দেশের নগর এলাকায় আবাসন সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য নিরাপদ, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ সীমিত। জাতীয় আবাসন নীতি ২০১৬-এ সবার জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকলেও এর বাস্তবায়নে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নেই বলে মনে করে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
সংস্থাটি বলেছে, আবাসনকে শুধু বাজার ও বেসরকারি খাতের ওপর ছেড়ে না দিয়ে সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়।
এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ উল্লেখ করে সংস্থাটি বলেছে, সবার জন্য মানসম্মত ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারকে কার্যকর ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আইপিডি বলছে, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে পরিকল্পনা, জমি, অর্থায়ন ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। বাংলাদেশের আবাসন সংকট শুধু ঢাকার সংকট নয়, এটি জাতীয় নগর ও স্থানিক পরিকল্পনার সংকট। আবাসন বাজারনির্ভর হয়ে পড়ায় নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া এ সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
সংস্থাটি বলেছে, দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরসহ অধিকাংশ পৌর এলাকায় পরিকল্পিত আবাসন কাঠামো গড়ে না ওঠায় অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস করে আবাসন সম্প্রসারণ হচ্ছে। এতে পরিবেশ ও কৃষিজমির ক্ষতির পাশাপাশি শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা, যানজট এবং নাগরিক সেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্প ও কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক শহরে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক আবাসনের সুযোগ না পেয়ে বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাস করছেন। আইপিডি বলেছে, বস্তি উচ্ছেদ করে আবাসন সংকটের সমাধান করা যাবে না। বরং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের জোগান বাড়াতে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে।
সারাদেশের নগর এলাকায় সার্বজনীন আবাসন ও টেকসই নগরায়ন নিশ্চিত করতে আইপিডির পক্ষ থেকে আটটি সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশগুলো হলো:
১. সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিতকরণ: যেকোনো সরকারি ও বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ জমি অথবা নির্মিত ফ্ল্যাট নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা। একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ভূমির জোগান নিশ্চিত করা।
২. বস্তিসহ অনানুষ্ঠানিক আবাসনের মানোন্নয়ন: বস্তি ও নিম্ন আয়ের এলাকাগুলো উচ্ছেদ না করে সেখানে আলো-বাতাস, নিরাপদ পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও চলাচলের পথ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সরকারি জমি ও নীতিগত সুবিধা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সমন্বয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে তোলা।
৩. সমবণ্টনমূলক নাগরিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ: ঢাকাকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ কমিয়ে অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ করা, যাতে ঢাকামুখী জনসংখ্যার চাপ কমে এবং সারা দেশে সুষম স্থানিক উন্নয়ন নিশ্চিত হয়।
৪. জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা ও আঞ্চলিক উন্নয়ন: জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনার আওতায় সমন্বিত আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোকে ভৌগোলিক সুবিধা অনুযায়ী শিল্প ও আবাসনের সমন্বিত বিকাশকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। বিভিন্ন আয়শ্রেণির মানুষের জন্য পরিকল্পিত আবাসন এলাকা তৈরি করা।
৫. সাশ্রয়ী আবাসন তহবিল ও বিশেষ অর্থায়ন: জাতীয় আবাসন নীতি অনুসরণ করে জাতীয় সাশ্রয়ী আবাসন তহবিল গঠন করা। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্তদের জন্য কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের সুযোগ তৈরি করা।
৬. সামাজিক ও ভাড়াভিত্তিক আবাসন: শিল্পাঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ প্রধান শহরগুলোর অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য সরকারি উদ্যোগে ভাড়াভিত্তিক সামাজিক আবাসন নির্মাণ করা।
৭. স্থানীয় নগর সংস্থার ক্ষমতায়ন: সব সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদ নিয়োগ করে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং আবাসন পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
৮. পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভবন নির্মাণ প্রযুক্তি: জলাভূমি ও কৃষিজমি রক্ষা করে টেকসই আবাসন গড়ে তোলা এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
আইপিডি মনে করে, শুধুমাত্র ঢাকাকেন্দ্রীক নীতি দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের আবাসন সংকট সমাধান করা অসম্ভব। 'জাতীয় আবাসন নীতি ২০১৬'-এর কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম এর মত বড় শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রান্তিক পৌরসভা পর্যন্ত সুষম অবকাঠামো, নাগরিক সুবিধা ও সাশ্রয়ী আবাসন সুবিধা ছড়িয়ে দেওয়াই হলো টেকসই ও বৈষম্যহীন নগর বাংলাদেশ গড়ার একমাত্র পথ। আবাসনকে সরকারের রাজনৈতিক প্রাধিকারে নিয়ে আসা দরকার। সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন এর মাধ্যমে সরকারকে দেশের নগর এলাকায় আবাসন এর সংকটের টেকসই সমাধান করতে হবে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সঠিক পরিকল্পনার আধুনিকায়ন ঘটিয়ে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। নগরের অনানুষ্ঠানিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উভয় অর্থনৈতিক খাতকে টেকসই করতে হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবদানকে স্বীকার করে তাদের বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। পরিকল্পনার মূল দর্শন অনুযায়ী স্থায়িত্বশীল নগরায়ণ নিশ্চিত করতে সামাজিক ও সাশ্রয়ী আবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
পাশাপাশি দরকার ঢাকার স্থানিক ও জনসংখ্যাগত বৃদ্ধির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে একদিকে যেমন ঢাকার জনঘনত্ব ও পরিবেশের ভারসাম্য ফিরে আসবে, অন্যদিকে একটি বাসযোগ্য, সমতাভিত্তিক ও পরিবেশবান্ধব নগর হিসেবে ঢাকা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। বিশ্ব বসতি দিবসে রাষ্ট্রকে সেই পথেই হাঁটার অঙ্গীকার করতে হবে।
এএইচ/এএইচ




