- পুরোনো অপরাধীরা আবারও সক্রিয় হচ্ছে
- সদর দপ্তরের দাবি, সব ইউনিটে তালিকা আছে
- থানা–সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, তালিকা না থাকায় গলদঘর্ম
- ঘুরেফিরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসীদের নাম
দুই যুগ আগে করা তালিকাই এখনো ভরসা। এর মধ্যে বদলেছে সরকার, পাল্টেছে অপরাধের ধরন। তৈরি হয়েছে নতুন নতুন সন্ত্রাসী গ্রুপ। কিন্তু শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নতুন করে তালিকা করেনি পুলিশ। ফলে পুরোনো তালিকার সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি নতুনদেরও এলাকাভিত্তিক অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। পটপরিবর্তনের পর পুরোনো সন্ত্রাসীদের বিভিন্ন গ্রুপ ফের সক্রিয় হয়ে ওঠায় বাড়ছে সংঘাত ও প্রাণহানি। নতুন তালিকা না থাকায় অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে পুলিশকেও পড়তে হচ্ছে নানা জটিলতা ও বিড়ম্বনায়।
সেই পুরোনো তালিকাই ভরসা
জানা গেছে, ২০০১ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে। এরপর জোট সরকার বিদায় নেয়, আসে মহাজোট সরকার। কিন্তু এরপর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নতুন তালিকা তৈরির উদ্যোগ আর তেমন দেখা যায়নি। পুলিশ সদর দপ্তরের ওয়েবসাইটে দুই যুগেরও বেশি সময় আগে প্রকাশ করা ওই তালিকাই এখনো রয়েছে। এর মধ্যে নতুন নতুন সন্ত্রাসী তৈরি হলেও তাদের নাম তালিকায় যুক্ত হয়নি। তাদের এলাকাভিত্তিক অপরাধী হিসেবেই দেখানো হচ্ছে।
২০০১ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা তালিকায় থাকা ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসী হলেন—কালা জাহাঙ্গীর, মোল্লা মাসুদ, পিচ্চি হান্নান, সুব্রত বাইন, প্রকাশ কুমার বিশ্বাস, আমিনুর রসুল সাগর ওরফে টোকাই সাগর, হারিস আহমেদ, খোরশেদ আলম রাসু, পিচ্চি হেলাল, আলাউদ্দিন, কামাল পাশা, নাঈম আহমেদ টিটন, লিয়াকত, আরমান, জাফর আহমেদ মানিক, খন্দকার তানভীরুল ইসলাম জয়, ইমাম হোসেন ওরফে ফ্রিডম ইমাম, ফ্রিডম সোহেল, আব্বাস আলী ওরফে কিলার আব্বাস, ভিপি হান্নান, শামীম ওরফে আগা শামীম, মশিউর রহমান ও আবদুল জব্বার মুন্না। এর মধ্যে ২০২৫ সালে আইএসপিআর জানিয়েছিল, ওই তালিকার সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে কুষ্টিয়া থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: হঠাৎ কেন আলোচনায় ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীরা’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামের তালিকা প্রকাশ করে তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে। এদের মধ্যে কেউ কেউ মারা গেছেন। দুই-একজন কারাগারে আছেন। বাকিরা বিদেশে অবস্থান করে দেশের মধ্যে সন্ত্রাস সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের দাবি।
ঘুরেফিরে আসছে পুরোনো সন্ত্রাসীদের নাম
সম্প্রতি ঢাকায় বিভিন্ন ঘটনায় ঘুরেফিরে পুরোনো সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্যদের নাম আসছে। তাদের মধ্যে কিলার আব্বাস, পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন এবং খোরশেদ আলম ওরফে রাসু ওরফে ফ্রিডম রাসুর নাম রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও পুরোনো শক্তি ফিরে পেতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের এসব সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষও হচ্ছে। রাজধানীতে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে।
চলতি বছরের ২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন। রায়েরবাজারে দুই যুবককে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায়ও নাম এসেছে পিচ্চি হেলালের।
মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, এলিফ্যান্ট রোডসহ আশপাশের এলাকার অপরাধজগতে পিচ্চি হেলালের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইমন। ২০২৫ সালে এলিফ্যান্ট রোডের বিপণিবিতান মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের সামনে ব্যবসায়ী এহতেশামুল হককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখমের ঘটনায়ও আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের নাম আসে।
২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর রাজধানীর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে সকালে তারিক সাইফ মামুন (৫৬) নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। মামুনও তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। পরে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তিনি একসময় শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের সহযোগী ছিলেন।
সক্রিয় হচ্ছে আন্ডারওয়ার্ল্ড
৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে বন্দী থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকে বের হয়েছেন। তারা বের হয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানো শুরু করেছেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানিয়েছে। এতে আবারও মাথাচাড়া দিয়েছে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী ও তাদের গ্রুপের সদস্যরা। ফলে বিভিন্ন ঘটনায় ঘুরেফিরে পুরোনো সন্ত্রাসীদের নাম আসছে।
আরও পড়ুন: রাজশাহীতে শিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষ, আহত ১৫
বিশেষ করে গত দুই বছরে ঢাকায় বেশ কিছু হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা ঘটার পরপরই কারা জড়িত, সে বিষয়ে গোয়েন্দারা অনেক সময় তথ্য পাচ্ছিলেন না। পরে এসব ঘটনায় আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পুরোনো কায়দায় কখনো চিরকুট পাঠিয়ে, কখনো সরাসরি, আবার কখনো ফোনে হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে ঢাকার মিরপুরে এমন কয়েকটি ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে।
মিরপুরের পুলিশের কয়েকটি সূত্র জানায়, পল্লবী, মিরপুর ও বিহারী ক্যাম্প ঘিরে আবারও সন্ত্রাসীরা সক্রিয় হচ্ছে। তারা এসব এলাকায় মাদক ও চাঁদাবাজির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। ফলে দফায় দফায় একে অপরের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে। পল্লবী, মিরপুর ও ভাসানটেক এলাকায় অপরাধীদের তালিকা থাকলেও নতুন নতুন নাম আসায় বিপাকে পড়ছে পুলিশ। তাদের গ্রেফতার করতেও বেগ পেতে হচ্ছে। এ কারণে নতুন করে সোর্স তৈরি করে অপরাধীদের তথ্য সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
পুলিশের কর্মকর্তারা যা বলছেন
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় কর্মরত পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগে থানায় থানায় এলাকাভিত্তিক অপরাধীদের তালিকা করা হতো। পুলিশের ভাষায় এটিকে বলা হতো ভিসিএনবি। এর পুরো অর্থ ভিলেজ ক্রাইম নোটবুক। এই তালিকায় এলাকার অপরাধীদের নাম ও ঠিকানা থাকত। ফলে তাদের গ্রেফতার করাও সহজ হতো। এসব তালিকা থানার ভেতরে টাঙানো থাকত।
তাদের ভাষ্য, এখন সময় ডিজিটাল হওয়ায় অপরাধীদের তথ্য সংরক্ষণের ধরন বদলেছে। সিডিএমএসে অপরাধীদের তথ্য পাওয়া যায়। কেউ গ্রেফতার হলে তার নামে কয়টি মামলা আছে, তা সিডিএমএসে সার্চ করলেই বের হয়ে আসে। আগে হাতে লিখে মামলা করতে হলেও এখন কম্পিউটারে মামলা করা হয়। ফলে তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভোগান্তি কমেছে।
ডিএমপির কয়েকজন ওসি পদমর্যাদার কর্মকর্তা বলেন, আগে ভিসিএনবি করা হতো, এখন সিডিএমএসে অপরাধীদের তথ্য রাখা হয়। এতে অপরাধীদের তথ্য থাকলেও পুরোনো অপরাধীরা নতুন করে সক্রিয় হওয়ায় তাদের ধরতে বেগ পেতে হচ্ছে। তারা এখন অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার না করে যোগাযোগের ধরন বদলাচ্ছেন। আড্ডা ও বসবাসের স্থানও দ্রুত পরিবর্তন করছেন। এসব কারণেও অপরাধীদের ধরতে সময় লাগছে। তবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা হালনাগাদ করা হলে তাদের কাজের চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করেন তারা।
ডিএমপির একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা বলেন, গুলশানে কয়েকটি গুলির ঘটনায় প্রথমে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা ভাবা হয়েছিল। পরে দেখা যায়, প্রায় ২০ বছর আগের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর দ্বন্দ্বের জেরেই এসব ঘটনা ঘটেছে। যারা গুলি করেছে এবং জড়িত ছিল, তাদের কেউ পুরোনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী, আবার কেউ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সক্রিয় সদস্য।
পুলিশ সদর দফতরের ভাষ্য
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) সায়েদুর রহমান ঢাকা মেইলকে বলেন, দাগী অপরাধী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা নিয়মিত করা হয়। আগেও হতো, এখনো হয়। এটা নতুন কিছু নয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া বিভাগের এআইজি সাহাদাত হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, পুলিশের প্রতিটি ইউনিটে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা রাখা আছে। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ কারণে পুলিশ সদর দপ্তরে আলাদাভাবে এ তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে না।
এমআইকে/এআর




