সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

ঈদযাত্রায় ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩৫১

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১১:৩০ এএম

শেয়ার করুন:

ঈদযাত্রায় ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩৫১

‎এবার ঈদযাত্রার ১৫ দিনে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত হয়েছেন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

‎সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

‎ঈদযাত্রার সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন তুলে ধরে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘ঈদযাত্রা শুরুর দিন ১৪ মার্চ থেকে ঈদযাত্রার শেষে কর্মস্থলে ফেরা ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১৫ দিনে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি ১০৪৬ জন আহত হয়েছেন।’

accident-dhakamail_20260330_113045447


বিজ্ঞাপন


‎তিনি আরও বলেন, একই সময়ে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও ২২৩ জন আহত হয়েছেন। নৌ-পথে ৮ টি দুর্ঘটনায় ৮ নিহত ও ১৯ জন আহত এবং ৩ জন নিখোঁজ হয়েছেন। ফলে সব পথ মিলে মোট ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত ও ১২৮৮ জন আহত হয়েছেন।

‎সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে আরও বলেন, বিগত সময়ের তুলনায় এবার ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৮.৯৫ শতাংশ ও প্রাণহানী ৮.২৬ শতাংশ এবং আহত ২১.০৫ শতাংশ বেড়েছে।

গণমাধ্যম বিশ্লেষণে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।

‎সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঈদ যাত্রার ১৫ দিনে  জাতীয় অর্থপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ২১৭৮ জন ভর্তি হয়েছেন।

‎দুর্ঘটনার শীর্ষে মোটরসাইকেল

‎প্রতিবেদনটি তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বরাবরের মতো এবারও সড়ক দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল।

‎এবারের ঈদে ১২৫ টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত, ১১৪ জন আহত হয়েছে। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬.১২ শতাংশ, নিহতের ৩৮.৪৬ শতাংশ এবং আহতের ১০.৮৯ শতাংশ প্রায়।

‎৭১ চালকের মৃত্যু, পথচারী ৫৪

নিহতদের পরিচয় বিশ্লেষণে প্রতিবেদন বলছে, এই সময় সড়কে দুঘটনায় আক্রান্ত ৭১ জন চালক, ৫৫ জন শিশু, ৫৪ জন পথচারী, ৫১ জন নারী, ৪২ জন শিক্ষার্থী, ১০ জন পরিবহন শ্রমিক, ৭ জন শিক্ষক, ৪ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৩ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ৩ জন প্রকৌশলী, ২ জন সাংবাদিক, ১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ১ জন চিকিৎসকের পরিচয় মিলেছে।

‎৩৫.৮৩ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ


বিজ্ঞাপন


সংগঠিত দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট যানবাহনের ২৭.১৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৭.৭৩ শতাংশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান, ১৬.২২ শতাংশ বাস, ১৫.২৮ শতাংশ ব্যাটারীচালিত রিকশা, ৮.৪৯ শতাংশ কার-মাইক্রো, ৭.৭৩ শতাংশ নছিমন-করিমন ও ৭.৩৫ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।

‎দুর্ঘটনার ৩৫.৮৩ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩২.৩৬ শতাংশ পথচারীকে গাড়ী চাপা দেয়ার ঘটনা, ২২.২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রন হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনায়, ০.৫৭ শতাংশ ট্রেন-যানবাহনে, ০.৫৭ শতাংশ চাকায় ওড়না পেছিয়ে ও ৮.৩৮ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারনে দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে।

‎দুর্ঘটনার ৪৩ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে

‎দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৪৩.০৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০.০৫ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২১.৯৬ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়। এছাড়াও সারাদেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৪.০৪ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ০.২৮ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ও ০.৫৭ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংগঠিত হয়েছে।

‎‘বিশৃঙ্খলা অতীতের তুলনায় বেড়েছে’

‎যাত্রী কল্যাণ সমিতির মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকার শপথ গ্রহণের ২ দিন পরে রমজান শুরু, একমাসের মাথায় ঈদযাত্রা। নতুন সরকারের ব্যর্থতা খুঁজতে নয় বরং সরকারকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার মানষে প্রতিবছরের ন্যায় এবারো ঈদযাত্রায় প্রাণহানির পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো। সরকার নতুন হলেও পুরোনো আমলা, পূর্বের মাফিয়া নেতাদের অনুসারী বাসা মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের বর্তমান সরকার সর্মথিত নেতাদের চাপে আওয়ামীলীগ সরকারের মত এবারো সড়ক পরিবহন মন্ত্রনালয়, রেলপথ মন্ত্রনালয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রনালয়, বিআরটিএ, বিআইডাব্লিউটিএসহ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সস্থার ঈদ ব্যবস্থাপনা সভায় লাখো যাত্রীদের পক্ষে কথা বলার মতো যাত্রী ও নাগরিক সমাজের কোন প্রতিনিধি রাখা হয়নি।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, পরিবহন মালিকরা একচেটিয়া সুবিধা লুফে নিতে এমন অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।

‎তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাস মালিক সমিজি ও শ্রমিক সংগঠন প্রভাবমুক্ত থাকায় ঈদযাত্রা খানিকটা স্বস্তিদায়ক হয়েছিল যা সর্বমহলে প্রশংসা পেয়েছে। এবারের ঈদে বাস মালিন সমিতি এবং শ্রমিক ফেডারেশনের প্রভাবের কারনে ভাড়া নৈরাজ্য ও সড়ক দুর্ঘটনা, পরিবহনের বিশৃঙ্খলা অতীতের দুটি ঈদের তুলনায় বেড়েছে।

মোজাম্মেল হক অভিযোগ করে আরও বলেন, সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা ছিল বাস মালিক সমিতি নিয়ন্ত্রিত। ফলে বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের পদ্ধতি অনুসরণের কারনে সড়ক পরিবহন সেক্টরে সরকারের কিছু কিছু কর্মকান্ড ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

দুর্ঘটনার ৮ কারণ

প্রতিবেদন দুর্ঘটনার বেশ কিছু কারণ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো-

‎১. দেশের সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিক্সা, অটোরিক্সা অবাধে চলাচল।

২. জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন বা রোড মার্কিং, সড়কবাতি না থাকা, রেলক্রসিংয়ে হঠাৎ বাস উঠে আসা।

৩. সড়কে মিডিয়ামে রোড ডিভাইডার না থাকা, অন্ধবাঁকে গাছপালায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি।

৪. মহাসড়কের নির্মান ত্রুটি, যানবাহনের নানাবিধ ত্রুটি, ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা।

৫. উল্টোপথে যানবাহন, সড়কে চাদাঁবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন।

৬. অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রীবহন।

৭. বেপরোয়া যানবাহন চালানো এবং একজন চালক অতিরিক্ত সময় ধরে যানবাহন চালানো।

৮. ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্যের কারণে বাসের ছাদে, খোলা ট্রাক ও পিকআপে, ট্রেনের ছাদে, বাসের ইঞ্জিণ ওপর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীসাধারণের যাতায়াত।

দুর্ঘটনারোধে ১৩ সুপারিশ 

দুর্ঘটনার প্রতিরোধে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়।

১. সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। ভাড়া আদায়ে স্মার্ট পদ্ধতির চালু করা।

২. মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা আমদানি ও নিবন্ধন বন্ধ করা।

৩. জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতের বেলায় অবাধে চলাচলের জন্য আলোকলজ্জার ব্যবস্থা করা।

৪. দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহন, যানবাহনের ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফিটনেস প্রদান।

৫. বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুলের সরকার ঘোষিত ৬০ ঘণ্টা ইনক্লুসিভ ইনজুরিত ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রধান বন্ধ করা।

৬. পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, মালিক সমিতির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা।

৭. গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কে সার্ভিস লেনের ব্যবস্থা করা।

৮. সড়কে চাদাঁবাজি বন্ধ করা, চালাকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা।

৯. মহাসড়কে ফুটপাত ও পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা, রোড সাইন, রোড মার্কিং স্থাপন করা।

১০. উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

১১. মানসম্মত সড়ক নির্মাণ ও মেরামত সুনিশ্চিত করা, নিয়মিত রোড সেফটি অডিট করা।

১২. সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইউনিট চালু করা।

১৩. ঈদযাত্রা একসঙ্গে এতো বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে স্বল্প মেয়াদী, মধ্য মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী নানা পরিকল্পনা

      গ্রহণের পাশাপাশি ঢাকা উপর জনসংখ্যায় চাপ কমানো।‎


‎এএম/এমআই

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর