- এখনো পূর্ত কাজের দরপত্র আহ্বান হয়নি
- আবারও ১ বছর মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব
- একবার দরপত্র আহ্বান হলেও প্রতিযোগিতা না থাকায় বাতিল
- প্রকল্প থেকে জমি অধিগ্রহণ প্রকল্প বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত
- প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৭৮ হাজার মানুষ বসবাস করছে
- সড়কের প্রস্থ ৭.৩০ মিটার থেকে কমিয়ে ৫.৫০ মিটার করার সিদ্ধান্ত
জামালপুরের মাদারগঞ্জ থেকে বগুড়ার সারিয়াকান্দি পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনকারী গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পটি তিন বছর পার করেও কার্যত স্থবির অবস্থায় পড়ে আছে। প্রায় ৪৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ‘মাদারগঞ্জ-জামথল সড়ক (আর-৪৬৩) প্রশস্তকরণ ও মজবুতিকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান কাজ শুরু হয়নি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনেও প্রকল্পটির ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি শূন্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পায় ২০২৩ সালের ২৯ অক্টোবর। সে সময় এর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো কাজ শুরু না হওয়ায় প্রথম দফায় ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু সেই সময়সীমাতেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি শূন্য থাকায় এখন আবারও এক বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রকল্পটি শুরু হওয়ার পর থেকে টানা তিন বছর পার হলেও কাজ শুরুই করা যায়নি।
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যাচ্ছে—এখনো পূর্ত কাজের জন্য কার্যকর দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে একবার দরপত্র আহ্বান করা হলেও সেখানে মাত্র একটি দরপত্র জমা পড়ে, যেটা প্রতিযোগিতামূলক না হওয়ায় বাতিল করা হয়। এরপর পুনরায় দরপত্র আহ্বানের কথা থাকলেও তা আর করা হয়নি। সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতি, প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে পুরো প্রক্রিয়াই দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত রয়েছে। ফলে প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করার ন্যূনতম প্রস্তুতিও সম্পন্ন হয়নি।
আইএমইডি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটির কাজের পরিধি একাধিকবার পরিবর্তন হওয়ায় বাস্তবায়নে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সড়কের প্রস্থ ৭.৩০ মিটার থেকে কমিয়ে ৫.৫০ মিটার করার সিদ্ধান্ত প্রকল্পের কাঠামোতেই বড় পরিবর্তন এনেছে। এই পরিবর্তনের ফলে নতুন করে সংশোধিত ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রণয়ন করতে হয়েছে, যা এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি নতুন ড্রয়িং ও ডিজাইন কারিগরি উইং থেকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে, যা চূড়ান্ত না হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও পিছিয়ে যাচ্ছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তর সংক্রান্ত আলাদা প্রকল্পটি বাদ দেওয়া। আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ব্যয় সংকোচন নীতির কারণে এই অংশটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় সড়কের প্রস্থ কমিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। কারণ, সড়কটি ৭.৩০ মিটার প্রশস্ত করা হলে রাস্তার দুই পাশে বসবাসকারী বহু মানুষের বাড়িঘর ভেঙে ফেলতে হতো। এলাকাবাসীর মতামত অনুযায়ী, ৫.৫০ মিটার প্রশস্ততা রাখলে তাদের বসতভিটা রক্ষা পাবে এবং ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজনও হবে না।
সরেজমিনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প এলাকায় বালিজুরী, কাজলা, কর্ণিবাড়ী ও মানিকদার—এই চারটি ইউনিয়নে প্রায় ৭৮ হাজার মানুষ বসবাস করছে। তাদের অধিকাংশই কৃষিনির্ভর এবং সড়ক যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক থাকায় কৃষিপণ্য পরিবহন, বাজারজাতকরণ, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবায় মারাত্মক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সড়কটির বিভিন্ন অংশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, ফলে অনেক সময় বিকল্প পথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। সাম্প্রতিক বন্যায় সড়কটি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েকগুণ।
আইএমইডি বলছে, এই সড়কটি উন্নয়ন করা হলে জামালপুর থেকে বগুড়া পর্যন্ত যাতায়াতের দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। বর্তমানে যমুনা সেতু হয়ে এই দূরত্ব প্রায় ১৭৩ কিলোমিটার হলেও প্রস্তাবিত সড়কটি চালু হলে তা কমে ৬৫ কিলোমিটারে নেমে আসবে। এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হবে এবং কৃষি ও শিল্পখাতের বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু বাস্তবে এই সম্ভাবনাময় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
প্রকল্পের আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ১৯৯৯ ইউনিট বরাদ্দ থাকলেও কোনো ব্যয় হয়নি। একইভাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও প্রায় ৩০০০ ইউনিট বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও ব্যয় শূন্য রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৩০০ ইউনিট বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হলেও প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি না থাকায় সেই অর্থ ব্যয়ের সম্ভাবনাও অনিশ্চিত। ফলে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ০ শতাংশে আটকে আছে।
প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও তদারকি ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও গুরুতর দুর্বলতা লক্ষ্য করা গেছে। ডিপিপি অনুযায়ী প্রতি তিন মাস অন্তর প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) এবং প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি (পিএসসি) সভা হওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়নি। এছাড়া নির্ধারিত সংখ্যার তুলনায় কম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আইএমইডি সুপারিশ করেছে, নিয়মিত সভার মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং দ্রুত সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নওয়াজিস রহমান বিশ্বাস, যিনি একই সঙ্গে একাধিক প্রকল্পের দায়িত্বে রয়েছেন। এতে তার ওপর কাজের চাপ বেশি থাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নে মনোযোগ বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেদনে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
>> আরও পড়ুন
অডিট কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির কোনো অডিট সম্পন্ন হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অডিট সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ায় গুণগতমান যাচাই, ল্যাব টেস্টিং বা সাইট পরিদর্শনের মতো বিষয়গুলোও এখনো প্রযোজ্য হয়নি।
পরিবেশগত দিক থেকেও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে, যদিও তা এখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে যায়নি। সড়কের পাশে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, কালভার্ট নির্মাণ এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। তবে কাজ শুরু না হওয়ায় এসব পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক, সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নওয়াজিস রহমান বিশ্বাস বলেন, সড়কটি ৭.৩০ মিটার প্রশস্ত না করে ৫.৫০ মিটার নির্মাণ করা হলে ভূমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না। সড়কের উভয় পাশে ঘনবসতি থাকায় প্রাথমিক নকশা অনুযায়ী প্রশস্তকরণ করলে বিপুল সংখ্যক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। এতে স্থানীয় জনগণের পুনর্বাসন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াত এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে যেত।
তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণের মতামত এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনায় সড়কের প্রস্থ কমিয়ে আনার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এতে একদিকে যেমন বসতভিটা রক্ষা করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো যাবে। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও প্রশাসনিক চাপ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অনুমোদিত ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত সড়কের প্রশস্ততা ৭.৩০ মিটার থেকে কমিয়ে ৫.৫০ মিটার করার জন্য সংশোধিত প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে এই সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন এবং কারিগরি ডিজাইনের ভেটিং সম্পন্ন হলে পরবর্তী ধাপে দরপত্র আহ্বান করে কাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে এই সড়কের উন্নয়নের আশ্বাস শুনছেন তারা, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখছেন না। দ্রুত কাজ শুরু না হলে তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধাও হাতছাড়া হবে।
আইএমইডির সহকারী পরিচালক (সহকারী সচিব) মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, মাদারগঞ্জ-জামালপুর সড়ক (আর-৪৬৩) প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়ন পর্যায়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি শূন্য। এটি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। প্রকল্পে এখনো দরপত্র আহ্বান সম্পন্ন হয়নি এবং কিছু ক্ষেত্রে পুনঃদরপত্রের প্রয়োজন হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের স্কোপ পরিবর্তন ও সড়কের প্রশস্ততা হ্রাস সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কারণে ডিজাইন ভেটিং ও সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ব্যয় বৃদ্ধি না করে শুধুমাত্র সময় বৃদ্ধি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার যে প্রস্তাব এসেছে, তা বর্তমান বাস্তবতায় যৌক্তিক বিবেচিত হতে পারে। তবে সময় বৃদ্ধি যেন বিলম্বকে উৎসাহিত না করে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ও প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির নিয়মিত সভা নিশ্চিত করতে হবে, তবে এখন পর্যন্ত যথাযথভাবে হয়নি। পাশাপাশি কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে লিখিত প্রত্যয়ন গ্রহণ এবং ব্যত্যয় ঘটলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল যুক্ত করা, মন্ত্রণালয় পর্যায়ে নিবিড় মনিটরিং জোরদার করা এবং স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে অডিট কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি যথাযথ সমন্বয় ও কার্যকর তদারকির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা গেলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে।
এএইচ/এএস




