টি যেহেতু একেকজন একেকভাবে ব্যাখ্য করে থাকে তাই আমরা আগে অবজার্ভ করব, তারপর তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে। আমরা তাদের বঞ্চিত করব না, করলেও তা নিয়মতান্ত্রিকভাবে হবে। আমরা তাদের টাকা আলাদা করে রাখব, তারপর এ বছরটা শেষ হলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

অন্য কোম্পানিতেও বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ

অনুসন্ধানে পেট্রোবাংলার অধীন আরও কয়েকটি কোম্পানিতে নতুন ব্যাচের কর্মকর্তাদের মুনাফার অংশ থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও আগাম অর্থ বণ্টন করা হয়েছে, কোথাও অর্থ বণ্টনের আগেই নতুন কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডে (বাপেক্স) গত ২৯ সেপ্টেম্বর কর্মকর্তাদের জনপ্রতি দুই লাখ ২০ হাজার টাকা করে আগাম মুনাফা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে নতুন ব্যাচের কর্মকর্তারা ওই অর্থ পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর যোগ দেওয়া ২৩তম ব্যাচের কর্মকর্তারা মামলার মাধ্যমে মুনাফা পেয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডেও (জেজিটিডিএসএল) নতুন ব্যাচকে বঞ্চিত করার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে কোম্পানিটির নীতিনির্ধারকেরা জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী কর্মকর্তারা পাওয়ার যোগ্য হলে তাদের দেওয়া হবে। কোম্পানিটিতে এখনো মুনাফা বণ্টন করা হয়নি বলে জানা গেছে।

সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডে (এসজিএফএল) চলতি বছরের ১৪ ও ১৫ জুলাই কর্মকর্তাদের জনপ্রতি তিন লাখ টাকা করে আগাম মুনাফা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে নতুন ব্যাচের কর্মকর্তারা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই কোম্পানিতে আগের ব্যাচকে মুনাফা দেওয়ার নজির নেই বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে (কেজিডিসিএল) নতুন ব্যাচের কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানিটিতে জনপ্রতি প্রায় তিন লাখ টাকা মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও এখনো অর্থ বণ্টন করা হয়নি বলে জানা গেছে।

তবে কোম্পানিটির মহাব্যবস্থাপক (এডমিন) প্রকৌশলী নাহিদ আলম বলেন, ‘আমাদের এখানে এখনো এ ধরনের কোনো জটিলতা দেখা দেয়নি। নিয়ম অনুযায়ী অর্থবছরের মধ্যে ৬ মাস পূর্ণ হওয়া ও চাকরি স্থায়ী হওয়া সাপেক্ষে সবাই প্রফিটের অংশ পেয়ে থাকে। অন্যান্য কোম্পানির যারা অর্থবছরের মধ্যে ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার কথা বলছেন তা কিসের ভিত্তিতে বলছেন তা আমার জানা নেই।’

বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডেও (বিজিডিসিএল) নতুন কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়ার আলোচনা চলছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কোম্পানিটিতে জনপ্রতি দেড় লাখ টাকার বেশি মুনাফা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখনো আগাম অর্থ বণ্টন করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এর আগে ২০১৭ সালের একটি ব্যাচের কর্মকর্তারা ডিসেম্বরের ২০ তারিখে যোগ দিয়েও মুনাফা পেয়েছিলেন।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কোম্পানি লিমিটেডের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কোম্পানিটির জেনারেল ম্যানেজার (অ্যাডমিন) মো. সানা উল্লাহ এবং ডব্লিউপিপিএফ কমিটির প্রধান ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, অর্থবছরের নয় মাস পূর্ণ না হওয়ায় নতুন যোগদানকারী কর্মকর্তারা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ডব্লিউপিপিএফ তহবিলের সুবিধা পাবেন না।

ওই কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা তুলে ধরা হলেও তারা জানিয়েছেন, কোম্পানিতে এমন নিয়মের প্রচলন নেই। তার অভিযোগ, আইনকে উপেক্ষা করে নিজেদের পকেট ভারী করার উদ্দেশে নতুন কর্মকর্তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।

​​নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, সুন্দরবনের জনপ্রতি মুনাফা আনুমানিক ৭ লাখ টাকা। তিনি আরও জানান, সুন্দরবন নতুন কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে গত ৪ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে অ্যাডভান্স গ্রহণ করেছে। গত ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ বরাবর আইনি মতামত এবং ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখে আইনি নোটিস পাঠানো হয়েছে। এর জবাবে ম্যানেজমেন্ট জানিয়েছে যে তাদের অংশ সংরক্ষিত আছে এবং কোম্পানির প্যানেল আইনজীবীর মতামতে প্রাপ্যতার বিষয়টি নিশ্চিত হলে তাদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (এমজিএমসিএল) কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কোম্পানিটি লোকসানে রয়েছে। ফলে এবার কেউই মুনাফার অংশ পাবেন না। তবে তাদের দাবি, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর কোম্পানিতে যোগ দেওয়া আগের ব্যাচের কর্মকর্তারা পরের বছর নয় মাস পূর্ণ হওয়ার শর্তে মুনাফার সুবিধাভোগী হয়েছিলেন।

মুনাফা বণ্টনে অভিন্ন নীতিমালার প্রশ্ন

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলোর মুনাফা বণ্টনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা নির্ধারণে একই ব্যাখ্যা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। কোনো কোম্পানিতে নতুন কর্মকর্তারা সুবিধা পেলেও অন্য কোম্পানিতে একই সময়ে যোগ দেওয়া কর্মকর্তারা বাদ পড়লে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো যেন আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি কর্মকর্তার যোগ্যতা যাচাই করে। যারা নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেছেন, তাদের প্রাপ্য মুনাফার অংশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মুনাফা বণ্টনের নীতিমালা, অর্থ স্থানান্তরের তারিখ এবং সুবিধাভোগীদের তালিকা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) কে এম মিজানুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রশাসন) এস এম মাহবুব আলম ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানকে একাধিকবার ফোন দিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এসএইচ/জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর