শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

সুরভীর ভাগ্য নির্ভর করছে তদন্ত রিপোর্টের ওপর!

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
প্রকাশিত: ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম

শেয়ার করুন:

সুরভীর ভাগ্য নির্ভর করছে তদন্ত রিপোর্টের ওপর!
তাহরিমা জান্নাত সুরভী। ফাইল ছবি
  • সুরভীর ভাগ্য নির্ভর করছে তদন্ত রিপোর্টের ওপর!
  • পুলিশের কেউ কথা বলছে না
  • সুরভীর বাবা বলেন—আমার মেয়ে ষড়যন্ত্রের শিকার
  • সুরভীর আইনজীবী বলছেন, সুরভী কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাকে ফাঁসানো হয়েছে

সদ্য জামিনে মুক্ত হওয়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম জুলাই যোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভীর মামলার ভাগ্য নির্ভর করছে পুলিশি তদন্তের ওপর। পুলিশ বলছে, তদন্ত চলমান। কিন্তু তারা প্রাথমিক তদন্তে কী পেয়েছে, তা বলছেন না। তাদের বক্তব্য একটাই—তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো কিছু বলতে রাজি নন।


বিজ্ঞাপন


সুরভীর পরিবার বলছে, তাকে দেওয়া কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সুরভীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন সেই কথিত সাংবাদিক নাঈমুর রহমান দুর্জয়।

জানা গেছে, ২৬ নভেম্বর গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় বাংলাদেশ প্রতিদিনের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার নাঈমুর রহমান দুর্জয় মামলা করেন। সেই মামলায় এক মাস পর গত ২৫ ডিসেম্বর সুরভীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সেদিন মধ্যরাতে পুলিশ ও সেনাবাহিনী তার বাসায় গিয়ে অভিযান চালায়। সেদিনই সুরভী হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। ওই রাতে তার বাসা ঘেরাও করে তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় কালিয়াকৈর থানা পুলিশ। মামলায় সুরভীর বিরুদ্ধে ৪৯ হাজার ২৭০ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করা হয়। যদিও সেই চাঁদা কখন, কোথায় নেওয়া হয়েছে—তার স্বপক্ষে কোনো কথা মামলার এজাহারে ছিল না। তবুও বিষয়টি কিছু গণমাধ্যম ভিন্নভাবে তথ্য দিয়ে বাড়িয়ে উপস্থাপন করেছে। ফলে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রকৃত ঘটনা আড়াল হয়ে যায়।

কে এই কথিত সাংবাদিক দুর্জয়!
জানা গেছে, নাঈমুর রহমান দুর্জয় এক সময় একটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন ভার্সনের মাল্টিমিডিয়ায় কাজ করতেন। কিন্তু সেখানে তার অপকর্মের কারণে কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরিচ্যুত করে। এরপর সেই দুর্জয় আরেকটি অনলাইনে চাকরি নেন। দুর্জয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে একটি ছবি ব্যবহার করে নিজেকে সন্তানতুল্য ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবে পরিচয় করাতেন। আর এই প্রভাব খাটিয়ে তিনি সুরভীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন।

আরও জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের সূত্র ধরে শাহবাগে জান্নাতের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে জান্নাত সুরভীর সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে। সেই বিষয়টিকে পুঁজি করে কথিত সাংবাদিক তাকে মোটরসাইকেলে বিমানবন্দর ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরান। কিন্তু সেই সময় সুরভীকে কুপ্রস্তাব দিয়ে বসেন দুর্জয়। সুরভী তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে বিষয়টি দুর্জয়ের স্ত্রীকে জানিয়ে দেবেন বলে তাকে জানান। এরপর ক্ষেপে যান সেই কথিত সাংবাদিক। তার বিরুদ্ধে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলে সুরভীর বিরুদ্ধে মামলা করেন তিনি। মামলায় বলা হয়, সুরভী দুর্জয়ের কাছ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা নিয়েছেন, তবে মামলায় উল্লেখ করা হয় ৫ হাজার টাকা। কিন্তু বিষয়টি বিভিন্ন মিডিয়ায় উপস্থাপন করা হয় ৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির মতো বড় আকারে।


