শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

সোহরাওয়ার্দীতে যুবককে পিটিয়ে হত্যা, সূত্রপাত শিশু ওয়ার্ডে বসা নিয়ে

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম

শেয়ার করুন:

সোহরাওয়ার্দীতে যুবককে পিটিয়ে হত্যা, সূত্রপাত শিশু ওয়ার্ডে বসা নিয়ে
আলম শেখ হত্যা (ইনসেটে গ্রেফতার অয়ন)।
  • গ্রেফতার অয়ন নবজাতকের বাবা, বাকিরা অধরা
  • হত্যার আগে ব্যাপক মারধর করেন অয়ন
  • ফুটেজ থাকলেও অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা যায়নি
  • পুলিশ বলছে, বেশির ভাগই হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজন
  • নিহত আলম শেখ ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন

রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে শিশু চুরির চেষ্টার অভিযোগ তুলে আলম শেখ নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অয়ন নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় জড়িত অন্যরা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

এ ঘটনায় পুলিশ বলছে, ভিডিওতে যাদের দেখা যাচ্ছে, তাদের বেশির ভাগই রোগীর আত্মীয়স্বজন। ফলে তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে অন্যদের গ্রেফতারে চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে গ্রেফতার অয়ন নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।

অন্যদিকে নিহতের পরিবার বলছে, আলম শেখ ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। ফলে তিনি বাচ্চা চুরি করতে গিয়েছিলেন—এ অভিযোগ মিথ্যা। পরিবারের একটাই প্রশ্ন, এভাবে কি কেউ মানুষকে মারতে পারে?

বেডে বসা নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত

পুলিশ, জরুরি বিভাগ ও হাসপাতালের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার সূত্রপাত শিশু ওয়ার্ডের ভেতরে বাচ্চাদের বেডে বসা নিয়ে। ঘটনার রাতে নিহত আলামিন শেখ কারও অনুমতি ছাড়াই হাসপাতালের তিনতলায় থাকা শিশু ওয়ার্ডে ঢুকে পড়েন। এ সময় তিনি পুরো ওয়ার্ডে পায়চারি করতে থাকেন। একপর্যায়ে কয়েকটি বেডের কাছে গিয়ে বাচ্চাদের দেখতে থাকেন। এর মধ্যে কয়েকটি বেডে বসেও থাকেন তিনি।

আলামিন বাচ্চাদের কেউ না হলেও সেখানে তার অবস্থান নিয়ে ওয়ার্ডে থাকা লোকজনের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। কয়েকজন নারী দ্রুত বিষয়টি পুরুষদের জানালে প্রথমে ছুটে আসেন গ্রেফতার অয়ন। তিনি আলমকে নানা প্রশ্ন করতে থাকেন। একপর্যায়ে অয়ন তাকে ওয়ার্ডের বাইরে নিয়ে যান। এরপর সেখানে লোকজন জড়ো করেন। শুরু হয় আলামিন শেখকে একের পর এক প্রশ্ন করা। কিন্তু আলামিন কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। এতে তাকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে গুরুতর আহত আলামিন মারা যান। পরে তার মরদেহ হাসপাতালের লাশঘরে পাঠানো হয়।

গ্রেফতার অয়ন বেশি মারধর করেন

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় নিহত আলম শেখকে একটানা পেটাতে থাকেন গ্রেফতার অয়ন। তার মারধরের চোটে সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আলামিন শেখ। পরে হাসপাতালের আনসার সদস্যরা পুলিশকে বিষয়টি জানালে পুলিশ সেখানে যায়। এরপর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য লাশঘরে পাঠানো হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও এসআই রিমন মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, ঘটনার সময় অয়ন বেশি মারধর করেন। তিনি তা স্বীকারও করেছেন। এ বিষয়ে অয়নকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত আছে। তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে।

স্ত্রীকে সন্তান প্রসব করাতে এসে হত্যা মামলার আসামি

আলোচিত এ ঘটনায় গ্রেফতার অয়নের স্ত্রী একটি সন্তান প্রসব করেন। সেই নবজাতককে নিয়েই তারা হাসপাতালে ছিলেন। ঘটনার রাতে শিশু ওয়ার্ড থেকে আলম শেখকে বাইরে নিয়ে আসার পর অয়ন তাকে বেশি মারধর করেন।

এ বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও এসআই রিমন মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, এ ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার অয়নের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলায়। তিনি স্ত্রীকে সন্তান প্রসব করানোর জন্য হাসপাতালে এসেছিলেন। তার দুই-তিন দিনের একটি বাচ্চা আছে।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার দিন ভুক্তভোগী যুবক ওই ওয়ার্ডে গিয়ে বিভিন্ন সিটে বসছিলেন। এতে লোকজনের সন্দেহ হয়। পরে তাকে নিচে নামিয়ে প্রশ্ন করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। একপর্যায়ে অয়ন তাকে বেধড়ক মারধর করেন। সেই মারধরেই তার মৃত্যু হয়।

আলামিন ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন ও হার্ট অ্যাটাকের রোগী

পুলিশ ও নিহত আলামিনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলামিন ছিলেন মানসিক ভারসাম্যহীন। তার গ্রামের বাড়ি নাটোর জেলায়। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। এর আগে তিনি তিনবার হার্ট অ্যাটাক করেন। পরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ফলে কী বলতেন, কী করতেন, তার কোনো ঠিক ছিল না।

আরও পড়ুন: একের পর এক শিশু নিখোঁজ ও হত্যা, নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, আলামিনের গ্রামের বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়ায়। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে আলম শেখ ছিলেন দ্বিতীয়। বড় ভাই ইউসুফ মিরপুরে পরিবার নিয়ে থাকেন এবং রিকশা চালান। ছোট ভাই রাজমিস্ত্রি। আলম শেখও একসময় প্রায় ২০ বছর গার্মেন্টসে চাকরি করেছেন। এরপর তিনি তিনবার হার্ট অ্যাটাক করেন। পরে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। ফলে স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম করতে পারতেন না। আলামিন ছিলেন বিবাহিত। তার তিনটি সন্তান রয়েছে।

মৃত্যুর ১৫ দিন আগে ঢাকায় আসেন আলামিন

আলম শেখের বড় ভাই ইউসুফ জানান, তার ছোট ভাই ১৫ দিন আগে ঢাকায় এসে একটি বাসায় নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি নেন। সেখানে এক সপ্তাহ চাকরিও করেন। কিন্তু মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ার কারণে বাসার মালিক তাকে চাকরি থেকে বাদ দেন। এরপর আবারও একটি চাকরি পান। সেটিই করছিলেন তিনি।

আলম শেখ ঢাকায় আসার পর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য তাকে একটি বাটন ফোন দিয়েছিলেন বড় ভাই ইব্রাহীম। কিন্তু মৃত্যুর কয়েক দিন আগে ফোনটি হারিয়ে ফেলেন আলম শেখ। পরে অন্যের ফোন থেকে কল করে বিষয়টি বড় ভাইকে জানান। ঘটনার দিন আলম শেখের কাছে ফোন না থাকায় আর ভাইকে কল করতে পারেননি।

তার ভাই বলেন, মানুষ মানুষকে এভাবে মারতে পারে? আমার ভাইয়ের আসামিকে দেখার সময় তাকে এই কথাটা বলেছি। কিন্তু লোকটা চুপ ছিল। পরে পুলিশ স্যারেরা তাকে নিয়ে আদালতে চলে গেলেন।

এমআইকে/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর