বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

প্রতিটি সংসদীয় আসনের উন্নয়নে ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম

শেয়ার করুন:

প্রতিটি সংসদীয় আসনের উন্নয়নে ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব
  • সংসদীয় আসন উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ছে ২২০ শতাংশ
  • দরিদ্র ও ধনী আসনে একই বরাদ্দ
  • পুরোনো অনিয়মের পরও বাড়ছে আসনভিত্তিক বরাদ্দ
  • এমপিদের এলাকায় উন্নয়নে ৯ নতুন প্রকল্প
  • উন্নয়ন বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা
  • উন্নয়নের নামে বড় বরাদ্দে অপব্যবহারের শঙ্কা

সংসদীয় আসনভিত্তিক উন্নয়ন বরাদ্দে বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে থাকা সংসদীয় আসনগুলোর উন্নয়নে ৯টি নতুন প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি দুটি চলমান প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন ও সংশোধিত প্রকল্প মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৫ হাজার ৪১ কোটি টাকা। প্রস্তাব অনুমোদন পেলে প্রতিটি সংসদীয় আসনে গড়ে ৮০ কোটি টাকার বেশি উন্নয়ন ব্যয় হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিটি সংসদীয় আসনের জন্য গড়ে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছিল। তবে সরকার পরিবর্তনের আগে ওই প্রকল্প অনুমোদন পায়নি। এবার প্রস্তাবিত গড় ব্যয় কার্যকর হলে ২০২৪ সালের প্রস্তাবের তুলনায় আসনপ্রতি উন্নয়ন ব্যয় ২২০ শতাংশ বাড়বে।

সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় আলাদা উন্নয়ন বরাদ্দের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৫ সালে। সে সময় প্রতিটি সংসদীয় আসনের জন্য গড়ে দুই কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ২০০৯ সালে তা বেড়ে ১৫ কোটি এবং ২০২০ সালে ২০ কোটি টাকা হয়। ২০২৪ সালে প্রতিটি আসনের জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি।

সেই ধারাবাহিকতায় এবার সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে থাকা সংসদীয় আসনগুলোর উন্নয়নে ৯টি নতুন প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি চলমান দুটি প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন প্রকল্প আর অতিরিক্ত ব্যয়ে সরকারের এই উদ্যোগের আকার দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৫ হাজার ৪১ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত হিসাব কার্যকর হলে প্রতিটি সংসদীয় আসনে গড়ে ৮০ কোটি টাকার বেশি উন্নয়ন ব্যয় হবে, যা ২০২৪ সালের প্রস্তাবিত ২৫ কোটি টাকার তুলনায় আসনপ্রতি ২২০ শতাংশ বেশি।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বরাদ্দের হিসাবে গড়ে প্রতিটি সংসদীয় আসনে ৮০ কোটি টাকার বেশি উন্নয়ন ব্যয় হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ পরিকল্পনা কমিশনে ৯টি নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এসব প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে আটটি প্রকল্প বিভাগভিত্তিক গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য এবং একটি সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য। এসব প্রকল্পে সংসদ সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী সড়ক, সেতু, কালভার্ট, হাটবাজার, ধর্মীয় ও সামাজিক স্থাপনা নির্মাণ ও সংস্কারের কথা বলা হয়েছে।

অর্থাৎ নির্বাচনী এলাকার কোন এলাকায় কী ধরনের উন্নয়নকাজ হবে, সেই চাহিদা নির্ধারণে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা থাকবে। এরপর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর এসব কাজ বাছাই ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২০ সালে সংসদীয় আসনভিত্তিক গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের ৬২৮টি প্রকল্প নিয়ে গবেষণা করে। গবেষণায় দরপত্র, প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল পরিশোধ এবং জামানতের টাকা ফেরত দেওয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। বিভিন্ন পক্ষকে ৮ থেকে প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দেওয়ার অভিযোগও গবেষণায় পাওয়া যায়।

গবেষণায় প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরিদর্শন করা প্রকল্পগুলোর একটি বড় অংশে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। কোথাও রাস্তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম রাখার অভিযোগ ছিল। আবার কোথাও রাস্তার প্রয়োজনীয় পাশের অংশও ঠিকভাবে নির্মাণ করা হয়নি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

এদিকে সংসদীয় আসনভিত্তিক বরাদ্দের কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর অর্থ বণ্টনে মূলত সংসদীয় আসনের সংখ্যাকে ভিত্তি ধরা হয়েছে। তবে কোনো এলাকার জনসংখ্যা, দারিদ্র্যের হার কিংবা অবকাঠামোগত ঘাটতিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ফলে তুলনামূলক বেশি দরিদ্র বরিশাল ও রংপুর বিভাগের আসনগুলো এবং তুলনামূলক কম দরিদ্র চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগের আসনগুলো একই ধরনের বরাদ্দ কাঠামোর মধ্যে পড়েছে। প্রস্তাবিত বিভাগভিত্তিক প্রকল্পগুলোর মধ্যে বরিশালের জন্য এক হাজার ২২৫ কোটি টাকা থেকে চট্টগ্রামের জন্য সর্বোচ্চ তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

নতুন প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি পুরনো প্রকল্পে অর্থ পড়ে থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে। গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩-এর ব্যয় আরও চার হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ জুন পর্যন্ত ওই প্রকল্পে প্রায় ৪৩২ কোটি টাকা অব্যয়িত ছিল। একইভাবে সাধারণ সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২-এ ২০৫ কোটি ২০ লাখ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। এরপরও প্রকল্পটিতে আরও ৩৬৮ কোটি টাকা যোগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া চলমান সামাজিক অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ শেষ না হলেও একই ধরনের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য নতুন করে দুই হাজার ৫৯০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এলজিইডির প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্যদের চাহিদার ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর উন্নয়নকাজ বাছাই ও বাস্তবায়ন করবে। জরুরি কাজগুলো চলমান প্রকল্পের আওতায় নেওয়া হবে। আর বাকি কাজের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে।

তার ভাষ্য, এলজিইডির আওতায় থাকা বিশাল গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রাজস্ব বাজেট থেকে পর্যাপ্ত অর্থ পাওয়া যায় না। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে সংস্কারের প্রয়োজন থাকা অবকাঠামোর প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ করা সম্ভব হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের প্রকল্পগুলোর অনিয়ম ও দুর্বলতা দূর না করে এবার বরাদ্দ তিন গুণের বেশি বাড়ালে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার কতটা নিশ্চিত হবে? বিশেষ করে সংসদ সদস্যদের চাহিদার ভিত্তিতে প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা যাচাই এবং কাজের মান নিশ্চিত করা না গেলে বড় অঙ্কের এই বরাদ্দও আগের প্রকল্পগুলোর মতো অনিয়মের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রায় দুই দশকের অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের গবেষণায় সংসদ সদস্যদের আসনভিত্তিক স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য সুফল পাওয়া যায়নি। এসব প্রকল্পে জনগণের অর্থের অপব্যবহার, উন্নয়নের দলীয়করণ এবং স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীদের ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। পুরোনো অভিজ্ঞতার স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর কৌশল নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

এএইচ/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর