চারপাশে হাজারো মানুষের বসবাস, ব্যস্ত নগরজীবনের অবিরাম কোলাহল। অথচ সেই শহরেই মৃত্যুর পর দিনের পর দিন নিথর পড়ে থাকেন কেউ কেউ, খোঁজ নেওয়ারও থাকে না মানুষ। রাজধানীর পল্লবীতে অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই একাকী নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নগর জীবনের নিঃসঙ্গতার ভয়াবহ চিত্রকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এই ঘটনাগুলো প্রশ্ন তুলেছে—আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন কি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে?
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবী এলাকায় একটি ফ্ল্যাট থেকে নূরজাহান বেগম নামে ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। সেই নারী নিঃসঙ্গ জীবন কাটাতেন। তার উচ্চশিক্ষিত সন্তানরা তেমন কোনো খোঁজ নিতেন না। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই একই এলাকার আরেকটি বাড়ির ফ্ল্যাট থেকে সেলিনা আফরোজ নামে ৫৫ বছর বয়সী এক নিঃসঙ্গ নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই নারীর স্বামী-সন্তানরা কানাডায় থাকেন। প্রায় এক যুগ ধরে তিনি একাই বসবাস করছিলেন ওই ফ্ল্যাটে।
বিজ্ঞাপন
পরপর ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা নগরজীবনের ট্র্যাজেডি নতুন করে সামনে এনেছে। যৌথ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং নৈতিকতার স্খলনের কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে মনে করা হয়, যৌথ পরিবার থেকে আলাদা না হলে স্বামী-স্ত্রী ভালোভাবে বসবাস করতে পারেন না। এমন দৃষ্টিভঙ্গি সন্তানদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও মানুষের প্রতি মানুষের দরদের মতো শিক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। নিঃসঙ্গ দুই নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানদের অবহেলার করুণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। আমাদের সমাজব্যবস্থা ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়ার চিত্রও ঘটনা দুটির মাধ্যমে ফুটে ওঠেছে।
পরপর দুই নিঃসঙ্গ মায়ের মরদেহ উদ্ধার
কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানীর পল্লবী এলাকা থেকে দুই নিঃসঙ্গ মায়ের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে গত ৩১ মে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পল্লবীর ৬ নম্বর সেকশনের ৮ নম্বর সড়কের একটি বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মৃত্যুর পর সন্তানদের দায়িত্বহীনতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এরই মধ্যে তার বড় সন্তান যুগ্ম সচিব আনিসুর রহমানকে প্রশাসনিকভাবে ওএসডি করা হয়।
আরও পড়ুন
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে আবাসিক এলাকায় ‘মদের বার’, জানে না প্রশাসন
বাড়ছে শিশু নির্যাতন, তিন মাসে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার ১৬৫
ওই নারীর মোট চার সন্তান। এর মধ্যে বড় ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব। আরেক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক। আরেকজন কানাডা প্রবাসী এবং উচ্চশিক্ষিত। একমাত্র মেয়েও মিরপুরের একটি নামকরা স্কুলের শিক্ষক।
সেই ঘটনার কয়েক দিনের ব্যবধানে বুধবার (৩ জুন) একই এলাকার ১০ নম্বর রোডের ১২ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে সেলিনা আফরোজের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, তিনি ১২ বছর ধরে এই বাসায় একাই বসবাস করছেন। তার স্বজনরা পুলিশকে জানিয়েছে, ১২ বছর আগে তিনি স্বামী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে সন্তান নিয়ে কানাডায় বসবাস করতেন। সেখানে পারিবারিক কলহের জেরে তিনি দেশে চলে আসেন। এরপর আর কানাডায় ফেরা হয়নি তার। সবশেষ গত ২৬ মে রাতে সেলিনা আফরোজের সঙ্গে তার ভাতিজা আশফাকুর রহমানের মোবাইল ফোনে কথা হয়। এরপর আর কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ২৬ মে থেকে ৩ জুনের মধ্যে কোনো একসময় তিনি মারা যান।
সেলিনা আফরোজের আত্মীয় মো. রমিজুল হায়দার ঢাকা মেইলকে বলেন, সেলিনা আফরোজ অত্যন্ত নিভৃতচারী ছিলেন। প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হতেন না এবং কারও সঙ্গে তেমন যোগাযোগও রাখতেন না। অনেক সময় নিজের ইচ্ছা না হলে ফোনও ধরতেন না। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি একাকী জীবন কাটাচ্ছিলেন। স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল সীমিত। প্রতিবেশীদের সঙ্গেও খুব একটা মেলামেশা করতেন না তিনি।
আরও পড়ুন
অপরাধীদের হাতে ছদ্মবেশী অস্ত্র ‘পেনগান’, নতুন শঙ্কা
‘কঠোর শাস্তি না হওয়া ও বিচার বিলম্বে দেশে বাড়ছে ধর্ষণ’
রমিজুল হায়দার বলেন, সেলিনা আফরোজের এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছেন। স্বামী মমিনুল হক ও সন্তানরা কানাডায় বসবাস করেন। একসময় তিনিও পরিবারের সঙ্গে কানাডায় ছিলেন। তবে পারিবারিক কলহের জেরে প্রায় ১২ বছর আগে দেশে ফিরে আসেন তিনি। এরপর পল্লবীতে বাবার দেওয়া ফ্ল্যাটে একাই বসবাস শুরু করেন।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির ঢাকা মেইলকে বলেন, মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। মৃত্যুর ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। লাশের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে কয়েক দিন আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল।
কেন ঘটছে এমন ঘটনা, কী বলছেন বিশেষজ্ঞ
সমাজবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, আমাদের সমাজে একক সমাজব্যবস্থা, যৌথ পরিবার থেকে স্বামী-স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আলাদা বসবাস করার কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে। দুই নিঃসঙ্গ নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা আমাদের সমাজব্যবস্থার অবক্ষয়, নৈতিক স্খলন এবং দায়িত্বহীনতা চিত্র ফুটে ওঠেছে। একটা সন্তানকে তার বাবা-মা যেভাবে আগলে রেখে লালন-পালন করেন ঠিক সেভাবেই বাবা-মা বৃদ্ধ হওয়ার পর সন্তানরা তাদের আগলে রেখে লালন-পালন করার কথা। কিন্তু দুই নিঃসঙ্গ নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আমাদের সমাজব্যবস্থায় বাবা মায়ের প্রতি সন্তানদের দায়িত্বহীনতার চিত্র ফুটে ওঠেছে। এতে করে পারিবারিক বন্ধনের চরম অবক্ষয় ফুটে ওঠেছে।
এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, এ ঘটনাগুলো আসলে সমাজে অন্যান্য বাবা-মায়ের জন্য এখন আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এসব ঘটনা দেখে অনেকে মনে মনে ভাবছেন, হয়ত আমিও বৃদ্ধ হলে আমার সন্তানরা এভাবেই একা ফেলে রেখে চলে যাবে। বিষয়টি ভাবনার নয়, বাবা-মায়ের কাছে রীতিমতো উদ্বেগের। এমন ঘটনা আমাদের সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ে চিত্র তুলে ধরছে, যা কখনো কল্পনায়ও ছিল না।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রতিটি বাবা-মা তার সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষায় বড় করলে সমাজে এমন ঘটনা ঘটবে না৷ বাবা-মা তার সন্তানকে সমাজের প্রতি, সমাজের মানুষের প্রতি যে দায়বদ্ধতা এবং পারিবারিক বন্ধনের যে গুরুত্ব সেটি বোঝাতে হবে। তাহলে আশা করা যায় আমাদের সমাজব্যবস্থায় এমন ঘটনা ঘটবে না।
একেএস/জেবি




