স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়া নিয়ে এখনো চলছে নানা আলোচনা। তবে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলছে, আইন সংশোধন না হলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তফসিল ঘোষণা করা হবে। আর সেক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, বিগত সময়ে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচিতও হয়েছেন এবং একই সঙ্গে দুই পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তবে বর্তমান কমিশনের মতে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও সরকারি সুবিধাভোগী। এক্ষেত্রে কোনো শিক্ষক জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করলে একদিকে তিনি একই সঙ্গে দুই পদে দায়িত্ব পালন করবেন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের পাঠদানেও বিঘ্ন ঘটবে। এ কারণে কমিশন এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নির্বাচন থেকে বিরত রাখতে চায়। এজন্য এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণাসহ কয়েকটি সুপারিশ প্রস্তাব আকারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন সংশোধনের জন্য। এখন তফসিল ঘোষণার আগে আইন সংশোধন হলে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। আর যদি তফসিল ঘোষণার আগে আইন সংশোধন না হয়, তাহলে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোনো বাধা থাকবে না।
ইসি কর্মকর্তারা আরও বলেন, বর্তমানে সংসদ অধিবেশন নেই। আবার সংসদ অধিবেশন বসতে দুই মাসের মতো সময় লাগবে। এছাড়া আইন সংশোধন হবে কি না, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও ইসিকে কিছু জানানো হয়নি। নির্বাচন কমিশন সেপ্টেম্বরের শেষে তফসিল ঘোষণা করে নভেম্বর মাসে ইউনিয়ন পরিষদের প্রথম ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। ইতোমধ্যে বিধিমালা চূড়ান্ত করতে আমরা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠিয়েছি। চূড়ান্ত হয়ে এলে তফসিল ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু করে দেবে। সেক্ষেত্রে তফসিল ঘোষণা ও মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় যদি বিদ্যমান আইনই বহাল থাকে, তাহলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিদ্যমান আইনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। তবে আইন পরিবর্তন হলে নতুন আইনের বিধান অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নয়, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন যে আইন কার্যকর থাকবে, সেই আইন অনুযায়ী প্রার্থীর যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে।’
একেক ধাপে আলাদাভাবে আইন প্রয়োগের সুযোগ নেই উল্লেখ করে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন যে আইন থাকবে, প্রার্থীর যোগ্যতা সেই আইন অনুযায়ী নির্ধারণ হবে। তার আগে আইন পরিবর্তন করতে হলে করতে হবে। পরে আইন সংশোধন করলে হবে না। একই নির্বাচনে এক জায়গায় শিক্ষক প্রার্থী হতে পারবেন, আরেক জায়গায় পারবেন না এটা হতে পারে না। আইন পরিবর্তন করতে হলে আগেই করতে হবে।”
আব্দুর রহমানেল মাছউদ আরো বলেন, ‘সরকার চাইলে রাতারাতি আইন সংশোধন হতে পারে। তবে আমার ধারণা আইন সংশোধন আগেও হবে না, কিছুই হবে না।’
আরও পড়ুন: হিসাব মিলছে না শতকোটি টাকার প্রকল্পে!
বিদ্যমান আইনেই তফসিল ঘোষণা করা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই’।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নিয়ে আপনাদের মধ্যে একটি প্রশ্ন রয়েছে। আমাদের লোকাল গভর্নমেন্ট আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রে বা পরিষদে বা অন্য কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কোনো কর্মে লাভজনক সার্বজনীন পদে অধিষ্ঠিত থাকলে তিনি অযোগ্য হবেন।’
বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কুল-কলেজ, জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২৫-এ বিধি ১১-এর পয়েন্ট ১৭ (খ)- টেনে তিনি বলেন, ‘এতে বলা হয়েছে এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সময়ে একাধিক কোনো পদ বা চাকরিতে বা আর্থিক লাভজনক কোনো পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। ১১.১৭ (খ)-তে আরও বলা হয়েছে, আর্থিক লাভজনক পদ বলতে সরকার কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো ধরনের বেতন, ভাতা, সম্মানি এবং বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় বা আইন পেশাকর্মীর বিনিময়ে প্রদত্ত বেতন, ভাতা ও সম্মানিকে বোঝাবে।’
শাহে আলম বলেন, ‘নির্বাচনের বিধিমালা এবং প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ করে নির্বাচন কমিশন। এখন নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় সরকার আইন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের নীতিমালাকে এক জায়গায় করে এটি ঠিক করবে যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা প্রার্থী হতে পারবেন কি না।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কুল-কলেজ, জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২৫-এর বিষয়টি সামনে আনলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘এটা তো নীতিমালা। নীতিমালা ও আইন এক বিষয় না। আমরা আইনটাই বিবেচনায় নেব।’
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে যেসব সুপারিশ পাঠিয়েছে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইন সংশোধনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে বেশ কয়েকটি সুপারিশ পাঠিয়েছে ইসি। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা এবং ঋণখেলাপিদের পাশাপাশি জামিনদারদেরও প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব রয়েছে।
আইন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে বাংলাদেশের নাগরিক এবং কমপক্ষে ২৫ বছর বয়সী হতে হয়। চেয়ারম্যান পদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের যেকোনো ওয়ার্ডের ভোটার হতে হবে। সদস্য পদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের এবং সংরক্ষিত নারী সদস্য পদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংরক্ষিত আসনের আওতাধীন কোনো একটি ওয়ার্ডের ভোটার হতে হয়।
এ ছাড়া নির্ধারিত জামানত জমা, যথাযথভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল এবং প্রস্তাবক ও সমর্থকের স্বাক্ষরসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়।
যেসব কারণে প্রার্থী অযোগ্য হতে পারেন
বাংলাদেশের নাগরিক না হলে। বয়স ২৫ বছরের কম হলে। আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ/মানসিকভাবে অক্ষম ঘোষিত হলে। দেউলিয়া ঘোষিত হয়ে দায় থেকে অব্যাহতি না পেলে। কোনো নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে নির্ধারিত সময় পার না হলে। সরকারের বা ইউনিয়ন পরিষদের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকলে।
ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে ঠিকাদারি বা আর্থিক স্বার্থের সম্পর্ক থাকলে। ইউনিয়ন পরিষদের কাছে বকেয়া পাওনা থাকলে, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত পরিস্থিতিতে। একই সঙ্গে একাধিক নির্বাচনী এলাকার প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে আইনের বিধান লঙ্ঘন করলে।
আইন বা আদালতের আদেশে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলে। মনোনয়নপত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য না দিলে, ভুল/মিথ্যা তথ্য দিলে বা নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করলে মনোনয়ন বাতিল হতে পারে।
নভেম্বরের মাঝামাঝি ইউপি নির্বাচন
চলতি বছরের নভেম্বরের মাঝামাঝি ইউপি নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা করছে ইসি। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় থেকে নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভোটের অন্তত ৪০ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করতে হবে।
উপজেলাভিত্তিক ইউপি নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘উপজেলাভিত্তিক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। কোন উপজেলা আগে নেওয়া হবে, তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ কমিশনের প্রয়োজন ও সুবিধা বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হবে।’

আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুবিধার জন্য ৬৪ জেলার সদর উপজেলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্বাচন করার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’
তফসিলের সময় নিয়ে এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘নভেম্বরে নির্বাচন করতে চাইলে চলতি মাসের শেষদিকে তফসিল দিতে হবে। আমরা সেভাবেই কাজ করছি।’
ইউপি নির্বাচনে বাড়ছে জামানত ও ব্যয়
আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে বিধিমালা সংশোধনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিং জন্য পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যেখান প্রার্থীদের জামানত ও নির্বাচনি ব্যয় দুটোই বৃদ্ধি প্রস্তাব করা হয়েছে।
ইসি সূত্র জানান, বিধিমালায় চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয় ৫ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা, মেম্বারদের ১ লাখ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রেও কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেখানে চেয়ারম্যান প্রার্থীর জামানত ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার, মেম্বার ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা বিধান আগের মতোই থাকছে।
বিধিমালা সংশোধনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, ‘আমরা বিধিমালা সংশোধনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠিয়েছি। ভেটিং হয়ে এসেছে কিনা তা আমি বলতে পারছি না।’
জানা যায়, ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করেছে সংস্থাটি। প্রতিটি স্তরের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ২৫ দিন আগে ভোটকেন্দ্রের গেজেট প্রকাশ করা হবে। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের জন্য মোট ৯৮ হাজার ১৯৬টি ভোটকেন্দ্র চূড়ান্ত করা হয়েছে।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে গত ৩১ আগস্ট চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তালিকা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দেশে ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫৫ লাখ ১০ হাজার ৬৬৫, নারী ৬ কোটি ৩২ লাখ ৬৫ হাজার ৭১১ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৬৭ জন।
এমএইচএইচ/এমআর




