# পুরান ঢাকায় যাত্রা শুরু, বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত
# সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকে
বিজ্ঞাপন
# কাঁচা ছানা, বরফি, জিলাপি ও কালোজাম সবচেয়ে জনপ্রিয় আইটেম
# পুরোনো রেসিপি ও ঐতিহ্যবাহী স্বাদ ধরে রাখার চেষ্টা
ব্যস্ত নগরজীবনের ভিড় আর কোলাহলের মাঝেও পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ‘মরণচাঁদ মিষ্টান্ন ভান্ডার।’ প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই মিষ্টান্ন ভান্ডারটি শুধু একটি মিষ্টির দোকান নয়-এটি হয়ে উঠেছে পুরান ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতি ও মানুষের নস্টালজিয়ার প্রতীক। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শাখা বাড়লেও স্বাদ, মান আর ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার দাবি করছে প্রতিষ্ঠানটি।
মিরপুর ১ নম্বর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন প্রিন্স বাজারের পাশে অবস্থিত শাখাটিতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত থাকে ক্রেতাদের ভিড়। কেউ নাস্তার জন্য আসেন, কেউ মিষ্টি কিনতে, আবার অনেকে পারিবারিক প্রয়োজনেও ভিড় করেন। দীর্ঘদিনের সুনাম ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামের কারণে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে জায়গাটি আস্থার ঠিকানা হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
শুধু মিষ্টিই নয়, সকালের নাস্তাতেও আলাদা জনপ্রিয়তা পেয়েছে মরণচাঁদ। সাধারণত মিষ্টির দোকানে নাস্তার চল কম থাকলেও এখানে চিত্র ভিন্ন। সকাল শুরু হতেই পরোটা, ভাজি, সবজি, হালুয়া ও দইয়ের মতো আইটেমে ভরে ওঠে দোকানটি।
মিরপুরের স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিনের সুনাম ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যের কারণে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানো মরণচাঁদে ভিড় করেন।
কয়েকজন ক্রেতা জানান, একই সঙ্গে নাস্তা ও মিষ্টি-দুটো সুবিধা এক জায়গায় পাওয়া যায় বলেই তারা এই দোকানকে প্রাধান্য দেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নাস্তার সময়টিতে ভিড় তুলনামূলক বেশি থাকে এবং টেবিল খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ক্রেতা বসছেন।
ক্রেতারা বলেন, এখানকার ভাজির স্বাদ ও রঙ সাধারণ হোটেলের তুলনায় আলাদা। ভাজির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হয়, যার কারণে রঙ কিছুটা গাঢ় এবং স্বাদে একটি ভিন্নতা থাকে।
বদরুল ইসলাম নামে একজন ক্রেতা বলেন, এখানকার ভাজিতে একটা আলাদা স্বাদ আছে, যা অন্য জায়গায় খুব একটা পাওয়া যায় না। একইভাবে হালুয়ার রঙ ও স্বাদেও বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। বাদামি আভাযুক্ত এই হালুয়া স্বাদে ভারসাম্যপূর্ণ রয়েছে।
দইয়ের মান নিয়েও ইতিবাচক মন্তব্য পাওয়া যায়, যদিও কয়েকজন ক্রেতা মনে করেন, দাম তুলনামূলক কিছুটা বেশি। তবুও স্বাদের কারণে অনেকেই দই নাস্তার সঙ্গে রাখেন। কেউ কেউ পরোটার সঙ্গে দই খাওয়ার অভ্যাসের কথাও জানান, যা এই দোকানে বেশ প্রচলিত একটি চিত্র।
মিষ্টির বৈচিত্র্যের দিক থেকে মরণচাঁদ দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। দোকানের শোকেসে সাজানো থাকে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, যা ক্রেতাদের সহজেই আকর্ষণ করে। কাঁচা ছানা, বরফি, কালোজাম, লাল চমচম, মাওয়া লাড্ডু, রাজভোগ, রসমালাই-প্রতিটি আইটেমই আলাদা করে নজর কাড়ে। এছাড়া মৌচাক, গোলাপজাম, বিভিন্ন ধরনের সন্দেশ ও বিশেষ মিষ্টিও পাওয়া যায়।
জিলাপি এখানে অন্যতম জনপ্রিয় আইটেম। দোকানের একপাশে কড়াইয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জিলাপি ভাজা হয় এবং পরে শিরায় ডুবিয়ে গরম গরম পরিবেশন করা হয়। এই প্রক্রিয়ার কারণে জিলাপির স্বাদে একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি হয় বলে জানান ক্রেতারা। একইভাবে ছানা জিলাপিও বেশ জনপ্রিয়, যা স্বাদে ভারসাম্যপূর্ণ বলে অনেকেই মন্তব্য করেন।
রসগোল্লার ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন মত পাওয়া যায়। মামুন হায়দার নামে এক ক্রেতা জানান, এটি তুলনামূলকভাবে কিছুটা শক্ত হলেও স্বাদ ভালো। নরম রসগোল্লার তুলনায় এটি আলাদা। বুন্দিয়া, নিমকি ও অন্যান্য আইটেমও দোকানে পাওয়া যায়, বিশেষ করে বিকেল সময় এগুলোর চাহিদা বেড়ে যায়।
দামের দিক থেকে মরণচাঁদ প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন ক্রেতারা। ঢাকার অন্যান্য পরিচিত মিষ্টির দোকানের তুলনায় এখানে অনেক আইটেম তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। কাঁচা ছানা, বরফি বা কালোজামের মতো পণ্যগুলো সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই রাখা হয়েছে। বিশেষ আইটেম যেমন রসমালাই বা জাফরানজাত মিষ্টির ক্ষেত্রেও দাম তুলনামূলক সহনীয়।
দোকান কর্তৃপক্ষ জানায়, মান বজায় রেখে সাশ্রয়ী দামে পণ্য সরবরাহ করাই তাদের মূল লক্ষ্য। দীর্ঘদিন ধরে একই মান ধরে রাখার কারণে ক্রেতাদের মধ্যে একটি আস্থা তৈরি হয়েছে, যা ব্যবসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি পার্সেল সুবিধা থাকায় ব্যস্ত ক্রেতারা সহজেই খাবার নিয়ে যেতে পারেন। অনেকেই অফিস বা বাসার জন্য একসঙ্গে একাধিক আইটেম কিনে নিয়ে যান। এছাড়া দোকানে নোনতা বিস্কুট, টোস্ট, চিপসসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্যও বিক্রি করা হচ্ছে, যা দোকানটির পরিসর আরও বাড়িয়েছে।
মিরপুর এক নম্বর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন প্রিন্স বাজারের পাশে অবস্থিত শাখাটির ম্যানেজার গোপাল ঘোষ বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্বাদটা ঠিক রেখে গ্রাহকদের কাছে খাবার পৌঁছে দিতে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু আমাদের রেসিপি ও প্রস্তুত প্রণালীর মূল জায়গাটা একই রাখার চেষ্টা করি। নাস্তা থেকে শুরু করে মিষ্টি—সব ক্ষেত্রেই মান বজায় রাখাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। আমরা চাই, যারা এখানে একবার আসবেন, তারা যেন আবারো ফিরে আসেন।’
প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রায় ২০০ বছর আগে পুরান ঢাকায় মরণচাঁদের যাত্রা শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসার পরিধি বাড়লেও ঐতিহ্য ধরে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরোনো স্বাদের প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনও রয়েছে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রেখেছে। ক্রেতাদের অনেকেই জানান, দীর্ঘদিন ধরে একই মান বজায় রাখার কারণে তারা এই দোকানের ওপর আস্থা রাখেন। সব মিলিয়ে মরণচাঁদ মিষ্টান্ন ভান্ডার রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে।
এএইচ/এমআর




