সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ঢাকা

বেনজীর আহমেদকে ঘিরে যত বিতর্ক

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:৫২ পিএম

শেয়ার করুন:

B
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। ফাইল ছবি

# শাপলা চত্বর অভিযানে ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
# গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ
# র‍্যাবের সাবেক প্রধান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
# মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ ও তথ্যপ্রবাহ সীমিত করার অভিযোগ
# ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
# পদোন্নতি ও পদায়নে অনিয়মের অভিযোগ
# র‌্যাবের মহাপরিচালকের সময় বেশি গুমের ঘটনা

এক সময় দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিল বেনজীর আহমেদের। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দুই বছরেরও বেশি সময়। তার আগে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার এবং র‍্যাবের মহাপরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন। 


বিজ্ঞাপন


এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার সময় তার বিরুদ্ধে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনিক অনিয়মসহ নানা অভিযোগ ওঠে। কিন্তু ভয়ে অনেকে প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস পেতেন না। অবসরে যাওয়ার পর বেনজীরের বিরুদ্ধে আসতে থাকে একের পর এক অভিযোগ।

দেশ ছেড়ে যাওয়া বেনজীর আহমেদ মাঝে কিছুদিন আলোচনার বাইরে থাকলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতারের পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন।

অভিযোগের অন্ত নেই বেনজীরের বিরুদ্ধে

ডিএমপির কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বেনজীর আহমেদ নানা অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। বদলি বাণিজ্য, ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে সুবিধা নেওয়া, বাসা থেকে মডেলদের তুলে আনা, অন্যের সম্পত্তি রাতের আধারে দখল, ভিন্ন মতের লোকদের তুলে এনে গুম-খুনের মতো অপরাধের সঙ্গেও তার নাম আসে। অনেকে তার এসব কর্মকাণ্ড জানলেও বলার সাহস পেতেন না।


বিজ্ঞাপন


মতিঝিলের ৫ মে হেফাজত কর্মীদের গণহত্যার সঙ্গেও সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত পুলিশের সাবেক এই মহাপরিদর্শকের নাম। সেই সময়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের অফিসার ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা তার নানা অপরাধের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।

শাপলা চত্বর অভিযানে বিতর্ক

২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের সময় ডিএমপি কমিশনার ছিলেন বেনজীর আহমেদ। ওই অভিযানে হতাহতের সংখ্যা ও ঘটনার প্রকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।

সেদিন ঘটনাস্থলে ছিলেন হেফাজতে ইসলামের এমন কয়েকজন কর্মী দাবি করেন, অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ভূমিকা রেখেছিলেন। তাদের মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও উল্লেখ করেন তারা।

হেফাজতের কয়েকজন কর্মী জানান, একমাত্র বেনজীরের কারণে সেদিন গণহত্যা চলেছে। শেখ হাসিনাকে খুশি করতে এই গণহত্যা চালায় বেনজীর।

‘শিবির দেখলেই গুলি’ মন্তব্যের অভিযোগ

২০১৩ সালের ২৮ জানুয়ারি রাজধানীর কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে আহত পুলিশ সদস্যদের দেখতে যান তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার। তার সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পুলিশ সদস্যদের খোঁজ-খবর নেওয়ার সময় তাদের উদ্দেশ্য করে বেনজীর বলেন, ‘অস্ত্র ছিলো না, গুলি করতে পারনি? এখন থেকে শিবির দেখামাত্র গুলি করবা।’

পরবর্তী সময়ে এ ধরনের মন্তব্য নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বেনজীর আহমেদ তা অস্বীকার করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেই অনুষ্ঠান কাভার করা এক সংবাদকর্মী বলেন, ‘বেনজীর সেদিন এই নির্দেশ দিয়েছিলেন ওই সময় আমি পাশেই ছিলাম। তিনি আহত এক পুলিশ সদস্যের বেডের কাছে গিয়ে তাকে বলেছিলেন।’

বিরোধী মতের লোকদের গুলির নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ

বেনজীরের সাবেক এক সহকর্মী বলেন, বেনজীর ছিলেন ঠাণ্ডা মাথার খুনি। তিনি বিরোধী মতের লোকজনকে গুলি করে হত্যা ও গুম করার নির্দেশ দিতেন। শুধু কি তাই, প্রতিটি মিটিংয়ে যারা সরকারবিরোধী তাদের গুম করার জন্য উৎসাহিত করতেন। বিভিন্ন পুরস্কারও দিতেন। বেনজীর র‌্যাবের মহাপরিচালক থাকাকালীন বেশি ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটে। তিনি প্রতিটি র‌্যাব কমান্ডারকে ক্রসফায়ার করার নির্দেশ দিতেন। ২০১৮ সালের ২৬ মে কক্সবাজারের টেকনাফে একরামুল হককে ক্রসফায়ারে দেওয়ার সময় র‍্যাবের ডিজি ছিলেন বেনজীর। তার নির্দেশেই ইকরামকে হত্যা করা হয়। যদিও সেই ঘটনায় এখনো বেনজীরকে আসামি করা হয়নি।

জানা গেছে, বেনজীর র‌্যাবের মহাপরিচালককের দায়িত্বে থাকাকালে বেশি ক্রসফায়ার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। এর প্রেক্ষিতে ২০২১ সালে র‍্যাবের সাবেক প্রধান হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ বেনজীর আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। 

গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ

বেনজীর ডিএমপির কমিশনার থাকাকালে অনেক গুমের ঘটনা ঘটে। যেগুলোর কোনো বিচার পায়নি পরিবারগুলো। এমনকি সেই স্বজনকেও খুঁজে পায়নি অনেকে। বেনজীরের সময় গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা বাসা বাড়ি থেকে তুলে এনে বিরোধী মতের লোকজনকে গুম করতেন। বেনজীর আইজিপি হওয়ার আগে ও পরে বিভিন্নভাবে পুলিশ কর্মকর্তাদের গুম করতেন, যা ২০২৪ সালে অন্তর্র্বতী সরকারের সময়ে গুম কমিশনের দ্বিতীয় প্রতিবেদনের ষষ্ঠ অধ্যায়ে ওঠে আসে। সেই প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে, বেনজীর ছিলেন হাসিনার গুম সিরিজের অন্যতম সহযোগী ও মাস্টারমাইন্ড।

পদোন্নতি ও নিয়োগে পক্ষপাতের অভিযোগ

পুলিশের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বেনজীর আহমেদের সময় নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে রাজনৈতিক বিবেচনা এবং আঞ্চলিক প্রভাব কাজ করে। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু জেলার কর্মকর্তারা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেয়েছেন। তাদের দিয়ে তিনি নানা অপকর্ম করাতেন। পুলিশে নিয়োগের সময়ও গোপালগঞ্জের পরিচয় থাকলে যোগ্যতা না থাকলেও তাদেরকে চাকরিতে ঢুকিয়েছেন তিনি। তার পছন্দের জেলার বাইরের কেউ থাকলে পদোন্নতি পেতে সমস্যা হতো তার।

আইজিপি থাকাকালীন বিএনপি ও জামায়াতপন্থী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতেন না বলেও অভিযোগ আছে বেনজীরের বিরুদ্ধে। তার সময়ে অনেক মেধাবী পুলিশ অফিসারদের তিনি ওএসডি করে রেখেছিলেন বলে একাধিক সাবেক পুলিশ সদস্য অভিযোগ করেছেন।

গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ শুরু হয় তার সময় থেকে

র‌্যাবের ডিজি থেকে পুলিশের মহাপরিদর্শক হওয়ার পর বেনজীর আহমেদ আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। পুলিশ সদর দফতরে সাংবাদিক প্রবেশ, তাদের তথ্য নেওয়া ও কোন সাংবাদিক কোন কোন পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে যেতো, তা লিপিবদ্ধ করার নিয়ম চালু করেন। তার সময়ে সাংবাদিকদের তথ্য দিতে অঘোষিত একটি নিষেধাজ্ঞাও জারি করা হয়।

এছাড়াও বাংলাদেশ পুলিশের সদর দফতরের ওয়েবসাইটে সকল মাসিক ও বছর ওয়ারী অপরাধের তথ্য প্রকাশ করার নিয়ম থাকলেও বেনজীর তা বন্ধ করে দেন। এতে সাংবাদিকদের তথ্যপ্রাপ্তি কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া অপরাধসংক্রান্ত কিছু পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা হয়। এতে অপরাধ পরিস্থিতি সম্পর্কে জনসাধারণের তথ্যপ্রাপ্তি সীমিত হয়েছিল।

তবে পুলিশ প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সে সময় এসব পদক্ষেপকে প্রশাসনিক প্রয়োজন ও নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

এমআইকে/এমআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর