বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

মেট্রোরেলে হাফপ্যান্ট বিতর্ক: ব্যক্তিস্বাধীনতা বনাম শালীনতা

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৮ এএম

শেয়ার করুন:

মেট্রোরেলে হাফপ্যান্ট বিতর্ক: ব্যক্তিস্বাধীনতা বনাম শালীনতা
ছবি: এআই

# হাফপ্যান্ট পরায় মেট্রোস্টেশনে বাধার অভিযোগ 
# ‘শালীনতা’ নির্ধারণের নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন 
# ব্যক্তিস্বাধীনতা বনাম সামাজিক শালীনতা নিয়ে বিতর্ক চলছে 
# শুধু লিখিত আইন দিয়ে সমাজ পরিচালিত হয় না
# জনপরিসরে পোশাকের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে সময়-স্থান-পরিবেশে

মেট্রোরেলে হাফপ্যান্ট পরে এক অ্যাথলেটের প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও জনপরিসরের শালীনতার প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পোশাক নির্বাচন ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ হলেও জনপরিসরে সেই স্বাধীনতার সীমা কোথায় এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ড কী- তা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। 

একদিকে যেমন ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে মত এসেছে, অন্যদিকে জনপরিসরে সামাজিক ভব্যতা ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলছেন অনেকে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর টি-শার্ট ও হাফপ্যান্ট পরে মেট্রোরেলে উঠতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ করেন অ্যাথলেট প্রশিক্ষক সাজ্জাদ হোসেন। পোশাক ‘অশালীন’ উল্লেখ করে তাকে মেট্রোস্টেশনে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয় এবং পাঞ্চ মেশিনের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

সেখানে জাকির নামে এক পুলিশ সদস্যকে শুরুতে বলতে শোনা যায়, ‘দাঁড়ান, একটু চুলটা ঠিক করি।’ একপর্যায়ে সাজ্জাদ হোসেন তার কাছে হাফপ্যান্ট পরে স্টেশনে ঢুকতে না পারার কারণ জানতে চাইলে ওই পুলিশ সদস্য বলেন, আপনাকে বলা হয়েছে আপনি একটু শালীনতার সঙ্গে যান। এটা একেবারে পুরোপুরি শালীনতার মধ্যে পড়ে না।

তখন সাজ্জাদ প্রশ্ন করেন, কোনটা শালীনতা, কোনটা শালীনতা না, সেটি আপনার নিয়মে লেখা আছে?’ জবাবে জাকির নামে পুলিশ সদস্য বলেন, ‘এটা দেখা আমার দায়িত্ব।’

ওই ঘটনার প্রতিবাদে হাফ প্যান্ট ও টি-শার্ট পরে মেট্রোরেলে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করে একদল তরুণ। ‘শর্টস পরেই মেট্রোতে উঠি!’ শিরোনামে ফেসবুকে এ কর্মসূচির ইভেন্ট খুলেছেন শাওন আহমেদ নামে একজন। কর্মসূচির স্থান হিসেবে রাজধানীর ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন উল্লেখ করা হয়।

যা বলছেন সমাজবিজ্ঞানীরা

মেট্রোরেলের মতো গণপরিবহনে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চলাচল করেন। সেখানে ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে জনপরিসরের সামাজিক বাস্তবতারও একটি সম্পর্ক রয়েছে। একজন ব্যক্তি যে পোশাককে স্বাভাবিক মনে করছেন, একই পোশাক অন্যদের কাছে অস্বস্তিকর বা অনুপযুক্ত মনে হতে পারে। এ কারণে জনপরিসরে পোশাকের ক্ষেত্রে সামাজিক ভব্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের বিষয়টি পুরোপুরি অগ্রাহ্য করার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়েই বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, একজন ব্যক্তি নিজের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক পরতেই পারেন। তবে পোশাকের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে সময়, স্থান, পরিবেশ ও সংস্কৃতির ওপর। খেলার মাঠ, শরীরচর্চার স্থান কিংবা ব্যক্তিগত পরিসরে যে পোশাক স্বাভাবিক, সেটিই আবার গণপরিবহন বা অন্য কোনো জনসমাগমস্থলে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। কারণ জনপরিসর এমন একটি জায়গা, যেখানে ভিন্ন বয়স, শ্রেণি, পেশা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের মানুষ একসঙ্গে চলাচল করেন।

এই বাস্তবতায় জনপরিসরে পোশাককে শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হিসেবে দেখলে সামাজিক শালীনতা ও পারস্পরিক সম্মানের দিকটি আড়ালে পড়ে যেতে পারে। আবার কোনো পোশাক সামাজিকভাবে কারও কাছে অস্বস্তিকর মনে হলেই সেটিকে অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগও নেই। ফলে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সামাজিক শালীনতার মধ্যে কোথায় ভারসাম্য থাকবে, সেটিই মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজ শুধু লিখিত আইন দিয়ে পরিচালিত হয় না। মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণে আইন ও রাষ্ট্রীয় বিধিবিধানের পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও পারস্পরিক সম্মানের মতো অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণও কাজ করে। এসব নিয়মের অনেক কিছু কোনো আইনের ধারায় লেখা না থাকলেও দীর্ঘদিনের সামাজিক চর্চার মধ্য দিয়ে তা মানুষের আচরণের অংশ হয়ে ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুব কায়সার বলেন, ‘সমাজে চলার ক্ষেত্রে সবকিছুর জন্য লিখিত আইন থাকা প্রয়োজন হয় না। বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা, বাবা-মাকে শ্রদ্ধা করা কিংবা শিক্ষকের সামনে সম্মান দেখানোর মতো অনেক আচরণ আইনের নির্দিষ্ট ধারায় উল্লেখ নেই। কিন্তু এসব আচরণ সমাজের দীর্ঘদিনের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ এসব আচরণ শিখে সামাজিক জীবনে তা অনুসরণ করে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক-দুইভাবে দেখা হয়। আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আইন, বিধিবিধান ও প্রতিষ্ঠান কাজ করে। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয় সামাজিক মূল্যবোধ, সংস্কৃতি, নীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও মানুষের বিবেক থেকে। জনপরিসরে পোশাকের ক্ষেত্রেও এমন একটি অলিখিত সামাজিক নিয়ম কাজ করে।

মাহবুব কায়সারের মতে, একজন মানুষ নিজের পছন্দ অনুযায়ী পোশাক পরতে পারেন। কিন্তু সেই পোশাক যখন জনপরিসরে নিয়ে আসা হয়, তখন বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেখানে অন্য মানুষের সামাজিক অনুভূতি ও গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও সামনে আসে। শিশুদের হাফপ্যান্ট পরা সাধারণত স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হলেও প্রাপ্তবয়স্ক একজন ব্যক্তির একই পোশাক ব্যক্তিগত বা খেলাধুলার পরিবেশের বাইরে জনসমাগমপূর্ণ স্থানে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

1877548385361651

ঢাবির সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের এই সহযোগী অধ্যাপক বলেন, কোনো বিষয় আইনে নিষিদ্ধ না থাকলেই সেটি সব জায়গায় সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। আবার কোনো বিষয় সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর মনে হলেই সেটিকে অপরাধ বলা যায় না। এ দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। জনপরিসরে কোন পোশাক গ্রহণযোগ্য হবে, তা সব সময় আইনের ধারা দিয়ে নির্ধারণ করা হয় না; সামাজিক সংস্কৃতি, সময়, পরিবেশ ও মানুষের সম্মিলিত ধারণাও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে এই সামাজিক ধারণাও স্থির নয়। সময়ের সঙ্গে পোশাকের ধরন যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে শালীনতা ও গ্রহণযোগ্যতার সংজ্ঞাও। অতীতে যে পোশাককে অস্বাভাবিক মনে করা হতো, পরবর্তী সময়ে সেটিই অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। একইভাবে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশে স্বাভাবিক পোশাক অন্য পরিবেশে অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

মেট্রোরেলের ঘটনাকে ঘিরে আইনগত প্রশ্নও সামনে এসেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬-এর ৭৫ ধারায় প্রকাশ্য স্থানে অশালীনভাবে নিজের দেহ প্রদর্শন কিংবা অশালীন আচরণের বিষয়ে বিধান রয়েছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট পোশাক পরাকে ওই ধারার আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে কি না, তা নির্ভর করবে ঘটনার প্রকৃতি, পরিস্থিতি ও আইনের নির্দিষ্ট প্রয়োগের ওপর।

এ ছাড়া পুলিশ আইনের বিভিন্ন বিধানে জনসাধারণের চলাচলে বাধা, অসুবিধা, বিরক্তি বা জনউপদ্রব সৃষ্টিকারী আচরণের বিরুদ্ধে পুলিশের দায়িত্ব ও ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। ফলে জনপরিসরে কোনো আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শুধু পোশাকের ধরন নয়, সেই আচরণে জনসাধারণের চলাচল বা স্বাভাবিক পরিবেশে কোনো বিঘ্ন ঘটছে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয় হতে পারে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘পোশাকের ক্ষেত্রে সবারই স্বাধীনতা থাকা উচিত। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো পোশাক অশালীন বা আপত্তিকর না হয়, ততক্ষণ একজন মানুষ কী পোশাক পরবেন, সেটি তার নিজের বিষয়। রাষ্ট্র বা প্রশাসন কেন ঠিক করে দেবে একজন মানুষ কী পরবেন।

দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘নারীদের পোশাক নিয়েও প্রায়ই নানা ধরনের মন্তব্য করা হয়। কারও পোশাক ঠিক নেই বলা হয়, আবার কারও পোশাকের ব্যাপারে বলা হয় কাপড় কম। পোশাকের স্বাধীনতা মানুষের থাকা উচিত।’

একই সঙ্গে বাংলাদেশের সমাজ তুলনামূলকভাবে রক্ষণশীল হওয়ায় সামাজিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় রাখতে হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এএইচ/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর