রাজধানীর মশা নিধনে আবারও মশানাশক ওষুধ ‘ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস ইসরায়েলেনসিস’ বা বিটিআই আনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। সংস্থাটি বলছে, বিটিআই আমদানির প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এবার আমদানি করা হবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। দেশটি থেকে এটি সংগ্রহে জেনিটিকাসহ দুটি প্রতিষ্ঠানও চূড়ান্ত করা হয়েছে। ঠিক করা হয়েছে দরদামও। সবকিছু ঠিক থাকলে খুব শিগগিরই এটি দেশে এসে পৌঁছাবে।
জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী শনিবার (১১ এপ্রিল) ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের (বিটিআই আমদানির) ফাইলটা একেবারে প্রস্তুত। এ সংক্রান্ত সব অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রসিডিউর (প্রশাসনিক প্রক্রিয়া) এখন শেষ।’
বিজ্ঞাপন
বিটিআই মূলত এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া জাতীয় মশানাশক। এটি প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে প্রাপ্ত ব্যাকটেরিয়া, যা প্রয়োগে মশার লার্ভা কার্যকরভাবে মেরে ফেলতে পারে। যদিও এটি প্রাপ্তবয়স্ক বা উড়ন্ত মশা ধ্বংস করতে পারে না।
তবে দৌরাত্ম্য লাগবে মশার লার্ভা ধ্বংসে বিটিআই বেশ কার্যকর এবং প্রয়োগে সফলতাও পেয়েছে বিভিন্ন দেশ। এ কারণে রাজধানীর মশা নিয়ন্ত্রণে দেশে কয়েক বছর আগে একবার বিটিআই আনা হয়েছিল। কিন্তু জালিয়াতি ও প্রতারণার কারণে সেটি আর ব্যবহার করা যায়নি। তবে আবারও নতুন করে বিটিআই আনার প্রক্রিয়া চলছে। সেই প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত বলে ডিএনসিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আহ্বান করেছিলাম। লাইসেন্সধারী দুইটা কোম্পানি আমাদের (বিটিআই) সরবরাহ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের সঙ্গে দরদামও ঠিক হয়েছে। এর বাইরেও আমাদের সব প্রক্রিয়া শেষ।’
রাজধানীতে বিটিআই ব্যবহারের পরিকল্পনা কী?
রাজধানীর মশা নিধনে দুই ধরনের কীটনাশক ব্যবহার করে আসছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। ব্যবহৃত দুটিই কীটনাশকই কেমিক্যাল জাতীয় ওষুধ। একটি মশার লার্ভা ধ্বংসে এবং অন্যটি প্রাপ্ত বয়স্ক বা উড়ন্ত মশা মারতে ব্যবহার করা হয়। তবে এখন বিটিআই আনলেও আগের ওষুধগুলো ব্যবহার চালু রাখবে বলে জানিয়েছে ডিএনসিসি।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, বিটিআই মূলত ‘সাপ্লিমেন্ট’ হিসেবে কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যবহার করা হবে। প্রধানত ডিএনসিসি আওতাধীন জলাশয়ের পাশাপাশি নার্সারি ও বাগানগুলোতে এটি প্রয়োগ করা হবে।
ডিএনসিসি প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিটিআই সুবিধাটা হচ্ছে, এটা জৈব বালাইনাশক বা জৈব কীটনাশক। এটা কোনো কেমিক্যাল না, এটা মাটির ব্যাকটেরিয়াকে ব্যবহার করে মশার লার্ভা ধ্বংস করে। আমরা এটা ব্যবহার করবো সাপ্লিমেন্ট হিসেবে। পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা হবে বিটিআই।’
প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের দেশে নালা-নর্দমা, পচা দুর্গন্ধযুক্ত যে খালগুলো আছে সেগুলোতে বিটিআই খুবটা বেশি কাজ করবে না। তবে যে জলাশয়গুলোতে মাছ চাষ করা হয়, জলজ প্রাণী উদ্ভিদ থাকে- এগুলো সংরক্ষণের জন্য বিটিআইটা হলো বেস্ট (সেরা)। এমন ক্ষেত্রে কেমিক্যাল না দিয়ে বিটিআই দেওয়া হয়। আবার ফুলের টবে কেমিক্যাল দিলে গাছগুলো মারা যায়, আমরা ফুলে টবে বিটিআই দিতে পারবো এবং ছয় হাজার বিঘা জলাশয়ে দিতে পারবো। সেগুলোকে টার্গেট করেই আমরা বিটিআই আনার পরিকল্পনা করেছি।’
‘আমাদের যে কন্ডিশন (পরিবেশ), যেখানে কেমিক্যাল পুরোপুরি বাদ দিয়ে বিটিআই রিপ্লেস করা যাবে না। কেমিক্যাল চলতে হবে, এরপাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় বিটিআই এপ্লাই করবো। যেখানে জলজ প্রাণী আছে যেখানে জলজ উদ্ভিদ আছে সেসব জায়গায় এটা ব্যবহার করা হবে। মেইন টার্গেট ফুলের টব’, যোগ করেন প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের যেগুলোর সার্ভে হয়েছে আমরা করেছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করেছে। অন্যান্য যারা করেছে, সবগুলোতেই দেখা গেছে- ফুলের টবের নীচে যে প্লেট থাকে সেগুলো লার্ভা জন্মানোর অন্যতম প্রধান একটা সোর্স। ওইখানে আমরা আবার কোনো কীটনাশক দিতে পারি না।’
‘যারা এই টবগুলোর মালিক, যারা বাগান চাষ করেন তারাও দেন না। নার্সারীতে আমরা কেমিক্যাল ব্যবহার করতে পারি না, কারণ ক্ষতি হয়। এই জায়গাগুলোতে যদি বিটিআইটা দিয়ে রাখি মাটির সাথে, এটা মাটিরই একটি ব্যাকটিরিয়া- তাহলে এটা লার্ভার বিরুদ্ধে ভালো কাজ করবে। সুতরাং এটা (বিটিআই) আমাদের মশক নিধনে নতুন একটি মাত্রা সৃষ্টি করবে’, প্রত্যাশা এই কর্মকর্তার।
বিটিআই কতটা কার্যকর ও পরিবেশের উপর প্রভাব কেমন?
ভারত-চীন-জাপানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই মশার লার্ভা ধ্বংসে বিটিআই ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশেও এটি ব্যবহার করে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা (সিডিসি) বলছে, বিশ্বে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে বিটিআইয়ের ব্যবহার চলছে। তবে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিটিআই সবচেয়ে কার্যকর।
বিটিআই ব্যবহারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বাণিজ্যিকভাবে অ্যাকোয়াব্যাক, টেকনার, ব্যাকটিমোস এবং ভেক্টোব্যাক ট্রেড নামে বিটিআই বিক্রি হয়। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, সেখানে বড়ি, তরল, গুলি, পাউডারসহ নানাভাবে বিটিআই পাওয়া যায়।
মূলত মশাবাহিত রোগ কমাতে যখন গোষ্ঠীগতভাবে মশা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগ মশার প্রজননস্থলে লার্ভানাশক প্রয়োগকে প্রাধান্য দেয়। পূর্ণাঙ্গ মশা মারার স্প্রের চেয়ে লার্ভানাশক বেশি কার্যকর ও কম বিষাক্ত, এবং এই প্রয়োগের ফলে মানুষের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা কম থাকে।
ওয়াশিংটন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে, অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, বিটিআইয়ের সংস্পর্শে এলেও পোষা প্রাণীদের স্বাস্থ্যগত প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। গবেষণাগারে প্রাণীদের মধ্যে যারা উচ্চ ঘনত্বের বিটিআই গ্রহণ করে, তাদের উপর কোনো পরিমাপযোগ্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব দেখা যায়নি।
তাছাড়া এটির সংস্পর্শে আসার পর মানুষের স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কিত ঘটনা অত্যন্ত বিরল। অর্থাৎ, বিটিআই স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি এবং মাছের জন্য অবিষাক্ত। তবে কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে এটি সরাসরি সংস্পর্শে ত্বক এবং চোখের জ্বালা সৃষ্টি হতে পারে।
অবশ্য ওয়াশিংটন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এও বলছে, এটি প্রয়োগে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত কোন প্রভাব পড়ে কিনা, এমন গবেষণা খুব কমই হয়েছে। যদিও কিছু গবেষণা থেকে জানা যায় যে, জলাভূমিতে ২-৩ বছর টানা বিটিআই প্রয়োগে জীববৈচিত্র্যের সামগ্রিক হ্রাস হতে পারে।
বিটিআই আমদানিতে কীটতত্ত্ববিদদের ‘ইতিবাচক’ মত
দেশের কীটতত্ত্ববিদরা বিটিআই আমদানি ও প্রয়োগ ‘ইতিবাচক’ হিসেবেই দেখছেন। কারণ জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি থাকায় কেমিক্যাল কীটনাশকগুলো সব জায়গায় প্রয়োগ করা যায় না।
তাছাড়া খরচ বেশি হলেও যুক্তরাষ্ট্রর বিটিআই ভালো প্রোডাক্ট বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে খরচ বাচাঁতে আশপাশের দেশ থেকে এনে কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা উঠিত বলেও মনে করেন তারা।
দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানীর মশা নিয়ে কাজ করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। জানতে চাইলে শনিবার (১১ এপ্রিল) তিনি ঢাকা মেইল বলেন, ‘বিটিআই এখন পৃথিবীর অনেক দেশেই ব্যবহৃত হয়। এটা মর্ডান প্রোডাক্ট। এটার স্বাস্থ্য ঝুঁকি নাই, অন্যান্য অ্যানিমেলের ক্ষতি করে না। এজন্য এটা ভালো প্রডাক্ট।’
কবিরুল বাশার বলেন, ‘এখন এটার ক্রয় প্রক্রিয়াটা সঠিকভাবে করে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভালো প্রোডাক্ট আনলে এতে আমি কোনো অসুবিধা দেখি না।’তিনি বলেন, ‘বিটিআই চায়নাতে পাওয়া যায়, ইন্ডিয়াতে পাওয়া যায়। জাপান-সিঙ্গাপুরেও পাওয়া যায়। অনেক দেশেই এটি পাওয়া যায়। এখন আমেরিকা থেকে আনতেছে, আমেরিকার প্রোডাক্ট অবশ্যই ভালো হবে। খারাপ হওয়ার কথা না। হয়ত দাম বেশি পড়বে। কারণ আমেরিকার প্রোডাক্টের দাম বেশি। তাই অন্যান্য দেশ থেকে এনেও পরীক্ষা করে দেখা উঠিত।’
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিটিআই সংরক্ষণ, ডিএনসিসির প্রস্তুত কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিটিআই আনার পর সংরক্ষণ করা সবচেয়ে জরুরি। কারণ উচ্চ তাপমাত্রা এবং যথাযত সংরক্ষণের অভাবে এটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের আবহাওয়ার মধ্যে প্রার্থক্য থাকলেও তেমন কোনো ‘সমস্য হওয়ার কথা না’। তবে সংরক্ষণটা সঠিকভাবে হতে হবে। তিনি বলেন, ‘বিটিআই এমন একটা প্রডাক্ট, এটা বায়োলজিক্যাল একটা প্রোডাক্ট। আনার পরে এটার স্টোরিজ, যেখানে রাখবেন সেই জায়গাটা ভালো হতে হবে। তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির ওপরে যাওয়া যাবে না। সঠিকভাবে সংরক্ষণের অন্যান্য বিষয়গুলোও মেনটেন করতে হবে। কারণ আপনি ভালো প্রডাক্ট আনলেও এটা নষ্ট হতে পারে।’
তবে বিটিআই সংরক্ষণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী। জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বিটিআইয়ের স্টোরেজের জন্য স্পেশাল এরেঞ্জমেন্ট দরকার। সেটা আমাদের করা আছে।
ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন,‘স্পেশাল এরেঞ্জমেন্ট বলতে এটার একটা নিদির্ষ্ট টেম্পারেচার রাখতে হয়। আমরা আগে থেকেই এই এরেঞ্জমেন্ট করে রেখেছি। আমাদের মিরপুর কেন্দ্রীয় ভান্ডার আছে, সেখানে দুইটা রুম বিটিআই স্টোরেজের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এবং বনানীর ৮৬ নাম্বার রোডেসিটি করপোরেশনের ভান্ডার অফিসেও আমাদের একটা রুম রেডি আছে বিটিআই স্টোরেজের জন্য।’ তিনি বলেন, ‘বিটিআই আনার পর আমাদের কর্মীদের একটু ট্রেনিং দেওয়া হবে। এটা কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়। ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে।’
উল্লেখ্য, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ২০২৩ সালে বিটিআই এনেছিল। কিন্তু আমদানি প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি করা হয়েছিল। মূলত চায়না থেকে এনে সিঙ্গাপুরের লেভেল লাগিয়ে সিটি করপোরেশনে সরবরাহ করেছিল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। পরে সেটি আদালতে ঝুলে যায়। এরপরই নতুনভাবে বিটিআই আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করে ডিএনসিসি
এএম/ক.ম




