বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

সচিবালয় থেকে মাঠপ্রশাসন: ড্রাইভিং সিটে নারী নেতৃত্ব

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৪ এএম

শেয়ার করুন:

 সচিবালয় থেকে মাঠপ্রশাসন: ড্রাইভিং সিটে নারী নেতৃত্ব
নীতিনির্ধারণী উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল মাঠপ্রশাসন-সরকারি চাকরির সব ধাপেই নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান। ছবি: সংগৃহীত
  • সরকারি চাকরিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে
  • সচিব পদে ১৭ নারী কর্মকর্তা, রেকর্ড ২১ জেলায় নারী ডিসি
  • উপজেলা ও ভূমি প্রশাসনের নেতৃত্বে ১৯১ ইউএনও ও ১১৬ এসিল্যান্ড
  • প্রশাসনিক দক্ষতায় নতুন উচ্চতায় নারী কর্মকর্তারা

নীতিনির্ধারণী উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল মাঠপ্রশাসন-সরকারি চাকরির সব ধাপেই নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান। নিজেদের সততা, কর্মদক্ষতা ও পেশাদারিত্বের স্বাক্ষর রেখে সিভিল সার্ভিসের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছেন তারা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংস্কার ও গবেষণা অনুবিভাগের প্রস্তুত করা ‘স্ট্যাটিসটিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফ-২০২৫’ শীর্ষক হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে প্রশাসনে নারীদের এই অগ্রগতির তথ্য পাওয়া গেছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হালনাগাদ তথ্য প্রাথমিক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিগত পাঁচ বছরের ব্যবধানে সরকারি চাকরিতে নারীদের অংশগ্রহণ ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; ২০২১ সালে যা ছিল ২৬ শতাংশ।

সরকারি চাকরিতে নারী ২৯ শতাংশ

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত মোট সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। এর মধ্যে ৪ লাখ ২১ হাজার ৭৮৮ জনই নারী-যা মোট চাকরিজীবীর ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ (প্রায় ২৯%)।

চাকরিতে পদমর্যাদা ও শ্রেণিভিত্তিক বিন্যাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম শ্রেণির পদে মোট ২ লাখ ৬ হাজার ৯৭৩ জন কর্মকর্তার মধ্যে নারী রয়েছেন ৪৬ হাজার ৯৪৫ জন। তবে প্রথম শ্রেণির চেয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির চাকরিতে নারীদের উপস্থিতির হার অনেক বেশি। এই দুই শ্রেণিতেই নারীর অংশগ্রহণ ৩৬ শতাংশ ছাড়িয়েছে। তথ্যানুযায়ী, দ্বিতীয় শ্রেণিতে মোট ২ লাখ ৪০ হাজার চাকরিজীবীর মধ্যে ৮৬ হাজার ৯৯৮ জনই নারী। অন্যদিকে তৃতীয় শ্রেণির ৬ লাখ ৩০ হাজার ৩১৮ জন কর্মচারীর মধ্যে ২ লাখ ২৬ হাজার ৫১৭ জন নারী। তবে চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে নারীদের পদায়ন তুলনামূলক কম; এই শ্রেণিতে নারীর উপস্থিতি ১৬ শতাংশের সামান্য বেশি।

সচিবালয়ে ১৭ নারী সচিব, মাঠ প্রশাসনে রেকর্ড ২১ ডিসি

প্রশাসনের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা পর্যায়ে নারীদের নেতৃত্ব এখন বেশ দৃশ্যমান। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব বা সচিব-সমমর্যাদার ৮৭টি পদের মধ্যে ১৭টিতেই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন নারী কর্মকর্তারা।

গুরুত্বপূর্ণ এসব পদে কর্মরতদের মধ্যে রয়েছেন-আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সচিব) নাসরীন জাহান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি, পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিরানা মাহরুখ, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব (সংস্কার ও সমন্বয়) ফারাহ শাম্মী, জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (সচিব) ড. রওশন আরা বেগম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব জেসমিন নাহার এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম। এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইসরাত চৌধুরী, ফারজানা মমতাজ ও জাহেদা পারভীন।

শুধু সচিবালয়ই নয়, প্রশাসনে জ্যেষ্ঠ পদগুলোতেও নারী কর্মকর্তাদের সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে ৩৫০ জন অতিরিক্ত সচিবের মধ্যে ৭০ জন, ১ হাজার ২১ জন যুগ্ম সচিবের মধ্যে ২৪৬ জন এবং ১ হাজার ৪৮০ জন উপসচিবের মধ্যে ৩৭২ জন নারী কর্মকর্তা কাজ করছেন।

অন্যদিকে মাঠপ্রশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ জেলা প্রশাসকে (ডিসি) অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে বর্তমানে ৬৪ জেলার মধ্যে ২১ জেলাতেই নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারী কর্মকর্তারা। মাঠ প্রশাসনে একসঙ্গে এত বেশিসংখ্যক নারী ডিসি এর আগে কখনো দায়িত্ব পালন করেননি। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সর্বোচ্চ ১৮ জন নারী ডিসি দায়িত্বে ছিলেন।

বিভাগভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগের ১৩টি জেলার মধ্যে ৯টিতেই (ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর) দায়িত্ব পালন করছেন নারী ডিসিরা। এই তালিকায় রয়েছেনঢাকার ডিসি ফরিদা খানম, মুন্সীগঞ্জে সৈয়দা নূরমহল আশরাফী, নরসিংদীতে ইসরাত জাহান কেয়া, মানিকগঞ্জে নাজমুন আরা সুলতানা, কিশোরগঞ্জে সোহানা নাসরিন, টাঙ্গাইলে শরিফা হক, রাজবাড়ীতে আফরোজা পারভীন, শরীয়তপুরে তাহসিনা বেগম ও মাদারীপুরে মর্জিনা আক্তার।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে ৩ জন (কুমিল্লায় রোজী আক্তার, ফেনীতে মনিরা হক ও রাঙামাটিতে নাজমা আশরাফী), খুলনা বিভাগে ৪ জন (খুলনায় হুরে জান্নাত, সাতক্ষীরায় কাউসার আজিজ, চুয়াডাঙ্গায় লুৎফুন নাহার ও মেহেরপুরে শিল্পী রানী রায়), রংপুর বিভাগে ২ জন (কুড়িগ্রামে অন্নপূর্ণা দেবনাথ ও পঞ্চগড়ে মোছা. শুকরিয়া পারভীন), বরিশাল বিভাগে ১ জন (বরগুনায় তাছলিমা আক্তার) এবং রাজশাহী বিভাগে ১ জন (নাটোরে আসমা শাহীন) এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১ জন (শেরপুরে ফরিদা ইয়াসমিন) নারী ডিসি হিসেবে কর্মরত আছেন। তবে মাঠপ্রশাসনের আটটি বিভাগীয় কমিশনার পদের একটিতেও বর্তমানে নারী কর্মকর্তা নেই।

উপজেলা ও ভূমি প্রশাসনে নেতৃত্ব ১৯১ ইউএনও ও ১১৬ এসিল্যান্ডের তৃণমূল পর্যায়ে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে মুখ্য ভূমিকা রাখছেন নারী কর্মকর্তারা। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ৪৯৯টি উপজেলার মধ্যে ১৯১টিতেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে কাজ করছেন নারীরা—যা মোট পদের প্রায় ৩৯ শতাংশ।

একইভাবে সংবেদনশীল ও চ্যালেঞ্জিং হিসেবে পরিচিত ভূমি ব্যবস্থাপনায়ও নারীদের পদায়ন দৃশ্যমান। বর্তমানে সারা দেশে কর্মরত ৪৭৮ জন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি (ল্যান্ড)-এর মধ্যে ১১৬ জন নারী কর্মকর্তা, যা মোট পদের ২৪ শতাংশের বেশি। সব মিলিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অতি গুরুত্বপূর্ণ ১ হাজার ৮৫টি প্রশাসনিক পদের বিপরীতে ৩২২টিতে (৩০.৬%) নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারী সিভিল সার্ভেন্টরা।

দক্ষতা ও যোগ্যতায় এগোচ্ছেন নারী কর্মকর্তারা

কেন্দ্রীয় ও মাঠপ্রশাসনে নারী নেতৃত্বের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধিকে কেবল সংখ্যাগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এটি সিভিল সার্ভিসে নারীদের পেশাদারিত্ব, প্রতিযোগিতা ও মেধার ভিত্তিতে স্থান করে নেওয়ার স্পষ্ট প্রতিফলন।

ঢাকা জেলার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘প্রশাসনে নারী কর্মকর্তাদের এই শক্তিশালী অবস্থান তাদের দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্বের এক বাস্তব প্রতিফলন। ডিসি বা ইউএনওর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী কর্মকর্তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি শুধু সংখ্যার পরিবর্তন নয়; এটি সিভিল সার্ভিসে নারীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের বড় প্রমাণ। কেন্দ্র থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে নারীরা তাদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেই এগিয়ে যাচ্ছেন এবং এটিই হবে আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক চিত্র।’

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাউসার আজিজ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘নারী জেলা প্রশাসকরা তাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, পেশাদারিত্ব এবং তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, সামাজিক সংস্কার এবং রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি কিছু বাধা সৃষ্টি করলেও, এসব চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে আমরা নিষ্ঠার সঙ্গে আমাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।’

বিইউ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর