সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

সরকারি তথ্যে জনআস্থা ফেরাতে উন্মুক্ত হচ্ছে ‘মাইক্রোডেটা বিশ্লেষণাগার’

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ জুন ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম

শেয়ার করুন:

সরকারি তথ্যে জনআস্থা ফেরাতে উন্মুক্ত হচ্ছে ‘মাইক্রোডেটা বিশ্লেষণাগার’
বিবিএসের নবপ্রতিষ্ঠিত মাইক্রোডেটা বিশ্লেষণাগার নিয়ে আয়োজিত অংশীজন সচেতনতামূলক এক কর্মশালায় পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকী। ছবি: ঢাকা মেইল

গবেষণা, নীতিনির্ধারণ এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় সরকারি পরিসংখ্যানের কার্যকর ব্যবহার বাড়াতে নিরাপদ মাইক্রোডেটা বিশ্লেষণাগার (মাইক্রোডেটা অ্যানালাইসিস ল্যাব) চালু করছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। এই বিশ্লেষণাগারের মাধ্যমে অনুমোদিত গবেষক, শিক্ষার্থী, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা বিবিএসের গোপনীয়তা-সুরক্ষিত মাইক্রোডেটা ব্যবহার করে গভীরতর গবেষণার সুযোগ পাবেন। তবে কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তি-পর্যায়ের তথ্য ল্যাবের বাইরে নেওয়া যাবে না। কঠোর নিরাপত্তা, গোপনীয়তা সুরক্ষা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরিচালিত হবে এই কার্যক্রম।

সোমবার (২২ জুন) রাজধানীর পরিকল্পনা কমিশনের একনেক সম্মেলন কক্ষে বিবিএসের নবপ্রতিষ্ঠিত মাইক্রোডেটা বিশ্লেষণাগার নিয়ে আয়োজিত অংশীজন সচেতনতামূলক এক কর্মশালা এর তথ্য তুলে ধরা হয়।

কর্মশালায় জানানো হয়, দেশের সরকারি পরিসংখ্যানকে শুধু প্রতিবেদন বা প্রকাশিত সারণিতে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, নীতিনির্ধারণ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনায় আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। 

বিবিএস জানায়, দেশের বিভিন্ন শুমারি, জরিপ ও পরিসংখ্যান কার্যক্রমের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সরকারি তথ্য উৎপাদিত হলেও গবেষকদের জন্য এসব তথ্যের গভীর বিশ্লেষণ সবসময় সহজ ছিল না। বিশেষ করে ব্যক্তি-পর্যায়ের তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে গোপনীয়তা রক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তথ্য ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন ছিল। নতুন মাইক্রোডেটা বিশ্লেষণাগার সেই সীমাবদ্ধতা দূর করবে।  

নতুন ব্যবস্থায় গবেষক বা ব্যবহারকারীকে প্রথমে অনলাইনে আবেদন করতে হবে। আবেদনপত্রে ব্যক্তিগত পরিচয়, প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন, গবেষণার উদ্দেশ্য এবং প্রয়োজনীয় ডেটাসেটের তথ্য দিতে হবে। এরপর বিবিএস আবেদন যাচাই করে তথ্যপ্রাপ্তির নীতিমালা ও গোপনীয়তার শর্ত পূরণ হলে অনুমোদন দেবে। অনুমোদনের আগে ব্যবহারকারীকে গোপনীয়তা চুক্তি, ব্যবহারকারী চুক্তি এবং নির্ধারিত কার্যপদ্ধতি অনুসরণের অঙ্গীকার করতে হবে

মাইক্রোডেটা বিশ্লেষণাগারে গবেষকরা শুধুমাত্র বিবিএসের নির্ধারিত নিরাপদ কর্মপরিবেশে কাজ করতে পারবেন। সেখানে থাকবে কেন্দ্রীয় সার্ভার, গবেষণার জন্য পৃথক ওয়ার্কস্টেশন, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার এবং নিয়ন্ত্রিত স্থানীয় নেটওয়ার্ক। নিরাপত্তার স্বার্থে সরাসরি ইন্টারনেট সংযোগ, ই-মেইল কিংবা বাহ্যিক সংরক্ষণ যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ থাকবে না।  

বিবিএসের ভাষ্য অনুযায়ী, গবেষকরা তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারলেও কোনো কাঁচা তথ্য, ব্যক্তি-পর্যায়ের রেকর্ড কিংবা গোপনীয় মাইক্রোডেটা ল্যাবের বাইরে নিতে পারবেন না। শুধুমাত্র যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদিত সারণি, চিত্র, পরিসংখ্যানগত ফলাফল, প্রোগ্রাম কোড বা লিখিত বিশ্লেষণ বাইরে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। এ জন্য পৃথক পর্যালোচনা কমিটি প্রতিটি আউটপুট পরীক্ষা করবে। 

উপস্থাপনায় জানানো হয়, তথ্য সুরক্ষায় একাধিক স্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মাইক্রোডেটা থেকে নাম, ঠিকানাসহ প্রত্যক্ষ পরিচয় শনাক্তকারী তথ্য অপসারণ করা হবে। পাশাপাশি ব্যবহারকারীর প্রবেশাধিকার, সার্ভার লগ, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, গোপনীয়তা চুক্তি, নিয়মিত তদারকি এবং আকস্মিক নিরীক্ষার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করা হবে। 

এ উদ্যোগের মাধ্যমে গবেষক, শিক্ষার্থী, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকেরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন বলে মনে করছে বিবিএস। গবেষকরা দারিদ্র্য, শ্রমবাজার, উৎপাদনশীলতা, কল্যাণ, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক সূচকের গভীর বিশ্লেষণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণ, কর্মসূচি মূল্যায়ন এবং লক্ষ্যভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণেও নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া সহজ হবে।  

বিবিএস আরও জানায়, ব্যবহারকারীদের জন্য একটি ডিজিটাল তথ্যভাণ্ডারও তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ডেটাসেটের তালিকা, বিষয়ভিত্তিক অনুসন্ধান, বছরের ভিত্তিতে বাছাই, মেটাডেটা এবং বিভিন্ন তথ্য বিন্যাসে প্রয়োজনীয় নথি পাওয়া যাবে। এর ফলে গবেষকরা গবেষণা শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় তথ্য সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন এবং যথাযথ ডেটাসেট নির্বাচন করতে পারবেন। 

কর্মশালায় জানানো হয়, বর্তমান পর্যায়ে বিবিএস সদর দপ্তরে নিরাপদ অন-সাইট বিশ্লেষণাগারের মাধ্যমে সেবা দেওয়া হবে। পরবর্তী ধাপে তথ্যভাণ্ডার ও মাইক্রোডেটা সেবা আরও সম্প্রসারণ করে নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল প্রবেশাধিকার চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সাল এবং এর পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে আরও বিস্তৃত অনলাইন মাইক্রোডেটা সেবা চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বিবিএস। 

কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকী বলেন, ‘সরকারি বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিসংখ্যান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে জনমনে যে প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে সরকার তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ ব্যবস্থায় আরও স্বচ্ছতা আনতে চায়।’

তিনি বলেন, ‘নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া উন্নয়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন, নীতির কার্যকারিতা পরিমাপ এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করা সম্ভব নয়। সরকার চায় গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিক স্বাধীনভাবে সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে পারেন। বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি তথ্য না থাকলে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, দরিদ্রতা কমানো কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কতটা সফল হচ্ছে, তা নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা যায় না।

জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকী বলেন, ‘সরকারের উদ্দেশ্য শুধু তথ্য উন্মুক্ত করা নয়, বরং স্বাধীন গবেষণাকে উৎসাহিত করা, যাতে উন্নত গবেষণার মাধ্যমে সরকারি নীতিমালা আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হয়। উন্নতমানের তথ্য সহজলভ্য হলে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো আরও গভীর গবেষণা করতে পারবে, যা জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার কারণে এখনই সংবেদনশীল মাইক্রোডেটায় অনলাইনে প্রবেশাধিকার দেওয়া সম্ভব নয়। তবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হলে ধাপে ধাপে এ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।’

পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব মো. ফিরোজ সরকার বলেন, ‘দেশের পরিসংখ্যান সেবাকে আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে এই গবেষণাগার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। স্বচ্ছ আবেদন প্রক্রিয়া, সুস্পষ্ট কার্যপদ্ধতি এবং ব্যবহারকারীবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা হবে।’

বিবিএসের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন এই গবেষণাগার শিক্ষার্থী, গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য সরকারি মাইক্রোডেটা ব্যবহারে একটি নিরাপদ ও সুশাসনভিত্তিক কাঠামো তৈরি করবে।’

বাংলাদেশে কোইকার কান্ট্রি ডিরেক্টর জিহুন কিম বলেন, ‘বিবিএসের সঙ্গে যৌথভাবে ডেটা প্ল্যাটফর্ম, ডেটা ওয়্যারহাউস এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশের পরিসংখ্যান অবকাঠামো আধুনিকায়নে কাজ করছে কোইকা।’

কোরিয়ান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (কোইকা) সহায়তাপ্রাপ্ত ‘ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অব স্ট্যাটিসটিকস সার্ভিস বেইজড অন প্ল্যাটফর্ম (সিবিএসএসপি)’ প্রকল্পের আওতায় এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এতে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এএইচ/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর