বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না রাখার পক্ষে দলগুলো

মো. মেহেদী হাসান হাসিব
প্রকাশিত: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৩৩ পিএম

শেয়ার করুন:

election
ঈদের পর শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ছবি: সংগৃহীত

স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো শুরু থেকেই নির্দলীয়ভাবেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। আওয়ামী লীগ সরকার টানা প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে দলীয় প্রতীকে এই নির্বাচনের বিধান করে। বিষয়টি নিয়ে নানা মহল থেকে সমালোচনা হলেও এর কোনো তোয়াক্কা করেনি শেখ হাসিনার সরকার। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাচন সংস্কার কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে করার সুপারিশ করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এবার প্রশ্ন দেখা দিয়েছে- স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হবে নাকি দলীয় প্রতীকে?

জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হতে না হতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ঈদের পরই কয়েকটি সিটিতে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। বিভিন্ন দলের নেতারা সেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। সরকারি দল বিএনপি, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, তরুণদের আলোচিত দল এনসিপিসহ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না রাখার পক্ষে মত দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হয়ে নির্দলীয় হওয়াই অধিক গ্রহণযোগ্য। এতে প্রতিযোগিতা বাড়বে, তৃণমূল পর্যায়ে যোগ্য ও সমাজসেবামূলক ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে এবং ভোটাররাও তুলনামূলকভাবে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ পাবেন।


বিজ্ঞাপন


বিষয়টি নির্ধারণ হবে সংসদে: ইসি

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে নাকি নির্দলীয় প্রতীকে, তা সংসদে নির্ধারণ হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ঈদের পর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। এতে করে বছরজুড়ে নির্বাচনের কার্যক্রম চলমান থাকবে।

আরও পড়ুন

আসছে স্থানীয় নির্বাচন, ঈদের পর তিন সিটি দিয়ে শুরু

নির্বাচন কমিশনার বলেন, আমার জানামতে অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে মেয়র প্রার্থী পদে দলীয় মনোনয়নের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন সংসদ বসবে। সংসদ বসার পর এই বিল বা অর্ডিন্যান্স যদি রেটিফাই (অনুমোদন) হয়, তবে সেভাবেই নির্বাচন হবে। আর যদি পরিবর্তন হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যায়, তবে অন্যরকম হবে। আমরা মূলত সংসদ অধিবেশনের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছি।

দলীয় প্রতীকে সায় নেই বিএনপিরও

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে দলীয় প্রতীক নয়, প্রার্থীর যোগ্যতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা যাবে না, এটি গোড়া থেকেই বিএনপি আপত্তি জানিয়েছে। এখন যেহেতু বিএনপি সরকারে, তাই নীতিগতভাবে এটিই সমর্থনযোগ্য।

Vote
জাতীয় নির্বাচনের পর আলোচনায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ছবি: সংগৃহীত

বিএনপির এই নীতিনির্ধারক নেতা বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মার্কার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রার্থী। অনেক সময় নিজের দলের লোকের বাইরেও অন্য প্রার্থী বেছে নিতে হয়।

দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয় না, বরং দলীয় সরকারের অধীনে। সেক্ষেত্রে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করে সরকার হস্তক্ষেপ না করলেও সরকারের ওপর নানা ধরনের অভিযোগ চাপানোর সুযোগ তৈরি হয়।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে যাওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, বিএনপির কোনো জোট নেই। কারণ আন্দোলনও জোটগতভাবে করা হয়নি। সংসদ নির্বাচনেও জোটগতভাবে প্রার্থী দেওয়া হয়নি। নিজ নিজ দলের প্রতীকে অন্যরা নির্বাচন করছে, বিএনপি কোনো প্রার্থী দেয়নি।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, নারী ও তরুণ নেতৃত্ব তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়নের জন্য কিছুটা সময় লাগবে।

নির্দলীয় নির্বাচনের পক্ষে জামায়াতও

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নির্দলীয় প্রতীকের মাধ্যমে জনসেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন

যতদ্রুত সম্ভব স্থানীয় সরকার নির্বাচন: মন্ত্রী

জামায়াত নেতা বলেন, স্থানীয় সরকারই জনসেবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর। এখানে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে জনপ্রতিনিধিরা দলীয় লোকদের অগ্রাধিকার দেবেন, এতে সাধারণ মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। নির্দলীয় নির্বাচনে জবাবদিহিতা বেশি নিশ্চিত হয়।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে প্রার্থী দেওয়া হবে কি না—এ বিষয়ে তিনি বলেন, এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের শীর্ষ নেতারা আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নির্ধারণ করবেন।

‘ঐতিহাসিকভাবে নির্দলীয় ছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচন’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুতে নির্দলীয় প্রতীকে আয়োজন করা হতো। পরে আওয়ামী লীগ শাসনামলে দলীয় প্রতীকের মাধ্যমে নির্বাচন চালু হয়, যার ফলে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যায় এবং সমাজসেবামূলক ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ কমে।

এই অধ্যাপক বলেন, নির্বাচন কমিশনের ওপর বর্তমানে রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি খুব বেশি নয়, কারণ তারা সম্প্রতি একটি জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। তবে দলীয় সরকারের অধীনে স্থানীয় নির্বাচন হলে সংসদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তারের একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি রয়েছে, যা নির্বাচনের কাঙ্ক্ষিত পরিবেশে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

EC22
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। ছবি: সংগৃহীত

ড. ফরিদ উদ্দিন বলেন, বিএনপি ও জামায়াতভিত্তিক জোট যদি প্রার্থী মনোনয়ন ও নির্বাচনি পরিবেশ বজায় রাখতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে এবং কোনো নেতিবাচক কর্মকাণ্ড বা প্রভাব বিস্তার না করে, তাহলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সুষ্ঠু হতে পারে।

দলীয় বনাম নির্দলীয় প্রতীকের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুটি পদ্ধতিরই ভালো-মন্দ রয়েছে। তবে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে হয়ে আসত; দলীয় প্রতীকে নির্বাচন শুরু হয় আওয়ামী লীগ শাসনামলে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যায় এবং সমাজসেবামূলক ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ কমে।

এই বিশ্লেষক বলেন, অতীতে স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষক, সমাজকর্মী ও ত্যাগী ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে এই শ্রেণির মানুষের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায় এবং দলীয় সুবিধাভোগীদের আধিপত্য বেড়ে যায়।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ তা জানিয়ে ড. ফরিদ উদ্দিন বলেন, এর দুটি দিক রয়েছে। একদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ও ইশতেহার বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রতিনিধিদের ব্যবহার করতে চায়। অন্যদিকে এর মাধ্যমে দলীয় নিয়ন্ত্রণ ও আনুগত্য প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও কাজ করছে।

আরও পড়ুন

সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পেরে ফুরফুরে মেজাজে ইসি

ঢাবি অধ্যাপক বলেন, নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী সংখ্যা বেড়ে যায়, প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি পায় এবং নিরপেক্ষ ও সমাজহিতৈষী ব্যক্তিদের সামনে আসার সুযোগ তৈরি হয়। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে এই সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

সম্প্রতি তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশন চিঠি দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। দুটি পৃথক চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২০ সালের ২ জুন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে অনুযায়ী গত বছরের ১ জুন এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। আর ২০২০ সালের ৩ জুন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা হয়। সে অনুযায়ী এই সিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ২ জুন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা হয়েছে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সে অনুযায়ী এই সিটির মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের মেয়াদ প্রথম সভা শেষে পরবর্তী পাঁচ বছর। পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই এই তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আয়োজনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে চিঠি দুটিতে।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতন হলে ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪৯৭টি উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের মেয়র, চেয়ারম্যানদের বহিষ্কার করে অন্তর্বর্তী সরকার। ইউনিয়ন পরিষদ ব্যতীত বর্তমানে সেগুলোকে প্রশাসক দিয়ে চালাচ্ছে সরকার। তবে আদালতের আদেশে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র হন বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন।

এমএইচএইচ/জেবি

 

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর