তিন দিন বন্ধ থাকার পর চট্টগ্রামের মহেশখালীতে আমেরিকান কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ আবারও শুরু হয়েছে। শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয় বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
একইদিন দুপুর দেড়টার দিকে ‘ফ্লেক্স কারেজেস’ নামের এলএনজিবাহী একটি জাহাজ মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালে ভেড়ে। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে কেনা এলএনজি নিয়ে জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যামেরন বন্দর থেকে এসেছে।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, আজ (শনিবার) রাত সাড়ে ৯টার দিকে নতুন আসা এলএনজি টার্মিনালে যুক্ত হবে। এরপর এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ আরও বাড়বে।
কিন্তু এতে কতটা কমবে সারাদেশে চলমান তীব্র গ্যাস সংকট? এ ব্যাপারে আরপিজিসিএলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, রাতে এক্সিলারেট টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বাড়লে সাময়িকভাবে এলএনজি-সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে মহেশখালীর পাশের সামিট গ্রুপের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকেও প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে দুটি টার্মিনাল থেকে প্রায় ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
আরপিজিসিএলের এলএনজি বিভাগের এক উপমহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার কর্মকর্তা বলেন, ‘দুটি টার্মিনালের পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পেতে রোববার (২৩ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে শনিবার রাতেই সরবরাহ বেড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাতে পারে।’
এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিপত্তি শুরু হয় গত ২১ এপ্রিল। ওই সময় এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালের বয়লারে আগুন লাগার পর সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই সপ্তাহ পর টার্মিনালটি সচল হলেও পরে গত বুধবার (১৯ আগস্ট) এলএনজি সংকটে আবারও বন্ধ হয়ে যায় টার্মিনালটি। একই সময়ে একই কারণে সামিটের ভাসমান টার্মিনালও বন্ধ ছিল।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রোববার থেকে দুটি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হতে পারে। দুই টার্মিনাল মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।
এদিকে শনিবার (২২ আগস্ট) মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই।
তিনি বলেন, ‘এটি (বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট) এক মাসে সমাধান হওয়ার মতো সমস্যা নয়। তবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে। জ্বালানি সংকট সমাধান হবে, তবে ধীরগতিতে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে সরকারের জ্বালানি বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সব ধরনের জ্বালানি উৎসের মধ্যে সমন্বয় সাধন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। একইসঙ্গে জ্বালানি খাতে তিন মাসের মজুত নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।’
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরশক্তির ওপর প্রাথমিকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাজেটে এ খাতের জন্য বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে। এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তাদের সৌরশক্তিতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে হবে।’
অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চলমান সংকটে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বেশ কিছু শিল্প কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কিছু কারখানায় আবার সীমিত পরিসরে উৎপাদন অব্যাহত আছে। গ্যাসের তীব্র সমস্যায় ভুগছে আবাসিক বাসিন্দারাও।
এ সম্পর্কে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের পরামর্শ, গার্মেন্টস খাতে শিল্প ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বা রুফটপ সোলারের ব্যবহার বাড়ানো গেলে দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমানে অবর্ণনীয় জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিল্পকারখানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বর্তমান সংকটের চাপ আরও কম থাকত। শিল্প খাতে রুফটপ সোলারকে আরও উৎসাহিত ও সহজতর করা গেলে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে।’
গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘পোশাক খাত খুব নীরবে রুফটপ সোলারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। এতে একদিকে জ্বালানির ওপর চাপ কমবে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রেও গার্মেন্টস খাতের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সহায়তা করবে।’
চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিশ্বে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে চীনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে, যা বাংলাদেশেও কাজে লাগানোর সুযোগ আছে।’
এএইচ




