নিম্ন ও মধ্যবিত্তের পরিবারের নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী আমিষের অন্যতম উৎস ডিম। মাছ-মাংসের বাড়তি দামের সময়ে অনেকের ভরসা ছিল এই খাবারটিই। কিন্তু সেই ডিমের দামও এখন বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এক বছরের ব্যবধানে ঢাকার বাজারে ফার্মের লাল বা বাদামি ডিমের ডজনপ্রতি দাম বেড়েছে সর্বোচ্চ ২৫ টাকা।
২০২৫ সালের ১ অক্টোবর যে ডজন ডিমের দাম ছিল ১৩৫ টাকা, চলতি বছরের একই দিনে তা বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়। ফলে সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের পুষ্টির এই সহজ উৎসটিও এখন অনেকের কাছে হয়ে উঠছে ‘বিলাসী’ খাবার।
এক বছরে বেড়েছে ২০-২৫ টাকা
বাজারদর বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর ঢাকার বাজারে ফার্মের লাল বা বাদামি ডিমের ডজন ছিল ১৩৫ টাকা। সে হিসাবে প্রতিটি ডিমের দাম পড়ত ১১ টাকা ২৫ পয়সা এবং চারটির দাম ছিল ৪৫ টাকা। একই সময়ে সাদা ফার্মের ডিমের ডজন ছিল ১২৫ টাকা।
চলতি বছরের ১ অক্টোবর লাল বা বাদামি ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায়। বড় বাজারে চারটি ডিমের দাম প্রায় ৫০ টাকা হলেও পাড়া-মহল্লার দোকানে তা ৫৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ডজনপ্রতি দাম বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ টাকা। হালি হিসেবে বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা।
২০২৫ সালের ৪৫ টাকা হালি থেকে বর্তমান ৫০-৫৫ টাকা হওয়ায় দাম বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ থেকে ২২ শতাংশ। বড় বাজারে প্রতিটি ডিমের দাম পড়ছে সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৩ টাকা। আর পাড়া-মহল্লার দোকানে একটি ডিম কিনতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ১৪ টাকা।
আরও পড়ুন: পে স্কেলে স্বস্তি, বাজার নিয়ে নতুন শঙ্কা
গত মাস সেপ্টেম্বরের শুরুতেও ঢাকার বাজারে ডিমের ডজন ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকা ছিল। ১১ সেপ্টেম্বরের বাজারদরে তা বেড়ে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায় ওঠে। তখন খুচরা বাজারে প্রতিটি ডিমের দাম পড়ছিল প্রায় ১৩ থেকে ১৪ টাকা। অর্থাৎ শুধু এক বছরের ব্যবধানেই নয়, সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহেও ডিমের বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নিত্যদিনের খাবারের তালিকায় থাকা এই নিত্যপণ্যটিও এখন সাশ্রয়ী থাকছে না।
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে ডিমের দাম একবার বাড়লে তা সহজে কমে না। বরং নতুন কোনো কারণ দেখিয়ে আবারও দাম বাড়ানো হয়।
পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে মেসে থাকা সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘ডিমের উৎপাদন খরচ তো এতো না। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক বেশি। এখানে সিন্ডিকেটের সমস্যা আছে। সিন্ডিকেট যদি ভেঙে দেওয়া যায়, ডিমের দাম অবশ্যই কমবে। যারা স্টুডেন্ট হিসেবে থাকে, তাদের জন্য ডিমই বিকল্প। এখন ডিম কিনে খাওয়াও আকাশচুম্বী ব্যাপার।’
দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে যা বলছেন ব্যবসায়ীরা
ডিমের দাম বাড়ার জন্য উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দাবি, পোলট্রি খাদ্য, ওষুধ, পরিবহনসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে বছরের এ সময়ে মুরগির ডিম দেওয়ার হার কিছুটা কমে যায়। খামারের সংখ্যা কমে যাওয়া ও সরবরাহ সংকটও দামের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
ব্যবসায়ীরা আরও জানান, বর্তমানে তাদের পর্যায়ে ১০০ ডিমের দাম প্রায় ১ হাজার ১৪০ থেকে ১ হাজার ১৮০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করছে। সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিন দাম পরিবর্তিত হয়।
সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকেও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে উৎপাদক পর্যায়ে প্রতি ডিমের গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ৭ টাকা ৯১ পয়সা। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে প্রায় ১১ টাকা ৩০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে সাধারণত দেড় থেকে দুই টাকা পর্যন্ত মূল্য সংযোজন হয় বলেও তারা জানান।
ব্যবসায়ীদের দাবি, বছরের একটি বড় সময় উৎপাদন খরচের নিচে ডিম বিক্রি করতে হলেও দাম বাড়ার সময়টিই বেশি আলোচনায় আসে। বাজারের মৌসুমি ওঠানামা কমাতে অতিরিক্ত উৎপাদনের সময়ে এক থেকে দেড় মাস ডিম সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাবও দিয়েছেন তারা।
উৎপাদন বাড়লেও কেন কমছে না দাম?
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ২ হাজার ৪৪০ কোটি ৬৫ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়েছে। এ সময়ে জনপ্রতি বার্ষিক ডিমের প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে ১৩৭ দশমিক ১৯টি। অর্থাৎ সামগ্রিক উৎপাদন ও প্রাপ্যতার হিসাবে দেশে ডিমের ঘাটতির চিত্র নেই। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, উৎপাদন এত বেশি হওয়ার পরও খুচরা বাজারে ডিমের দাম কেন দীর্ঘ সময় ধরে চড়া?
এখানেই সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ, উৎপাদন খরচ, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের মূল্য সংযোজন এবং বাজার তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বৈঠকেও বিষয়টি উঠে এসেছে। সরকার উৎপাদন খরচ থেকে শুরু করে উৎপাদক, পাইকার ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত কোন ধাপে কতটা মূল্য সংযোজন ও মুনাফা হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করার কথা জানিয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর বৈঠক, সমাধান কোথায়?
ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণে ২৭ সেপ্টেম্বর পোলট্রি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, অতিরিক্ত মুনাফা ও কৃত্রিম সংকট তৈরি না করে যৌক্তিক মূল্যে ডিম বিক্রির আহ্বান জানান।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে যৌক্তিক মুনাফা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভোক্তার স্বার্থও সুরক্ষিত রাখতে হবে। উৎপাদন খরচ ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে মূল্য সংযোজন ও মুনাফার বিষয়টি সরকার পর্যালোচনা করবে বলেও জানানো হয়েছে।
বৈঠকে ব্যবসায়ীরা দুই সপ্তাহের মধ্যে ডিমের দাম কমে আসবে বলে আশ্বাস দেন। তবে বাজারে এর বাস্তব প্রতিফলন কতটা হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ
ডিমের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বাজারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে পরিবারের খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টি। যে পরিবারগুলো মাছ-মাংসের দাম সামলাতে না পেরে ডিমকে বিকল্প আমিষ হিসেবে বেছে নেয়, তাদের জন্য ডিমের দাম বাড়া মানে খাবারের বাজেট আরও সংকুচিত হওয়া। শিশুর খাবার, শিক্ষার্থীর নাশতা, শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন খাবার কিংবা নিম্ন আয়ের পরিবারের রাতের খাবার, সব ক্ষেত্রেই ডিমের ব্যবহার রয়েছে।
ফলে বাজারে ডিমের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নটি শুধু ‘এক হালি কত’তে আটকে থাকছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে প্রয়োজনীয় পুষ্টির এই সহজ উৎসটি আর কতদিন থাকবে?
আরও পড়ুন: মূল্যস্ফীতির চাপে সঞ্চয়পত্রে ছন্দপতন!
ভোক্তাদের দাবি, উৎপাদন খরচের বাস্তব হিসাব, সরবরাহের প্রতিটি ধাপের মূল্য সংযোজন এবং খুচরা বাজারের দামের মধ্যে কোথায় কতটা ব্যবধান তৈরি হচ্ছে, তা প্রকাশ করা হোক।
তবে জ্বালানি ও অন্যান্য উৎপাদন উপকরণের দাম বৃদ্ধির কারণে ডিম উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে বলে দাবি করেছেন মৎস্য, ডেইরি ও পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. আবু বকর সিদ্দিক।
ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘বাজারে দাম বাড়ার যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি কিছু এলাকায় সিন্ডিকেটের অভিযোগও আছে।’
তিনি বলেন, ‘কিছু ব্যবসায়ী খামারিদের দাদন বা আগাম টাকা দিয়ে কম দামে ডিম কিনে নেন। পরে সেই ডিমই বেশি দামে বাজারজাত করেন। এতে প্রকৃত উৎপাদক খামারি তার ন্যায্য দাম পান না, আবার ভোক্তাকেও বাড়তি দাম গুনতে হয়।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ডিমের দাম বাড়ার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক আলোচনা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ভোক্তারা যেন সহনীয় দামে ডিম কিনতে পারেন এবং খামারিরাও যেন লোকসানে না পড়েন। পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রভাব বাজারে দেখা যাচ্ছে না। বরং দাম আরও বেড়েছে।’
এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘সরকার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছে, কিন্তু কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটি দৃশ্যমান নয়। মাঝে মাঝে হুংকার দেওয়া হলেও বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন অজুহাতে দাম বাড়াচ্ছেন এবং সরকারের নির্দেশনাকেও আমলে নিচ্ছেন না। ফলে ভোক্তারা আরও অসহায় হয়ে পড়ছেন।’
ক্যাবের এই নেতা বলেন, ‘কোনো অপরাধের শাস্তি না হলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটি স্পষ্ট করতে হবে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার পর তার দৃশ্যমান ফলও মানুষকে দেখাতে হবে।’
এমআর/এমআর




