* হামলা-হুমকির পরও দাঁড়িপাল্লার প্রচারে নারীকর্মীরা
* প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহর-নগর সব জায়গাতেই বিচরণ
* বাড়ি-ঘরে গিয়ে নারী ভোটারদের কাছে ভোটের আহ্বান
* নারীদের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা রাজনৈতিক মাঠেও
* ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় লাখো নারী সমাগমের প্রস্তুতি
সালেহা বেগম। বয়স ষাটের ঘরে। ঠিকমতো হাঁটতে-চলতে না পারলেও আসন্ন নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা মার্কার পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন বয়সের আরও অনেক নারী, যাদের সবাই ছিল হিজাব পড়া। সবার হাতে হাতে দাঁড়িপাল্লা মার্কার লিফলেট। বগুড়ার শেরপুর এলাকায় এমন চিত্র দেখা গেছে। শুধু বগুড়ায়ই নয়, একই অবস্থা দেখা গেছে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়াতেও।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা যাচ্ছে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশেই মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন জামায়াতের নারী কর্মীরা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহর বন্দর এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও দাঁড়িপাল্লার প্রচরে সরব উপস্থিতি তাদের। বিভিন্ন জায়গায় হামলা হুমকি-ধামকির পরেও কার্যক্রম থেমে নেই তাদের। যেন জামায়াতের পক্ষে আদা-জল খেয়েই মাঠে নেমেছেন নারী কর্মীরা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন। আর নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। ভোটের সব থেকে বেশি ভূমিকা রাখবে নারীদের এই ভোট। নারীদের ভোট যারা বেশি টানতে পারবে আগামী সরকার তারাই গঠন করবে। এ কারণে দেশের প্রধান দুই দল নারীদের ভোট টানতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন। তবে জামায়াতের নারী কর্মীদের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। এ নিয়ে আলোচনা চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনেও।
সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের জনসভাগুলোতে নারীদেরর সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। জনসভার মাঠগুলোতে তাদের পৃথক জায়গা নির্ধারণ করা হয়। পরিপূর্ণ হিজাব পড়া নারীদের পাশাপাশি দেখা যায় সাধারণ পোশাকের নারীদেরও। বিশেষ করে বগুড়া সিরাজগঞ্জ কুষ্টিয়ার জনসভাগুলোতে নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
গত ২৪ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া সরকারি আকবর আলী কলেজ মাঠে দেখা যায় মাঠের একপাশে নারীদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের প্রবেশ ও বের হওয়ার প্রবেশপথও করা হয়েছে আলাদা। তাদের জন্য রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবক। যারা নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছেন। একই অবস্থা দেখা গেছে দেখা গেছে বগুরার শেরপুর মাঠেও। জনসভায় আসা একজন বলেন, আমরা স্বপরিবারে এখানে এসেছি। আমাদের বচ্চাদেরও সাথে এনেছি। এবার জামায়াত ক্ষমতায় আসবে। সবাই তাদের অধিকার ফিরে পাবে। আরেক নারী বলেন, এখানে আমরা স্বেচ্ছায় এসেছি। আমরা জামায়াতে ভালোবাসি। জামায়াতের জন্য কাজ করি। এই এলাকার নারীদের বেশিরভাগ ভোট জামায়াত পাবে।
বিজ্ঞাপন
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর পূর্ণরূপে কাজ করার সুযোগ পায় জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে পাড়া মহল্লায় প্রকাশ্যে কাজের সুযোগ পান নারীরা। তখন থেকেই তাদের প্রস্তুতি জাতীয় নির্বাচনের। যখন পুরোদমে ভোটের প্রস্তুতি তখন তাদের কাজের গতিও বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি গিয়ে নারীদের মাঝে তারা দাঁড়িপল্লা মার্কায় ভোটের আহ্বান জানাচ্ছেন।
তবে সম্প্রতি বিভিন্ন জায়গায় নারী কর্মীদের ওপর হামলা হুমকি ধামকির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের তীর বিএনপি নেতাকর্মীদের দিকেই। বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত নেতারা বলেন, গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আমাদের নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত নারী কর্মীদের ওপর ধারাবাহিকভাবে হামলা ও হয়রানি করা হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় তাদের নাজেহাল করা হচ্ছে, অপদস্ত করা হচ্ছে। এমনকি কোথাও কোথাও নেকাব পরিহিত অবস্থায় নারীদের নেকাব খুলতে বাধ্য করা হচ্ছে। অনেকের হাত থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
দেশের মোট ভোটারের অর্ধেক নারী উল্লেখ করে তারা বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই নারী ভোটাররা নারীদের সঙ্গে কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এটি একটি ইতিবাচক দিক যে, নারীরা রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ১২ তারিখের গণভোটে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। সব দলের নারীরাই কাজ করছেন। আমরা তাদের জন্য একটি সুন্দর, নিরাপদ ও সুরক্ষিত পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই। কিন্তু দুঃখজনকভাবে একটি বড় রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে আমাদের নারী কর্মীদের ওপর মারাত্মক আচরণ করা হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক এবং পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এসব বিষয়ে আমরা বিস্তারিতভাবে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেছি এবং অনুরোধ করেছি যেন রিটার্নিং অফিসার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ মাঠে দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই যথাযথ ভূমিকা পালন করেন।’
এদিকে ইতহাসের প্রথমবারের মতো রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নারী সমাবেশ করতে যাচ্ছে জামায়াত। আগামী ৩১ জানুয়ারি দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ইলেকশন ক্যাম্পেইনের সময় নারীদেরকে হেনস্তা ও তাদের ওপর সহিংস হামলার প্রতিবাদে এই সমাবেশের ডাক দিয়েছে জামায়াতের মহিলা বিভাগ। সামাবেশে ঢাকার আশাপাশের জেলাগুলো থেকে কয়েক লাখ নারী সমাগমের লক্ষ্য রয়েছে জামায়াতের।
বুধবার জামায়াতে ইসলামীর আমির ও ঢাকা-১৫ আসনের প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমানের স্ত্রী ডা. আমেনা বেগম ভোটের প্রচারণা ও নারীদের নিয়ে সমাবেশ করেন। ডা. আমেনা বেগম নারীদের উদ্দেশে বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষের জান-মাল ও ইজ্জত রক্ষায় যাদের ওপর ভরসা করা যায়, তাদেরই ভোট দেওয়া উচিত। অতীতের দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে হলে এবং সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হলে দেশপ্রেমিক ও যোগ্য শক্তিকে বিজয়ী করাই সময়ের দাবি।
নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জামায়াতে ইসলামীর গৃহীত বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও সংক্ষেপে তুলে ধরেন তিনি। ডা. আমেনা বেগম বলেন, পরিবারের মায়েরা সচেতন হলে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। এ জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে দলে দলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
টিএই/ক.ম

