মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিদেশের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মী যাওয়া অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় আট মাসে বিশ্বের ১০৯টি দেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছেন প্রায় সাড়ে চার লাখ বাংলাদেশি। একই সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে দেশে এসেছে ২৫ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স।
সরকারি বার্তা সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যের বরাতে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। পাশাপাশি নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং দক্ষ কর্মী পাঠানোর উদ্যোগও চলছে।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সৌদি আরবে গেছেন ২ লাখ ১৮ হাজার ৫০৮ জন বাংলাদেশি কর্মী। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরে ৫৩ হাজার ২৯৭, কাতারে ৪২ হাজার ৫১৬, মালদ্বীপে ২৪ হাজার ৭০, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০ হাজার ৬৬১ এবং কুয়েতে ২০ হাজার ২৫৪ জন কর্মসংস্থানের উদ্দেশে গেছেন।
একই সময়ে জর্ডানে ১০ হাজার ১০, ইতালিতে ৭ হাজার ৭৭, পর্তুগালে ৫ হাজার ৩৮৬ এবং ইরাকে ২ হাজার ৮৭৮ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন। মরিশাস, সার্বিয়া, ফিজি, বেলারুশ ও রাশিয়াতেও কর্মী পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৫৭৩ কোটি ৯১ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে মার্চে সর্বোচ্চ ৩৭৫ কোটি ২২ লাখ ১০ হাজার ডলার এসেছে। এপ্রিলে এসেছে ৩১২ কোটি ৩৩ লাখ ২০ হাজার, মে মাসে ৩৪৪ কোটি ২৫ লাখ ৮০ হাজার এবং জুনে ২৮১ কোটি ৯০ লাখ ৩০ হাজার ডলার।
জুলাইয়ে ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার, আগস্টে ২৯৬ কোটি ৭৫ লাখ ৩০ হাজার এবং সেপ্টেম্বরে ২৭৬ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। অক্টোবরের প্রথম ১০ দিনে এসেছে আরও ৯৯ কোটি ডলার।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বাসসকে বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কর্মী গেছেন। এ অঞ্চলে শ্রমবাজারের সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খোঁজা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত যেসব বাংলাদেশি কর্মী অবৈধ হয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে কর্মী পাঠানোর সুযোগও তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন দেশে সফর করে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা করছেন।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। কলিং ভিসায় কর্মী পাঠানোর আনুষ্ঠানিকতাও শেষ পর্যায়ে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত শ্রমবাজার-সংক্রান্ত পাঁচ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। এরপর নতুন চুক্তির মাধ্যমে আরও বেশি কর্মী পাঠানোর প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ।
এদিকে ওমান বিভিন্ন খাতে ১০ হাজার কর্মী নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। ইতালির রাষ্ট্রদূত অ্যান্তোনিও আলেসান্দ্রো প্রতিবছর প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশি নাগরিককে পরিবারসহ ইতালিতে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
কাতার ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্রের কারিগরি কর্মী ও প্লাম্বিং খাতে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নিতে আগ্রহী। এ লক্ষ্যে কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের তালিকা দেশটিকে দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযুক্ত কর্মী বাছাই করে নিয়মিত নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে দুবাই ট্যাক্সি কোম্পানি ৬ হাজার দক্ষ চালক নিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। একই সঙ্গে নতুন করে কর্মী পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে বিদেশে কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রবাসীদের হাতে দ্রুত প্রবাসী কার্ড পৌঁছে দেওয়া, তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং কল্যাণ নিশ্চিত করার উদ্যোগ চলছে। নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণেও সরকার কাজ করছে।
জেবি




