- রাজধানীতে পাঁচ মাসে বিভিন্ন অপরাধে ৭১০৯ মামলা
- পাঁচ মাসে হত্যা মামলা ৯৪টি, অপহরণ মামলা ৮০টি
- ছিনতাইকারীদের কবল থেকে রেহাই পাচ্ছেন না পুলিশ কর্মকর্তারাও
রাজধানীতে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান ও গ্রেফতারের পরও বিভিন্ন এলাকায় অপরাধী চক্রের তৎপরতা থামছে না। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ মাসে রাজধানীতে বিভিন্ন অপরাধে ৭ হাজার ১০৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৯৪টি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দিন কিংবা রাত—কোনো সময়ই সাধারণ মানুষ বা পথচারীরা নিরাপদ নন। এসব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরাও। রাজধানীর অনেক এলাকায় নিরাপদে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ব্যস্ত সড়ক ও নির্জন গলিতে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বেড়েছে। মোবাইল ফোন, টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করতেও ভয় পান।
এ ছাড়া মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে কিশোর গ্যাং ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের যোগসাজশ রয়েছে। মাদকের বিস্তারের কারণে তরুণ সমাজের একটি অংশ অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, যা সামাজিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন বিভাগের গোয়েন্দা তথ্য বলছে, রাজধানীর সবচেয়ে অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পাঁচটি অঞ্চলকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে রয়েছে মোহাম্মদপুর। এ ছাড়া মিরপুর, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী ও ধানমন্ডিও রয়েছে তালিকায়। এসব এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হয়ে বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে অপরাধীরা কার্যক্রম পরিচালনা করে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, এসব সন্ত্রাসী প্রথমে কাউকে টার্গেট করে বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে হুমকি দেয়। পরে গুলি করে হত্যা কিংবা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করার ঘটনা ঘটায়। তবে আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কারামুক্ত হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে নিজেদের আধিপত্য ও সীমানা নিয়ে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে। এর ফলে এক সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য অন্য গ্রুপের হাতে নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে, রাজধানীতে গত পাঁচ মাসে ৭ হাজার ১০৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনায়। গত পাঁচ মাসে এ ধরনের ২৫৭টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে হত্যার ঘটনায় ৯৪টি, দস্যুতার ঘটনায় ১১০টি, ডাকাতির ঘটনায় ১৭টি এবং অপহরণের ঘটনায় ৮০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য অপরাধে আরও ৬ হাজার ৫৫১টি মামলা হয়েছে।
পুলিশের ওপর হামলা
চলতি মাসের ১৬ জুন রাজধানীর আদাবরে চাপাতি ঠেকিয়ে একটি দোকানে ছিনতাইয়ের ঘটনার পর অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে তাদের আস্তানায় অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানের সময় ছিনতাইকারীরা দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এতে চাপাতির আঘাতে আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল ইসলাম ও উপপরিদর্শক (এসআই) তরুণ আহত হন। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে দুই ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয়। এ ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করা হয়।
তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, আদাবর থানা পুলিশ বেড়িবাঁধ এলাকার একটি কক্ষে অভিযান চালায়। এ সময় সেখানে অবস্থানরত ছিনতাইকারীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এতে আদাবর থানার ওসি ও একজন এসআই আহত হন। হামলার মুখে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালালে দুই ছিনতাইকারী গুলিবিদ্ধ হয়।
এ ঘটনার পর ২০ জুন সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন আহমদ আহত ওসি ও এসআইকে পুরস্কার প্রদান করেন।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অপরাধ দমন এবং মানবিক দায়িত্ব পালনে পুলিশের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। তাদের ভালো কাজকে উৎসাহিত করতেই এ ধরনের স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া ১২ জুন দুপুরে রাজধানীর রামপুরায় বাসার সামনে প্রকাশ্যে গুলি করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে কাইল্যা পলাশকে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার নয় দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনার পর রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে ইমাম হোসেন নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত ফেরদৌস নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে র্যাব।
গুলির ঘটনায় পলাশের স্ত্রী মাহমুদা খানম হাতিরঝিল থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় জিসান আহমেদ মন্টিকে শীর্ষ সন্ত্রাসী উল্লেখ করে প্রধান আসামি করা হয়। এজাহারে আরও যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন—বাদশা ওরফে গুজা বাদশা, গলদা বাদশা, শান্ত ওরফে পিচ্চি শান্ত, সোলাইমান খন্দকার, ফারুক ওরফে চাচা ফারুক, হেবেল, মোল্লা জনি, ফিরোজ মোহাম্মদ মোল্লা, পিচ্চি আলামিন ওরফে তোতলা আলামিন এবং সজীব।
এর আগে চলতি বছরের ৯ মে রাজধানীর সাইন্সল্যাব এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন পুলিশ স্টাফ কলেজে কর্মরত পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা ইয়াসমিন।
তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ৯ মে দিবাগত রাতে তিনি রিকশায় করে সাইন্সল্যাব এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে পৌঁছালে একটি মোটরসাইকেল এসে তার ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায়। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন মোটরসাইকেলটি রিকশার সঙ্গে ধাক্কা লেগেছে। পরে বুঝতে পারেন ব্যাগটি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি অটোরিকশা নিয়ে তাদের পিছু নিলেও কাউকে ধরতে পারেননি। তার ব্যাগে একটি স্যামসাং মোবাইল ফোন ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিল। এ ঘটনায় তিনি ধানমন্ডি থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মত
সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ও ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার নাঈম আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে পুলিশের কার্যক্রমে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। পুলিশের কিছু সদস্যের কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো বাহিনী বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়ে। এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে সন্ত্রাসীরা। ফলে তারা সহজেই তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছে।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে শিক্ষার্থীকে গলা কেটে হত্যা
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা হিসাব করে চলাফেরা করে এবং তাদের তৎপরতা কমিয়ে দেয়। অপরাধ সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। কখনো বড় ঢেউ হয়ে আসে, আবার কখনো ছোট ঢেউ হয়ে আসে। অপরাধ বাড়ে, আবার কমেও। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, দেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থায় ধাক্কা লেগেছে। এতে বাহিনীর মনোবলেও প্রভাব পড়েছে। এসব কারণেই অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যদি দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পারে, তাহলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
সমাজবিজ্ঞানী, অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে বেকারত্ব, সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে কাজ করছে। দেশের অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নিয়ে সরকারকে কঠোরভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু গ্রেপ্তার অভিযান চালালেই হবে না। এসব এলাকায় কাউন্সেলিং, শিক্ষার মানোন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ এবং সামাজিক কাঠামোগত উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
তৌহিদুল হক আরও বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এরপর ঝুঁকির মাত্রা অনুযায়ী সেগুলোকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে বেশি অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে সামাজিক পুনর্বাসন ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। শুধু বারবার গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালে অপরাধের স্থায়ী সমাধান হবে না।
একেএস/এআর




