বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

পুরান ঢাকায় বারবার আগুন, ঝুঁকি কমাতে নেই কার্যকর উদ্যোগ

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

পুরান ঢাকায় বারবার আগুন, ঝুঁকি কমাতে নেই কার্যকর উদ্যোগ
পুরান ঢাকার চকবাজারে বারবার আগুন। ছবি: এআই
  • নোটিশের পরও মুনসুর খান প্লাজার মালিকপক্ষ ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ।
  • সরু রাস্তা, যানজট ও পানির সংকটে আগুন নিয়ন্ত্রণে বাধা।
  • একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের পরও পুরান ঢাকার ঝুঁকি কমেনি।
  • অগ্নিঝুঁকি কমাতে সমন্বয়, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ও নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা জরুরি।

পুরান ঢাকার চকবাজারে মুনসুর খান প্লাজায় অগ্নিকাণ্ডের পর আবারও সামনে এসেছে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনে আগেই নিরাপত্তার ত্রুটি ধরা পড়লেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া সেলের প্রধান ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার জানান, গত জানুয়ারিতে পরিদর্শন বিভাগের একজন কর্মকর্তা ভবনটি পরিদর্শন করে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি শনাক্ত করেন। পরে নিরাপত্তা জোরদার ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মালিকপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু মালিকপক্ষ তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ করেনি। এমনকি নোটিশের জবাবও দেয়নি। নিরাপত্তার ঘাটতি দূর করতেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি তারা।

সম্প্রতি মুনসুর খান প্লাজার গুদামগুলোতে আগুন লাগার ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বিপুল পরিমাণ পণ্য মজুত, তালাবদ্ধ শাটার ও গেট, ধোঁয়া বের হওয়ার অপর্যাপ্ত পথ এবং সরু সিঁড়িতে মালামাল রাখার কারণে আগুন নেভানোর কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। সরু সড়ক, যানজট ও পানির সংকটও ফায়ার সার্ভিসের কাজে বাধা সৃষ্টি করে। সেদিন ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেই আধা ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। পানির সংকট কাটাতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পাশের একটি মসজিদ থেকে পানির লাইন টেনে পানি ব্যবহার করেন। ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণের জন্য পানির কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি দীর্ঘদিনের। ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের পাশাপাশি রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম, সরু রাস্তা এবং ভবনগুলোর মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব না থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়।

পুরান ঢাকায় ১৬ বছরে যত অগ্নিকাণ্ড

২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে ভয়াবহ আগুনে ১২৪ জনের মৃত্যু হয়। সেই ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। ঘটনার পর আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরানো, দাহ্য পদার্থ নিরাপদে সংরক্ষণ এবং অগ্নিনির্বাপণের জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। এত মানুষের মৃত্যুর পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসলেও পরিস্থিতির প্রত্যাশিত পরিবর্তন হয়নি।

এরপর ঠিক নয় বছর পর, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ওই ঘটনায় ৭১ জনের মৃত্যু হয়। চারতলা ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের ভবনে। রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও পারফিউমের মতো দাহ্য পণ্য আগুনের ভয়াবহতা বাড়ায়। দীর্ঘ তদন্তের পর এ ঘটনায় আটজনকে দায়ী করে প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। তবে ওই প্রতিবেদন জমার পর আসামিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।

এর দুই বছর পর, ২০২১ সালের ২৩ এপ্রিল, আরমানিটোলার হাজী মুসা ম্যানশনে আগুনে চারজনের মৃত্যু হয়। পরে ২৫ এপ্রিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। ফলে ওই অগ্নিকাণ্ডে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচ। এরপর ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৩ হাজার ৮৪৫টি দোকান পুড়ে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পুরান ঢাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণে সমাধান কোন পথে?

পুরান ঢাকায় বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। প্রতিবারই ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পানির সংকট, সরু রাস্তা এবং ভবনে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থার ঘাটতির কথা বলা হয়। এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের বাইরেও বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে। অগ্নিনিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক কর্মকর্তা এ কে এম শাকিল নেওয়াজ আগুন প্রতিরোধে বিভিন্ন সমস্যা, সংকট ও সমাধানের বিষয়ে ঢাকা মেইলের কাছে তাঁর পরামর্শ তুলে ধরেছেন।

মানসিকতার পরিবর্তন ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক কর্মকর্তা এ কে এম শাকিল নেওয়াজ বলেন, ঢাকার আগুনের ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না, যদি না মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটে। সিটি করপোরেশন, রাজউক, ফায়ার সার্ভিস, বিস্ফোরক অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তা না হলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

এর প্রধান কারণ, এসব সংস্থার প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে ভবন বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও লাইসেন্স দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু একটি সংস্থা নিরাপত্তার ছাড়পত্র না দিলেও অন্য সংস্থা অনুমোদন দিতে পারে। ফলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে লাইসেন্স প্রদান ও নিরাপত্তা যাচাই নিশ্চিত করা গেলে এ সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

এই পরিস্থিতিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্রুত ফায়ার হাইড্র্যান্ট ও অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। সিটি করপোরেশন বা ওয়াসার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মীর পাশাপাশি আলাদা ও প্রশিক্ষিত ফায়ার সেফটি টিম রাখতে হবে। শুধু নিরাপত্তাকর্মীদের ওপর অগ্নিনির্বাপণের দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে চলবে না।

তিনি আরও বলেন, দোকান, গুদাম, কারখানা ও আবাসিক ভবনের বাসিন্দাদের অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আগুন লাগলে কী করতে হবে, কীভাবে দ্রুত ভবন থেকে বের হতে হবে এবং কীভাবে প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, সে বিষয়ে নিয়মিত মহড়া বা ফায়ার ড্রিলের ব্যবস্থা করা জরুরি।

বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে

আগুন লাগার পেছনে অন্যান্য বিভাগের অবহেলার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভাগের ভূমিকার বিষয়টিও তুলে ধরেন শাকিল নেওয়াজ। তিনি বলেন, ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম ঝুঁকি হলো বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার ঘাটতি। অনেক ক্ষেত্রে ত্রুটিপূর্ণ নকশা, নিম্নমানের তার, অপর্যাপ্ত কেবল, সার্কিট ব্রেকারের অভাব এবং সঠিক আর্থিং না থাকার কারণে আগুন লাগার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি ভবনের বৈদ্যুতিক নকশা অনুযায়ী উপযুক্ত মাপের কেবল, মানসম্মত ইনসুলেশন, সার্কিট ব্রেকার ও আর্থিং ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ের পরই বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া উচিত।

একইভাবে ভবন বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রেও অগ্নিনিরাপত্তা ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা সনদ ছাড়া কোনো ভবন বা প্রতিষ্ঠানকে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং শ্রম মন্ত্রণালয়কে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সিটি করপোরেশনকেও সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ব্যবসার লাইসেন্স দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

ব্যবসায়ী সমিতি ও রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক কর্মকর্তা মনে করেন, দোকানমালিক সমিতি ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে, তাদের সদস্যরা অগ্নিনিরাপত্তা ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তার নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের বাইরে এসে জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে

আগুনের সমস্যা সমাধানে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক কর্মকর্তা এ কে এম শাকিল নেওয়াজ বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর পরামর্শ হলো, প্রতিটি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা থাকা জরুরি। প্রশিক্ষিত কর্মীরা প্রাথমিক পর্যায়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই আগুনের বিস্তার ঠেকানোর সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত সরঞ্জাম ও নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

এ ছাড়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার আগে তার অগ্নিনিরাপত্তা ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করা উচিত। নিরাপত্তার শর্ত পূরণ না করলে ঋণ অনুমোদন করা উচিত নয়। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে দালালনির্ভরতা ও অনিয়মের অভিযোগও খতিয়ে দেখতে হবে।

এমআইকে/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর