শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

ইতিহাসের এক কালজয়ী নাম আবু সাঈদ

ঢাকা মেইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম

শেয়ার করুন:

July Abu Sayed
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম যোদ্ধা শহীদ আবু সাঈদ। ছবি: সংগৃহীত

তিনি হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বুক পেতে নিয়েছিলেন পুলিশের ছোড়া গুলি। সেই এক অব্যর্থ ছবি বদলে দিয়েছিল একটি জাতির ইতিহাস। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদ জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ। তার আত্মত্যাগের শিখা ছড়িয়ে পড়েছিল সারাদেশে। এক বছর আট মাস পেরিয়ে গেলেও, রায়ের অপেক্ষায় থাকা এই মামলার নিষ্পত্তি হতে যাচ্ছে আজ (৯ এপ্রিল)। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে ঘিরে সারাদেশের মানুষের নজর এখন রংপুরের পীরগঞ্জের বাবনপুর গ্রামের সেই আবু সাঈদের বিচারের দিকে।

২০০১ সালের দিকে পীরগঞ্জের বাবনপুর গ্রামে মকবুল হোসেন ও মনোয়ারা বেগমের ঘরে জন্ম আবু সাঈদের। ন’জন সন্তানের সবার ছোট তিনি। বাবা কৃষক, সংসারের হাল ধরতে ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করেছেন। জাফরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পান তিনি। খালাশপির দিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ ও রংপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেন।


বিজ্ঞাপন


বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সক্রিয় আন্দোলনকারী আবু সাঈদ ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ সমন্বয়ক ছিলেন। মৃত্যুর মাত্র এক দিন আগে ফেসবুকে তিনি শহীদ শামসুজ্জোহার প্রতি ইঙ্গিত করে লিখেছিলেন,

 তিনি যেন ভবিষ্যৎ বাণী করেই গিয়েছিলেন নিজের অমরত্বের।

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। রংপুর নগরীর লালবাগ এলাকা থেকে বের হওয়া প্রতিবাদী মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এলে পুলিশের বিশাল বাহিনী বাধা দেয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও আদালতে দেখানো সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেডের পর পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। সবাই সরে যেতে থাকলেও বুক পেতে দাঁড়িয়ে যান আবু সাঈদ। হাতে ছিল শুধু একটি লাঠি।

প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, পঞ্চম আসামি আরিফুজ্জামান জীবনের নেতৃত্বে পুলিশ তাকে প্রথমে বেদম পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। এরপর অষ্টম আসামি এএসআই আমির হোসেন ও নবম আসামি কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় দূর থেকে নয়, কাছ থেকে একের পর এক গুলি ছোড়ে। প্রথম গুলি পেটে লাগলে তিনি কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যান। তারপর আবার হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে যান। পরপর আরও কয়েকটি গুলি বিদ্ধ করে তার বুক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা রক্তে ভিজে যায়। তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মৃত্যু হয়।

শহীদ আবু সাঈদের মরদেহ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধা দেয় পুলিশ। রাতে মর্গে গেলেও দেখতে দেওয়া হচ্ছিল না। বাবা মোকবুল হোসেন বলেছিলেন, ‘ছেলের মরদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় পথে বারবার থামানো হয়। জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা রাতেই খনির মেশিন দিয়ে কবর খুঁড়ে দ্রুত দাফন করতে চেয়েছিল। আমি নিজ হাতে ছেলেকে কবর দিতে চাই, তাই সকাল ৯টার জন্য দাফন রাখি।’

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বুকের ব্যথা নিয়ে মকবুল হোসেন হাসপাতালে ভর্তি হলে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান সরাসরি আর্থিক সহায়তা হস্তান্তর করেছেন বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।

ঘাতকদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে। ২০২৫ সালের ২৪ জুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা পড়ার পর ৩০ জুন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। ৬ আগস্ট ৩০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল।

এর মধ্যে ২৪ জন পলাতক রয়েছেন। পলাতক আসামিরা হলেন- রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মন্ডল, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার মো. হাফিজুর রহমান, সাবেক সেকশন অফিসার মো. মনিরুজ্জামান পলাশ, বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক এমএলএসএস মোহাম্মদ নুরুন্নবী মন্ডল উল্লেখযোগ্য।

গ্রেফতার ৬ জন হলেন-এএসআই আমির হোসেন, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার রফিউল হাসান, প্রক্টরিয়াল অফিসের ঠিকাদার আনোয়ার পারভেজ ও ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী ।

বিশ্ববিদ্যালয়টির সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদসহ এ মামলার ২৪ আসামি পলাতক। 

মামলার প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এস এম মাইনুল করিম গণমাধ্যমকে জানান, আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি যে, নিরস্ত্র সাধারণ শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজ, সাংবাদিকদের তোলা ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসকদের জবানবন্দি আদালতে পেশ করেছি। আশা করছি আসামিরা সর্বোচ্চ শাস্তি পাবে।

উল্লেখ্য, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন জাল করার অভিযোগ আনা হয়েছে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি সর্বত হোসেন চন্দনের বিরুদ্ধে। 

চিকিৎসক ডা. রাজিবুল ইসলাম আদালতে জানান, তাকে চাপ ও প্রলোভন দেখিয়ে রিপোর্ট পরিবর্তন করতে বলা হয়েছিল।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করবেন। রায়ের আগে আবেগাপ্লুত পিতা মকবুল হোসেন বলেন,

এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর