- প্রকাশ্যে গুলি করে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে
- বেড়েছে ধর্ষণ, ডাকাতি, অপহরণের মতো অপরাধও
- বেশির ভাগ খুন পূর্বশত্রুতার জেরে
রাজধানীতে গত সাড়ে পাঁচ মাসে খুনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বেড়েছে। এতে ঢাকাবাসীর মধ্যে অস্বস্তি ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। রাস্তায় বের হলে ছিনতাই, বাসায় থাকলে ডাকাতি কিংবা খুন হওয়ার ভয় তাড়া করছে অনেককে। বেশির ভাগ ঘটনায় অপরাধীরা গ্রেফতার হলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় খুনের বড় অংশই পূর্বশত্রুতার জেরে ঘটছে। এর মধ্যে ফাঁদে ফেলে হত্যা, লাশ টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার মতো নির্মম ঘটনাও রয়েছে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত রাজধানীতে বেশির ভাগ খুনের ঘটনা ঘটেছে পূর্বশত্রুতার জেরে। এসব ঘটনা কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে ঘটেছে। কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। নিহতদের মধ্যে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যান বলছে, গত সাড়ে পাঁচ মাসে খুনের ঘটনা ঘটেছে ৯৮টি। এর মধ্যে মে মাস পর্যন্ত ৯৪টি এবং চলতি মাসে চারটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও চলতি মাসে তিনটি প্রকাশ্যে গুলি করে প্রতিপক্ষকে আহত ও টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। সব মিলিয়ে ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি বলে মনে করছেন অনেকে।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে ২ পুলিশ সদস্য আহত
বিজ্ঞাপন
ডিএমপির তথ্যমতে, মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে জানুয়ারিতে খুনের ঘটনা ঘটেছে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি, মার্চে ২৪টি, এপ্রিলে ১৭টি এবং মে মাসে ১৬টি। জানুয়ারি ও মার্চে খুনের ঘটনা তুলনামূলক বেশি ছিল।
অন্যদিকে অন্যান্য অপরাধের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও দস্যুতার ঘটনা মোটামুটি একই হারে চলমান রয়েছে। নগরীতে সবচেয়ে বেশি বাড়ছে নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনা। রামিসার মতো কিছু ঘটনা মিডিয়ায় আসলে আলোচনায় আসে, কিন্তু বেশির ভাগ ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।
গত পাঁচ মাসে নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনায় এপ্রিল ছিল সবচেয়ে বেশি ঘটনার মাস। ওই মাসে ৭০টি ঘটনা ঘটে। তার আগের ও পরের মাসে ৫৬টি করে ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগ ঘটনায় মামলা হচ্ছে না। যেসব ঘটনা কোনোভাবে চেপে রাখা যাচ্ছে না, সেগুলোই থানায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও মামলা হওয়ার পর সালিশ-মীমাংসার ঘটনাও ভেতরে ভেতরে ঘটছে। পাঁচ মাসে নারী ও শিশু ধর্ষণের গড় ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।
ডিএমপির তথ্যমতে, মে মাসে ডাকাতি ২টি, দস্যুতা ৩৩টি, খুন ১৬টি, নারী ও শিশু ধর্ষণ ৫৬টি, অপহরণ ১৩টি এবং অন্যান্য অপরাধে ১ হাজার ৩৬৫টি মামলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে শিক্ষার্থীকে গলা কেটে হত্যা
এপ্রিলে ডাকাতি ৩টি, দস্যুতা ২৫টি, খুন ১৭টি, নারী ও শিশু ধর্ষণ ৭০টি, অপহরণ ২১টি এবং অন্যান্য অপরাধে ১ হাজার ৪৮৮টি মামলা হয়েছে।
মার্চে ডাকাতি ৫টি, দস্যুতা ২৫টি, খুন ২৪টি, নারী ও শিশু ধর্ষণ ৫৬টি, অপহরণ ২০টি এবং অন্যান্য অপরাধে ১ হাজার ৩০৫টি মামলা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে ডাকাতি ৩টি, দস্যুতা ২৩টি, খুন ১৬টি, নারী ও শিশু ধর্ষণ ৩৭টি, অপহরণ ১২টি এবং অন্যান্য অপরাধে ১ হাজার ৪১টি মামলা হয়েছে।
জানুয়ারিতে ডাকাতি ৪টি, দস্যুতা ২৯টি, খুন ২১টি, নারী ও শিশু ধর্ষণ ৩৮টি, অপহরণ ১৪টি এবং অন্যান্য অপরাধে ১ হাজার ৩৫২টি মামলা হয়েছে।
নগরীতে দস্যুতার ঘটনা ঘটছে, কিন্তু সেগুলো তেমন আলোচনায় আসছে না। থানায় মামলা হওয়ার পর শুধু সংখ্যাই জানা যাচ্ছে। ফলে গত পাঁচ মাসে এ ধরনের অপরাধ কমেনি, বরং প্রায় একই হারে চলছে।
যে খুনের ঘটনাগুলো আলোড়ন তুলেছিল
ঢাকায় গত ১৯ মে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলে পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তার হত্যাকাণ্ড। কারণ রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে তার মস্তক বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ ঘটনা ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই দুই অপরাধী সোহেল (৩২) ও তার স্ত্রী স্বপ্না (২৩) গ্রেফতার হয়। ঘটনার আগে নিহতের বাবা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না।’ পরে সেই মামলায় আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ড দেন।
এর দুই দিন আগে ১৭ মে রাজধানীর মান্ডায় আট টুকরো করা এক পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের টুকরোগুলো বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। পরে নিহতের পরিচয় শনাক্ত হয়। প্রবাসী মোকাররম মিয়ার (৩৭) সাবেক প্রেমিকা তাসলিমা আক্তার, তার বান্ধবী হেলেনা বেগম ও হেলেনার মেয়ের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ ওঠে। হত্যার পর লাশ টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিকে ভরে ফেলা হয়। এখানেই শেষ নয়, হত্যার পর তারা বিরিয়ানি খায় এবং রাতে একটি বাসার ছাদে পার্টিও করে—যা অনেককে অবাক করেছে।
চলতি মাসে চারটি খুন
গত ১ জুন থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় চারটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে ভাইয়ের হাতে ভাই হত্যা, হানিট্রাপে পড়ে একজনের মৃত্যু, পূর্বশত্রুতার জেরে যুবককে হত্যা এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা। এছাড়াও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে ভোরে অটোরিকশায় বাসায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীর টানাটানিতে পড়ে গুরুতর আহত এক নারীর মৃত্যু হয়।
১ জুন রাজধানীর কলাবাগান ফ্রি স্কুল স্ট্রিট এলাকার বাসায় ছোট ভাইয়ের ডাম্বেলের আঘাতে সাদমান ওয়াসিফ সুপান্ত (১৭) নামে এক বড় ভাইয়ের মৃত্যু হয়। সুপান্ত এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। খবর পেয়ে রাত ১টার দিকে স্কয়ার হাসপাতাল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই রাফিদ আরিয়ান শুদ্ধ (১৬) আটক করা হয়েছে।
গত ৩০ মে টঙ্গীর বাসা থেকে লোকমান সরদার বের হন। পরে তিনি ফিরে না আসায় পরিবার থানায় জিডি করে। ২ জুন তুরাগ নদীতে প্লাস্টিকের বস্তায় একটি মরদেহ পাওয়া যায়। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। তদন্তে পিবিআই জানতে পারে, হানিট্রাপে ফাঁদে ফেলে লোকমানকে বাসায় নেওয়া হয়েছিল এবং মুক্তিপণ আদায়ের পর তাকে হত্যা করা হয়। পরে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
৭ জুন রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় কথা কাটাকাটির সূত্র ধরে আব্দুল মান্নান নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। হত্যাকারীদের একজন তার বন্ধু ছিল। ঈদের এক সপ্তাহ আগে ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে তার বন্ধু রাজন দেওয়ান সুমনের সঙ্গে তার মনোমালিন্য হয়। এরপর পরদিন দুপুরে মীর হাজিরবাগ এলাকায় যাওয়ার পথে তাকে হত্যা করা হয়।
১০ জুন রাজধানীর মৌচাক এলাকার আনারকলি মার্কেটের সামনে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লালকে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সিরাজ ও গোল্ডেন রাকিব নামে দুজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
সাত দিনে নগরীতে তিনটি প্রকাশ্যে গুলির ঘটনা
৭ জুন থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত মতিঝিল, পল্লবী ও হাতিরঝিলে প্রকাশ্যে গুলি করে আহত করার ঘটনা ঘটে। পল্লবী ও হাতিরঝিলে দুই সন্ত্রাসী গ্রুপের দ্বন্দ্বে এবং মতিঝিলে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে ব্যাংকপাড়ায় ১৪ লাখ টাকা বহনকারী ব্যক্তিকে গুলি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সব মিলিয়ে নগরীতে গুলির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এর আগে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় রাতে জনসম্মুখে গুলি করে শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনাও সন্ত্রাসী গ্রুপের দ্বন্দ্বের ফল বলে জানা গেছে।
পুলিশ ও অপরাধ বিজ্ঞানীরা যা বলছেন
ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের এডিসি নিয়াজ মেহেদী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘প্রত্যেকটি ঘটনায় আসামি ধরতে পুলিশ তৎপর। অপরাধ কমিয়ে আনতে পুলিশের জায়গা থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে। বেশির ভাগ ঘটনায় অপরাধীরা গ্রেফতার হচ্ছে। প্রিভেন্টিভ পুলিশিংও চলছে। জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারলে অপরাধ আরও কমে আসবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, একসময় অভাব বা মাদকের কারণে অপরাধ বেশি হতো। কিন্তু এখন পেশাদার অপরাধী তৈরি হয়েছে। ফলে আগের কাঠামো দিয়ে বর্তমান অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ব্যবস্থাগত সংস্কার এবং প্রক্রিয়াগত পরিবর্তন আনতে হবে। তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে স্বস্তি আসবে।
এমআইকে/এআর




