ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন আর প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর উপলক্ষ। বছরের এই একটি দিন ঘিরে থাকে মানুষের অনেক পরিকল্পনা, অনেক প্রত্যাশা। কিন্তু রাজধানীর কাকরাইলের ফাঁকা রাস্তায় ঈদের দিন বিকালে দেখা গেল ভিন্ন এক বাস্তবতা। সেখানে রিকশার হ্যান্ডেলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন কবির হোসেন। বয়স চল্লিশের কোঠায়। অন্যদের মতো বাড়ি ফেরেননি তিনি। বরং ঈদের দিনটিকেই বেছে নিয়েছেন বাড়তি আয়ের সুযোগ হিসেবে।
রাজধানীর বেশির ভাগ মানুষ যখন নাড়ির টানে গ্রামে ছুটে গেছেন, তখন কবির হোসেনের মতো হাজারো শ্রমজীবী মানুষ থেকে গেছেন প্রায় জনশূন্য এই শহরে। কারণ তাদের জীবনে ঈদ মানে শুধু উৎসব নয়, দায়িত্বও।
বিজ্ঞাপন
কাকরাইল এলাকায় কথা হয় কবির হোসেনের সঙ্গে। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, জীবনযাপনের খরচ দিন দিন বাড়ছে। আমাদের বিশ্রামের সুযোগ নেই। আমরা দিনে কাজ করলে খাই, না করলে উপোস থাকতে হয়। তাই ঈদের দিনেও বসে থাকার সুযোগ নেই।
ঈদের দিন রাজধানীর অনেক সড়ক ফাঁকা থাকলেও নামাজের সময় কিছু এলাকায় মানুষের চলাচল থাকে। বিকালে মানুষ ঘুরতে বের হয়। গণপরিবহন তুলনামূলক কম থাকায় অনেকেই তখন রিকশার ওপর নির্ভর করেন। সেই সুযোগে সকাল থেকেই রাস্তায় নেমে পড়েছেন কবির হোসেন।
আরও পড়ুন: ঈদে ফাঁকা ঢাকায় শূন্যের কোটায় গণপরিবহন
তিনি বলেন, আজ ঢাকায় যাত্রী কম। কিন্তু নামাজে যাওয়া-আসার সময় কিছু ভাড়া পাওয়া যায়। বাস কম থাকায় মানুষ রিকশায় ওঠেন। তাই ঈদের দিনেও কাজ করতে বের হয়েছি।
বিজ্ঞাপন
কবির হোসেনের কথায় কোনো অভিযোগ নেই। আছে শুধু বাস্তবতার সরল স্বীকারোক্তি। তার জীবনে ঈদের আনন্দ এখন আর নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্য।
তিনি বলেন, আমার বয়স এখন প্রায় ৪০। জীবনের অনেকটা সময় চলে গেছে। আগে পরিবারের সঙ্গে অনেক ঈদ করেছি। এখন আর নিজের জন্য ঈদ করার তেমন ইচ্ছা নেই। পরিবার ভালোভাবে ঈদ করতে পারলেই সেটাই আমার ঈদ।
ঈদের আগে গ্রামের বাড়িতে পরিবারের কাছে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন কবির। সন্তানদের নতুন জামা, খাবার আর ছোটখাটো আনন্দের ব্যবস্থা করতে পারলেই তিনি স্বস্তি পান।
কবির বলেন, ‘ছোট বাচ্চাদের জন্যই ঈদ। তারা নতুন জামা কিনবে, আনন্দ করবে। আমি ঢাকায় থাকি শুধু তাদের ভালো থাকার জন্য। তারা হাসলে আমারও ভালো লাগে।’
রাজধানীর ফাঁকা সড়কে রিকশা চালাতে চালাতে তিনি জানান, অনেক সময় উৎসবের দিনগুলোতেই একটু বেশি আয় করার সুযোগ থাকে। তাই ঈদের দিনটা তার কাছে বিশ্রামের নয়, বরং দায়িত্ব পালনের দিন।
কবির বলেন, ঈদের দিন মানুষ বের হয়, নামাজে যায়, আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যায়। তখন কিছু বাড়তি ভাড়া পাওয়া যায়। এই সুযোগটা হাতছাড়া করলে পরে আফসোস হয়।
তবে এই সিদ্ধান্ত সহজ ছিল না। পরিবারের সঙ্গে ঈদ না করার কষ্ট যে নেই, তা কিন্তু নয়। বাস্তবতার কাছে সেই কষ্টকে চাপা দিয়েই শহরে থেকে গেছেন তিনি।
কবির বলেন, পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু গেলে তো কয়েকদিন কাজ বন্ধ থাকে। তখন আয় থাকে না। তাই গ্রামে না গিয়ে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি।
ঈদের দিন সকালে পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে কি না জানতে চাইলে একটু হাসেন কবির হোসেন। বলেন, সকালে কথা হয়েছে। বাচ্চারা নতুন জামা পরেছে। ওদের খুশির কথা শুনেই ভালো লাগছে।
এই কথাগুলো বলতে বলতে আবার যাত্রীর ডাক শোনেন তিনি। দ্রুত রিকশার হ্যান্ডেলে হাত রেখে এগিয়ে যান সামনে। কারণ তার কাছে সময় মানেই আয়, আর আয় মানেই পরিবারের স্বস্তি।
আরও পড়ুন: শিশুদের ঈদ আনন্দে মুখর শিশু মেলা
রাজধানীর কাকরাইল, পল্টন, প্রেসক্লাব এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কবির হোসেনের মতো আরও অনেক রিকশাচালক ঈদের দিনেও কাজ করছেন। তাদের অনেকেই গ্রামের বাড়িতে যাননি। কেউ পাঠিয়েছেন টাকা, কেউ পরিবারের জন্য বাজার করে দিয়েছেন আগেই, আবার কেউ ঈদের পর বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
তাদের সবার গল্প প্রায় একই। নিজের আনন্দের চেয়ে পরিবারের প্রয়োজনই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদের দিন যখন কেউ পরিবারের সঙ্গে ছবি তুলছেন, কেউ আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি দাওয়াতে যাচ্ছেন, তখন এই মানুষগুলো নীরবে চালিয়ে যাচ্ছেন শহরের চলাচলের চাকা। তাদের এই পরিশ্রম চোখে পড়ে না, কিন্তু শহরের স্বাভাবিক চলাচলে এর গুরুত্ব অনেক।
কবির হোসেনের মতো মানুষদের জীবন তাই উৎসবের দিনেও থেমে থাকে না। দায়িত্ব আর ভালোবাসার টানে তারা নিজের আনন্দকে দূরে সরিয়ে রাখেন।
ফাঁকা ঢাকার রাস্তায় তাই ঈদের দিনেও তার রিকশা শুধু একটি বাহন নয়। এটি এক বাবার দায়িত্ববোধ, এক শ্রমজীবী মানুষের ত্যাগ আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর নিরন্তর সংগ্রামের প্রতীক।
এমআর/এএইচ