বিজ্ঞাপন


গাজীপুরের সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি কথিত সাংবাদিক দুর্জয় কোনো অ্যাসাইনমেন্ট ছাড়াই গাজীপুর যান। সেখানে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হাদী হত্যার বিচারের দাবিতে আয়োজিত কর্মসূচিতে দুর্জয়কে দেখে সুরভী ভুয়া ভুয়া বলে স্লোগান দিতে থাকেন। অফিসের বাইরে ব্যক্তিগত কাজে যাওয়ায় দুর্জয় চাকরিচ্যুত হন।

picture
জামিনে মুক্ত হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে সুরভী। ছবি: ঢাকা মেইল।

রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্সের মতে, মূলত সুরভীর প্রত্যাখ্যান, জনসম্মুখে প্রতিবাদ ও ভুয়া স্লোগান এবং চাকরি হারানোর আক্রোশই দুর্জয়কে প্রতিশোধপরায়ণ করেছে। এসব কারণেই দুর্জয় তার আক্রোশ মেটাতে সংঘবদ্ধ মিডিয়াকে ব্যবহার করেন। মিডিয়া ট্রায়াল চালিয়ে সুরভীর বিরুদ্ধে ৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির মিথ্যা সংবাদ প্রচারের ব্যবস্থা করেন তিনি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংগঠনগুলোর দাবি, জুলাইকে এবং জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতদের প্রশ্নবিদ্ধ করতেই ইচ্ছাকৃতভাবে সুরভীসহ জুলাই যোদ্ধাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তাকে ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না!
এ ঘটনায় ৬ ডিসেম্বর সুরভীকে বয়স কম দেখিয়ে আদালতে তুলে রিমান্ড চাওয়া হয়। সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিতর্কের মুখে পড়েন তদন্তকারী কর্মকর্তা। ফলে মাত্র ১৭ বছর বয়সী সুরভীকে ২০ বছর দেখিয়ে রিমান্ড চাওয়ার বিষয়টির সত্যতা পায় আদালত। ফলে রাতেই তাকে জামিন দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর থেকে তদন্তকারী কর্মকর্তার ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

তবে ওমর ফারুককে ফোনে না পাওয়া গেলেও বুধবার গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি খন্দকার নাসির উদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, তদন্ত চলমান। শেষ হোক আগে, তারপর রিপোর্ট দেওয়ার পর কথা বলব।

সুরভীর বাবার দাবি
সুরভীর বাবা ঢাকা মেইলকে বলেন, বাবা, আমরা কোনো রাজনীতি বুঝি না। আমার মেয়ে কলেজে যাওয়ার সময় দুই-একশ টাকা নিত। পরে শুনি সে আন্দোলনে যেত। মানা করছিলাম, শোনেনি। শাহবাগে আসা-যাওয়ার সময় কোনো এক সাংবাদিক পোলা তাকে নাকি কুপ্রস্তাব দিত। সেই কথা তার মাকেও জানিয়েছিল। এরপর এখন শুনি সেই পোলাই ওর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। বাবা, আমার মেয়েটা ষড়যন্ত্রের শিকার। আমরা এর বিচার চাই।

সুরভীর আইনজীবী যা বলছেন
সুরভীর আইনজীবী রাসেদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, সেই কথিত সাংবাদিক নাঈমুর রহমান দুর্জয় এই ঘটনার আগে তাকে কুপ্রস্তাব দিয়েছিল বলে সুরভী জানিয়েছে। তবে সুরভীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা মিথ্যা ও বানোয়াট। মূলত তার প্রস্তাবে সুরভী রাজি না হওয়ার কারণেই এই মিথ্যা মামলায় সুরভীকে ফাঁসানো হয়েছে। বিষয়টি পুলিশও তদন্ত করছে। আশা করছি, এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে।

picture
নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয় সুরভীকে। ছবি: সংগৃহীত

তিনি জানান, সুরভী সেই কুপ্রস্তাবের কথা তার মাকেও জানিয়েছিল। এরপর সুরভী তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছিল। আর সুরভী যদি চাঁদা চেয়ে থাকে, তাহলে সেই কথা তো এজাহারে নেই। এমনকি গ্রেপ্তারের ঘটনায় কোনো আলামতও নেই। পাশাপাশি বাদীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ডের জন্য আবেদন করেন, কিন্তু তার জন্মসনদে বয়স মাত্র ১৭ বছর উল্লেখ রয়েছে।

জামিনে বের হয়ে সুরভী যা জানালেন
সুরভী সম্প্রতি জামিনে কারাগার থেকে বের হয়েছেন। বের হওয়ার পর বুধবার তিনি গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, ঘটনার দিন মধ্যরাতে তাকে তুলে নেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো ওয়ারেন্টও দেখাতে পারেনি। এরপর তিনি তাদের কাছে বহুবার অনুরোধ করেন, যেন তাকে থানার হাজতে না রাখা হয়, কিন্তু তারা তার কথা শোনেনি। উল্টো খারাপ আচরণ করেছে। তাকে যে কারাগারে রাখা হয়েছিল, সেখানেও তাকে নির্যাতন ও মারধর করা হয়েছে।

জুলাইযোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভী অভিযোগ করেন, তাকে ১১ দিন কারাগারে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিতভাবে তাকে হয়রানি করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমার বয়স মাত্র ১৭ বছর। এ ছাড়া সামনে পরীক্ষা ছিল। এসব বিষয় আদালতে জানানো সত্ত্বেও আমাকে রিমান্ডে পাঠানো হয়। শেষ পর্যন্ত জামিন মঞ্জুর হলেও ১১ দিন পর আমাকে লাশের মতো করে জেল থেকে বের হতে হয়েছে। আমার কাছে জেল মানেই ছিল টর্চার বা নির্যাতন।

সুরভী জানান, আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেছেন যে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। তবুও রিমান্ড দেওয়া হয়েছে এই বলে যে উপর লেভেল থেকে অর্ডার আছে। এই উপর লেভেলটা কে? তদন্ত প্রতিবেদন ছাড়াই কীভাবে মামলা হয়? ১৭ বছরের একজন মেয়েকে কীভাবে রিমান্ড দেওয়া হয়?

picture
আদালতে শুনানি শেষে ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুরের পর সুরভীকে কারাগারে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।   

যে মামলায় তাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে, সেখানে প্রতারণা, চাঁদাবাজি, মারধর ও চুরিসহ ছয়টি ধারা দেওয়া হয়েছে—যেগুলোর কোনোটিই তিনি করেননি বলে দাবি সুরভীর।

জন্মসনদে বয়স মাত্র ১৭ বছর
তাহরিমা জান্নাত সুরভীর প্রকৃত বয়স মাত্র ১৭ বছর ১ মাস। তিনি গাজীপুরের একটি কলেজে পড়াশোনা করছেন। তার বাবার দাবি, তার মেয়ে রাজনীতির কিছুই বোঝে না। কিন্তু সে অন্যদের সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে যেত। পরবর্তীতে সেই সুরভী আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা হয়ে ওঠেন, যা তার পরিবারের লোকজনও জানত না।

এদিকে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সুরভীর জন্মসনদটি ঢাকা মেইলের পক্ষ থেকে যাচাই করা হয়েছে। সরকারি জন্মনিবন্ধন সার্ভারে সেটির সত্যতা মিলেছে।

এদিকে জুলাইযোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভীর বয়স নিয়ে আদালতে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করায় তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুককে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন আদালত। পরে এ ঘটনায় তাকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে কারণ দর্শাতে বলা হয়। এর আগে মামলার এজাহারে তাহরিমার বয়স ২১ বছর উল্লেখ থাকলেও পরবর্তীতে আদালতে দাখিল করা পুলিশ ফরওয়ার্ডিং প্রতিবেদনে বয়স ২০ বছর দেখানো হয়। বয়সের এই অসঙ্গতি আদালতের দৃষ্টিগোচর হলে তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়।

এমআইকে/এআর

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর