জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সবার আগ্রহের কেন্দ্রে এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন। বর্তমানে প্রশাসক দিয়ে চলছে ঢাকার দুই সিটিসহ সারাদেশের সিটি করপোরেশনগুলো। নির্বাচিত প্রতিনিধি পেতে নির্বাচন জরুরি।
কিন্তু কবে হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন? এ নিয়ে কী ভাবছে সরকার। এমন প্রশ্ন বিরোধী দল ও জনসাধারণের মনে। এই নির্বাচন নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপের কারণে সন্দেহ এবং ধন্ধের মধ্যেও আছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদগুলোতে প্রশাসক হিসেবে দলীয় নেতাদের দায়িত্ব দেওয়ার পর নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংসদের বিরোধী দলগুলো। তারা বলছে, ঢালাওভাবে দলের নেতাকর্মীদের নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনের আগেই স্থানীয় প্রশাসন নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকারি দল।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইস্যুতেই ঈদের পর দেশের রাজনীতির মাঠ সরব থাকবে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের অনেকেই বলছেন, আপাতত প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন সচল করার বিকল্প ছিল না। কিন্তু দলের নেতাদেরকে যেভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে খুব একটা ভালো বার্তা দেয়নি সরকার।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে সরকার তিন মাস সময় নিতে চায় বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি এই নির্বাচন আয়োজনে সরকারের নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন জরুরি কেন?
জুলাই আন্দোলনের পর থেকেই এক ধরনের অচলবস্থা চলছে দেশের স্থানীয় সরকার প্রশাসনে। আন্দোলনের মুখে সাবেক সরকার প্রধান শেখ হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙে পড়ে স্থানীয় প্রশাসন।
সে সময় সিটি করপোরেশন কিংবা জেলা পরিষদে দায়িত্বে থাকা প্রতিনিধিদের কেউ হামলার শিকার হন, কেউ গ্রেফতার হন, আবার অনেকে আত্মগোপনে চলে যান। যার ফলে স্থানীয় সরকার প্রশাসনে তৈরি হয় শূণ্যতা।
পরে স্থানীয় সরকার প্রশাসন আবারও সচল করার লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদে প্রশাসক হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয় ড. মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বতীকালীন সরকার।
এছাড়া দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে কোথাও সরকারি কর্মকর্তা, আবার কোথাও প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেন। এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করা হলেও অন্তর্র্বতী সরকারের ওই উদ্যাগ কতটা কাজে এসেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
দেড় বছর স্থায়ী ওই অন্তর্র্বতী ব্যবস্থা এবং দেশের সার্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট স্থানীয় প্রশাসনে অচলবস্থা তৈরি করেছে বলেই মনে করেন বিশ্লেষকরা। ফলে এখন সাধারণ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা উচিৎ বলে মনে করেন তারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সরকারের জনপ্রিয়তা কমে যাবে, যদি দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যবস্থা তারা করতে না পারে।’
এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রশাসনে এখন পর্যন্ত যে নিয়োগগুলো সরকার দিয়েছে, সেটি এরই মধ্যে নানা সমালোচনা তৈরি করেছে বলেও মনে করেন তিনি। এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, ‘স্থানীয় সরকারে দলীয়করণটা জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের ওপর এর একটা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হতে পারে।’
এছাড়া নির্বাচনের পর স্থানীয় প্রশাসনে সরকার যেভাবে দলীয় নেতাদেরকে নিয়োগ দিয়েছেন, সেটি নিয়েও নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম অবশ্য বলছেন, ‘প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া অবৈধ কিছু নয়, নির্বাচিত রাজনৈতিক দল তার মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধি আর কারও মনোনীত ব্যাক্তি- এক বিষয় নয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির মানুষের ওপর একটা দায়বদ্ধতা থাকে, যেটি অনেক ক্ষেত্রে একজন নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকের নাও থাকতে পারে।’
আব্দুল আলীম বলছেন, ‘আমরা একধরণের পরিবর্তনের আশা করছি জুলাই মুভমেন্টের পর থেকে। আশা করব যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে সরকার অতীতের মতো হস্তক্ষেপ করবে না।’
বিরোধীদের সন্দেহ
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই যেসব বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে, তার মধ্যে অন্যতম স্থানীয় সরকার নির্বাচন। বিশেষ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে সংসদের বিরোধী দলগুলো।
সরকারের পক্ষ থেকেও এ নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। এমনকি ঈদের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব প্রস্তুতি নেওয়া হবে বলে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ।
কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এক ধরণের সন্দেহ তৈরি করেছে। কয়েকদিন আগেই দেশের ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার, যেখানে নিয়োগপ্রাপ্তদের সবাই বিএনপির দলীয় রাজনীতিতে জড়িত।
এ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে পৃথক বিবৃতি দিয়েছে সংসদের বিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারা বলছে, সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ভোট ছাড়াই দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে বিএনপি।
এই পদক্ষেপকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ‘নিজেদের সুবিধা মতো’ আয়োজনের চেষ্টা হিসেবেও দেখছে বিরোধী দলগুলো।
সংসদে বিরোধী দলীয় উপনেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসনে যেভাবে দলীয় ব্যক্তিদের বসানো হচ্ছে, তাতে সরকারের ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।’
এর মধ্য দিয়ে সরকার মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে, নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করছে বলেও মনে করেন তিনি। তাহের বলেন, সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন কম সময়ের মধ্যে দিয়ে দেবে।’ দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচনের দাবি আদায়ে বিরোধী দলগুলো প্রয়োজনে মাঠের কর্মসূচি দেবে বলেও জানান তিনি।
সরকার কী বলছে
বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘নির্বাচনের আগে স্থানীয় প্রশাসনকে সচল রাখতেই প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।’
এক্ষেত্রে সরকারের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য নেই বলেও দাবি করেন তিনি। ফখরুল বলেন, ‘নানা ভুল ধারণা নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে। পরবর্তীতে আর কোনো প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে না, সবগুলোতেই নির্বাচন হবে।’
স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে আয়োজন করতে চায় সরকার? এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচন আয়োজনে তিন মাস সময় নেবে সরকার। নির্বাচন ছাড়া হবে না, নির্বাচন অবশ্যই করা হবে। তবে এ মুহূর্তে করার কোনো পরিকল্পনা নাই। আমরা একটু সময় নিতে চাই। বড়জোর তিন মাস সময় নিতে পারি আমরা।’
নির্বাচনের পরিকল্পনা নিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ দিয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় সরকার। এরপর ধারাবাহিকভাবে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন আয়োজন করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে হবে। এরপর উপজেলা ও পৌরসভা। জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ওগুলোতে নির্বাচন একটু পরে হবে।’ সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএইচ

