জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপরিবহন খাতে স্পষ্টভাবে দেখা দিচ্ছে। সরকারি ভাড়া পুনর্নির্ধারণের কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না থাকলেও অনেক রুটে চালক ও হেলপাররা ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ও নিয়মিত যাত্রীরা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে দূরপাল্লা বা ব্যস্ত রুটে ২০০-৩০০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে চালক ও হেলপারদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটছে, কোথাও কোথাও যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাজধানীর বিভিন্ন রুটে শহরে জমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।
যাত্রাবাড়ী থেকে শাহবাগ রুটে চলাচলকারী এক যাত্রী জানান, আগে যেখানে ২০ টাকা ভাড়া দিতেন, এখন সেখানে ২৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। সায়েদবাদ থেকে ফার্মগেট রুটে ভাড়া ২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা চাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। যাত্রীরা বলছেন, কোনো ধরনের সরকারি নোটিস বা সিদ্ধান্ত ছাড়াই ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন
একই ধরনের অভিযোগ এসেছে যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, পল্টন, শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকার যাত্রীদের কাছ থেকেও। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, দৈনন্দিন যাতায়াত এখন অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, অথচ আয় বাড়েনি। আন্তজেলা বাসেও ভাড়ার চাপ বেড়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা-মৌলভীবাজার রুটে আগে যেখানে ভাড়া ছিল ৫৭০ টাকা, এখন তা বেড়ে ৬২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। পরিবহন মালিকদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি এবং যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়েছে।
পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ২০২২ সালে নির্ধারিত ভাড়া এখন আর বাস্তবসম্মত নয়। সেই সময় দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২.২০ টাকা এবং মহানগরে ২.৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো সমন্বয় হয়নি। মালিকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভাড়া না বাড়ালে লোকসান দিয়ে সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
অন্যদিকে যাত্রীকল্যাণ সংগঠনগুলোর দাবি, সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণের আগেই মালিক ও কিছু পরিবহন সংশ্লিষ্ট পক্ষ নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছে, যা যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। তারা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যৌক্তিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভাড়া সমন্বয় করা উচিত।

বাড়তি ভাড়ার প্রভাব শুধু বাসে সীমাবদ্ধ নয়, লেগুনা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং রাইড শেয়ারিং সেবাতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে পিক আওয়ারে যাত্রী সংকটকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ বেশি।
সায়দাবাদ এলাকায় কয়েকজন যাত্রীর সাথে কথা বলে জানা যায়, আগের তুলনায় ১০-১৫ টাকা করে বেশি নিচ্ছে বাস চালকের হেল্পাররা।
সাজ্জাদুল ইসলাম নামে একজন জানান, আজকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে। পরীক্ষার জন্য আমি আমার ছেলেকে নিয়ে যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুলে আসি। শনিরআখড়া থেকে দশ টাকা ভাড়া নিতো আগে এখন নিচ্ছে ১৫ টাকা। এ নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে বাস কন্টাকটারের বাদ বাগবিতণ্ডা হয়।
এছাড়া দূরপাল্লার বাসে ওরা রাখা হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। নুর নবী মোস্তফা নামের এক যাত্রী অভিযোগ করে জানান, কক্সবাজার চট্টগ্রাম সিলেটগামী বাসে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি ভাড়া রাখা হচ্ছে।
তৃষা পরিবহনের এক চালক বলেন, ‘সব ধরনের গণপরিবনের ভাড়া বেড়ে যাবে। যেহেতু তেলের দাম বেড়েছে ভাড়া বাড়বে। এছাড়া তেল নিতে আমাদের দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। আমাদের সিডিউল মিস হয়।’
তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর গণপরিবহন ও দূরপাল্লার বাসের বেশিরভাগ সিএনজি চালিত। তবুও তারা তেলের দামের অজুহাতে পায়তারা করছে। কারণ যাত্রীদের এমন খবর নেয়ার সম্ভব না যে কোনটা সিএনজি চালিত কোনটা ডিজেল চালিত।

গত কয়েক দিনে জ্বালানি তেলের দামও নতুন করে বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পরিবহন খাতে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসগুলোতে সকাল থেকেই বাড়তি ভাড়া নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। কোথাও কোথাও ভাড়া বাড়ানো নিয়ে যাত্রী ও কর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডাও হয়েছে। যাত্রীরা বলছেন, কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া এভাবে ভাড়া বাড়ানো অযৌক্তিক এবং দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর গণপরিবহন খাতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের অভাবে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। যাত্রীদের দাবি, দ্রুত যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হোক।
এমআর/এমআই




