রমজান মাস এলেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরের ফুটপাতগুলো যেন অস্থায়ী ইফতার বাজারে পরিণত হয়। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার ধারে সারি সারি দোকানে সাজানো থাকে বেগুনি, পেঁয়াজু, আলুর চপ, বুট, মুড়ি, জিলাপি ও নানা ধরনের শরবত। অল্প দামে সহজে পাওয়া যায় বলেই নিম্নআয়ের ও ভাসমান মানুষের বড় একটি অংশ ইফতারের জন্য এসব খাবারের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
তবে চিকিৎসকরা বলছেন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি এসব খাবার মানুষের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিকেল হলেই ফুটপাতজুড়ে বসে ইফতারের দোকান। বড় বড় কড়াইয়ে তেল গরম করে একের পর এক ভাজা হচ্ছে বেগুনি, পেঁয়াজু, চপ কিংবা আলুর বড়া। দোকানের সামনে থরে থরে সাজানো থাকে ছোলা, মুড়ি ও অন্যান্য খাবার। অনেক জায়গায় শরবত রাখা হয় খোলা পাত্রে। এসব দোকানে ভিড় করেন দিনমজুর, রিকশাচালক, হকার, ঠেলাগাড়ি চালক কিংবা পথচারী মানুষ। অনেকের জন্য এটিই প্রতিদিনের ইফতারের প্রধান ভরসা।
রাজধানীর পল্টন, মতিঝিল, ফকিরাপুল, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বেশির ভাগ দোকানেই একই তেল বারবার ব্যবহার করে ভাজা হচ্ছে খাবার। ধুলোবালি ও যানবাহনের ধোঁয়ার মধ্যেই তৈরি ও পরিবেশন করা হচ্ছে এসব খাবার। খাবার ঢেকে রাখার তেমন ব্যবস্থা না থাকায় সহজেই তা দূষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিজ্ঞাপন
তবু বাস্তবতার কারণে এসব খাবারের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে স্বল্প আয়ের মানুষকে। কর্মব্যস্ত দিন শেষে অনেকেই ফুটপাতেই বসে বা দাঁড়িয়ে ইফতার সেরে নেন।
যাত্রাবাড়ীতে রাস্তার পাশে প্রতিদিন কয়েকজন রিকশাচালক মিলে ইফতার করেন। তাদের মধ্যে জসিম নামের একজনের বলেন, এখন রোজার দিন। সন্ধ্যায় কয়েকজন মিলে একসঙ্গে ইফতার করি। সবার সঙ্গে ইফতার করে অনেক আনন্দ পাই। সামান্য ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু আর বেগুনি কিনে ইফতার করি। এটাই আমার বড় তৃপ্তি।
তিনি জানান, দিনভর রিকশা চালিয়ে খুব বেশি আয় হয় না। তাই কম দামে পাওয়া যায় এমন খাবারই তাদের ভরসা। ফুটপাতের দোকান থেকে সহজে খাবার পাওয়া যায় বলেই এখান থেকেই ইফতার করেন।
শুধু রিকশাচালকই নন, ফুটপাতের দোকানদার, হকার, ঠেলাগাড়ি চালক ও দিনমজুরদের বড় একটি অংশও এসব দোকান থেকে ইফতার কিনে থাকেন। অল্প টাকায় পেট ভরানো যায় বলেই তাদের কাছে এটি সহজ সমাধান।
অন্যদিকে ফুটপাতের ইফতার বিক্রেতাদেরও এ সময় ব্যস্ততা বেড়ে যায়। ফুটপাতে ইফতার বিক্রেতা সালমান বলেন, প্রতি পিস ৫ থেকে ১০ টাকার মধ্যে সব ধরনের আইটেম বিক্রি করি। দাম কম তাই বেচাবিক্রিও ভালো হয়। ইফতারের আগ মুহূর্তে বিক্রি সবচেয়ে বেশি থাকে।
তিনি বলেন, রমজান মাস এলেই ফুটপাতে ইফতারের দোকানের সংখ্যা বাড়ে। ক্রেতারাও মূলত স্বল্প আয়ের মানুষ হওয়ায় তারা কম দামেই খাবার বিক্রি করার চেষ্টা করেন।

তবে চিকিৎসকরা বলছেন, এসব খাবার স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন ডা. শাহজালাল ঢাকা মেইলকে বলেন, দেশের নিম্নমধ্যবিত্ত, নিম্নআয়ের এবং ভাসমান মানুষের বড় একটি অংশ সারা বছরই ফুটপাত থেকে সস্তায় খাবার কিনে খায়। রমজান মাস এলে তাদের ইফতারের প্রায় ৯০ শতাংশ খাবারের যোগান আসে এসব ফুটপাতের দোকান থেকেই।
এই চিকিৎসক বলেন, ফুটপাতের অধিকাংশ খাবারই তৈরি ও পরিবেশন করা হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। খাবারের উপাদানগুলোও অনেক সময় নিম্নমানের কিংবা ভেজালযুক্ত হয়ে থাকে। রমজানে নিম্নআয়ের মানুষের ইফতারের তালিকায় পোড়া তেলে ভাজা বেগুনি, পেঁয়াজু, চপ, বুট ও মুড়ি বড় একটি অংশজুড়ে থাকে।
ডা. শাহজালাল জানান, ভাজাপোড়া খাবার এমনিতেই সহজে হজম হয় না। তার ওপর একই তেল বারবার ব্যবহার করে ভাজা হলে তা আরও ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। এর ফলে অনেকের পেট ফাঁপা, গলাজ্বালা, টক ঢেঁকুর ওঠা, পেট মোচড় দেওয়া, পেটব্যথা কিংবা পাতলা পায়খানার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তিনি আরও বলেন, নিয়মিত এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানা ধরনের গ্যাস্ট্রিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে গ্যাস্ট্রিক ইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ, পেপটিক আলসার ডিজিজ এমনকি পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

শুধু ভাজাপোড়া খাবারই নয়, ফুটপাতে বিক্রি হওয়া পানীয় ও শরবত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই চিকিৎসক। তার মতে, এসব শরবতের বেশির ভাগই তৈরি হয় দূষিত পানি, কৃত্রিম রং এবং নিম্নমানের উপাদান দিয়ে। ফলে এসব পানীয় পান করার ফলে অনেকের ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিস কিংবা টাইফয়েডের মতো রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
রমজানের আমেজে শহরজুড়ে ইফতারির আয়োজন যতই জমজমাট হোক না কেন, বাস্তবতা হলো ঝলমলে দোকানের আলো নয়, বরং ফুটপাতের সাধারণ আয়োজনেই প্রতিদিন রোজা ভাঙছেন হাজারো স্বল্প আয়ের মানুষ। অল্প টাকার ইফতারে তাদের ক্ষুধা মিটলেও, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি এসব খাবার ভবিষ্যতে তাদের স্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এমআর/জেবি

