বুধবার, ৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

চলাচলে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে ‘কালো জঙ্গল’

আব্দুল হাকিম
প্রকাশিত: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

শেয়ার করুন:

dhaka
এলোমেলো তার বাড়াচ্ছে ঝুঁকি। ছবি: ঢাকা মেইল
  • বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডের ৩০ শতাংশ তারের কারণে
  • নতুন সংযোগে পুরনো তার অপসারণ হয় না
  • আন্ডারগ্রাউন্ডই একমাত্র টেকসই সমাধান
  • সুন্দর ও নিরাপদ ঢাকার দাবি বিশেষজ্ঞদের 

রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাটে ঝুলন্ত বৈদ্যুতিক, টেলিফোন ও ইন্টারনেট তারের জঞ্জাল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ক্রমেই বিপজ্জনক করে তুলেছে। মহাখালী, মিরপুর, উত্তরা বা বাড্ডা—সব এলাকাতেই বিদ্যুতের খুঁটিতে ঝুলে থাকা কালো তারের জট ফুটপাত পর্যন্ত নেমে এসেছে। হাঁটতে গিয়ে অনেক সময় হাত দিয়ে তার সরাতে হয়, কখনো আবার ঝুঁকে বা পাশ কাটিয়ে রাস্তায় যেতে হয়। এই পরিস্থিতি শুধু চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে না, বরং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।


বিজ্ঞাপন


রাজধানীর নদ্দা, বসুন্ধরা ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি খুঁটিতে টেলিফোন, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের অসংখ্য তার ঝুলে আছে। কোথাও তা মাথার উচ্চতায়, কোথাও কোমরের নিচে। ঝুলন্ত তারের কারণে পথচারী এবং মোটরসাইকেল আরোহীরা বিপদে পড়ছেন।

নদ্দা এলাকার ভাসমান দোকানি হাফিজুল্লাহ বলেন, কেউ তারগুলো বাঁধলেও কয়েক দিনের মধ্যে তা আবার নিচে নেমে আসে। কখনো কেটে ফেলার পরেও রাস্তায় তার পড়ে থাকে, যা ছোট বাচ্চা এবং বৃদ্ধদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সোহেল আহমেদ জানালেন, রাতে টিউশনি থেকে ফেরার সময় প্রায়ই ঝুলন্ত তারে আটকে যান। চোখে না পড়ার কারণে হঠাৎ মাথায় লেগে বিপদও ঘটতে পারে। উত্তরা এলাকার খুঁটিতে ২৫টি পর্যন্ত আলাদা তার ঝুলতে দেখা যায়। নতুন সংযোগ নেওয়ার সময় পুরনো অকার্যকর তার সরানো না হওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। খিলক্ষেত এলাকায় বাজার সংলগ্ন রাস্তার পাশে ঝুলন্ত তারের কারণে মানুষের চলাচল সীমিত এবং প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।


বিজ্ঞাপন


সিটি করপোরেশন বা বিদ্যুৎ বিভাগ বিভিন্ন সময়ে হঠাৎ অভিযান চালিয়ে ঝুলন্ত তার অপসারণ করে। কিন্তু এতে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসে না। বরং হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। গত সেপ্টেম্বরের উত্তরা এলাকার এক বহুতল ভবনে সব ধরনের ঝুলন্ত তার একযোগে কেটে ফেলা হলে মুহূর্তের মধ্যে আশেপাশের ভবনের ইন্টারনেট, টেলিফোন ও টেলিভিশন সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাসাবাড়ি, স্কুল, কলেজ, অফিস ও ব্যাংকের কার্যক্রম স্থবির হয়।

আরও পড়ুন

‘রিকশা ট্র্যাপার’ এখন নগরবাসীর গলার কাঁটা!

বিটিআরসি মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজ বলেন, নতুন লাইসেন্সিং গাইডলাইন ও নীতিমালা অনুমোদিত হয়েছে। টেক নিউট্রালিটিভিত্তিক নেটওয়ার্ক শেয়ারিং উন্মুক্ত হবে। সিটি করপোরেশন, রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজ, বিদ্যুৎ বিভাগসহ অন্যান্য সরকারি সংস্থার সমন্বয় ছাড়াই কার্যকর করা সম্ভব নয়।

Dhaka2

ঢাকার আকাশ এখন নীল নয়, দেখা যায় শুধুই তারের জঙ্গল। প্রধান সড়ক, ফুটপাত, অলিগলি—প্রতিটি জায়গায় টেলিফোন, ইন্টারনেট, ক্যাবল টিভি ও বিদ্যুতের অসংখ্য তার ঝুলছে। বর্ষার সময়ে পানি জমলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ২০২৪ সালের আগস্টে মতিঝিল, রামপুরা ও শ্যামলীতে তিনজন মানুষ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান।

১৯৯০-এর দশক থেকে বেসরকারি অপারেটররা খুঁটিতে তার টানছে। কোনো একক নীতিমালা বা সমন্বিত কর্তৃপক্ষ নেই। দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন ‘আকাশ তারমুক্ত ঢাকা’ প্রকল্পের আওতায় কিছু এলাকায় ভূগর্ভস্থ তারের কাজ হলেও তা নগরের সামগ্রিক সমস্যা সমাধান করতে পারছে না। রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে সাজানো আলোকসজ্জা, ফুটপাতের গাছপালা, বিলবোর্ড—সবই তারের আড়ালে হারিয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

আয়ের সিংহভাগ ‘গিলে নিচ্ছে’ বাড়িভাড়া

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতি বছর বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডের ৩০ শতাংশ ঘটে তারের জট বা শর্ট সার্কিটের কারণে। ২০১৯ সালের চকবাজার অগ্নিকাণ্ডের পরও অনেক এলাকা অনিরাপদ। ডিএসসিসি ‘আকাশ তারমুক্ত প্রকল্প’ হাতে নিয়েছে, কিন্তু ১০ শতাংশও কার্যকর হয়নি। অনুমোদন ও অংশগ্রহণ না থাকায় প্রকল্প থেমে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাধান একটাই—তারের জট আকাশ থেকে নামিয়ে ভূগর্ভে নেওয়া। খরচ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, সময় লাগবে অন্তত পাঁচ বছর। ডিপিডিসি, বিটিসিএল, ওয়াসা, এলজিইডি, আইএসপি—সব সংস্থার সমন্বয় ছাড়া প্রকল্প সফল হবে না। চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের বড় শহরে ইতোমধ্যেই এই মডেল কার্যকর।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঝুলন্ত তারের জট শুধুই প্রযুক্তিগত বা সৌন্দর্যগত সমস্যা নয়। এটি শহরের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল। প্রতি বছর মানুষ মারা যায়, ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং শহরের চেহারা কুৎসিত হয়ে উঠছে। সময় এসেছে, নগর কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ সংস্থা ও বেসরকারি অপারেটর সবাই একসাথে বসে পরিকল্পনা করবে, যাতে আকাশে ঝুলে না থাকে মৃত্যু ও বিশৃঙ্খলার জাল, বরং দৃশ্যমান হয় সুন্দর, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল ঢাকা।

Dhaka3

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) পরিচালক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘শহরের ঝুলে থাকা তারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এগুলো স্থাপনের জন্য কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। যার ইচ্ছা সে যেভাবে খুশি ডিশ বা কেবলের সংযোগ টেনে নিয়েছে—রাস্তার ওপর দিয়ে, বিদ্যুতের খুঁটি বা গাছের ডালের মধ্য দিয়ে। অথচ শুরু থেকেই একটি নীতিমালা থাকা দরকার ছিল। এখন তারগুলোকে সুশৃঙ্খল করতে হলে সেই নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি, পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব সেবা সংস্থাকে এতে বাধ্য করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা করা যায়নি। সিটি করপোরেশন একসময় সব তার আন্ডারগ্রাউন্ডে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি—উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়েছে।’

এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘বাংলাদেশের বাস্তবতায়, বিশেষ করে ঢাকা শহর যেভাবে গড়ে উঠেছে, সেখানে হঠাৎ করে সব তার আন্ডারগ্রাউন্ডে নেওয়া অত্যন্ত জটিল। একটি ইতোমধ্যে গড়ে ওঠা শহরকে উপরের মাধ্যমে শৃঙ্খলায় আনা যেমন কঠিন, তেমনি নিচের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল করাও সহজ নয়। তবে নতুন শহরের ক্ষেত্রে আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যবস্থা সবচেয়ে কার্যকর ও উপযোগী। সেটির জন্য শুরু থেকেই পরিকল্পনা থাকতে হবে। যেসব এলাকায় ইতোমধ্যে অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, সেখানে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব।’

আরও পড়ুন

বৃক্ষসেবার নামে ‘পার্ক দখল’

ড. আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, ‘এখানে দুটি বড় বিষয় রয়েছে—একটি অর্থ ব্যয়, অন্যটি পুনঃউন্নয়ন ও পুনর্গঠনের জটিলতা এবং এতে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ। এসব বিবেচনায় নিয়েই শহরের তার ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলায় আনা প্রয়োজন ছিল। বিদ্যমান শহরে প্রয়োজনে উপরের মাধ্যমেই সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তবে আদর্শভাবে নতুন শহর বা নতুন এলাকায় সব তার আন্ডারগ্রাউন্ডে নেওয়াই সর্বোত্তম সমাধান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের বিদ্যমান উদ্যোগগুলো সফল হয়নি এবং পুরো প্রক্রিয়াটি ব্যর্থ হয়েছে। এখন করণীয় হলো—নতুন শহর বা নতুন উন্নয়ন এলাকায় আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল ব্যবস্থার জন্য শুরু থেকেই পরিকল্পনা করা এবং সব সেবা সংস্থাকে বাধ্য করা, যেন তারা সুশৃঙ্খলভাবে কেবল স্থাপন করে। এতে নগর দৃশ্য নষ্ট হবে না এবং দৃষ্টি দূষণও কমবে।’

Dhaka4

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, ‘দেশে কেবল ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধানে সরকারের সমন্বিত ও কার্যকর সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা একই কেবলের মাধ্যমে ভয়েস সার্ভিস দেওয়ার পাশাপাশি ডাটা সার্ভিসও দিতে চাই। যদি সরকার ট্রিপল প্লে সার্ভিসের অনুমোদন দেয় এবং একই কেবলের মাধ্যমে একাধিক আইএসপি ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পায়, তাহলে অপ্রয়োজনীয় কেবল ব্যবহারের সংখ্যা অনেকাংশে কমে যাবে। এতে একদিকে যেমন শহরের সৌন্দর্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে সেবার মানও উন্নত হবে।’

আরও পড়ুন

ধুলোয় কাহিল রাজধানীবাসী!

আমিনুল হাকিম বলেন, ‘এ ধরনের সমন্বিত নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে আইএসপি খাতের দীর্ঘদিনের জটিলতা দূর হবে এবং গ্রাহকরা আরও নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা পাবেন।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কেবল ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে করপোরেশন এখন আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।’ তিনি জানান, এ সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কোনো চেষ্টার কমতি নেই এবং এটি অবশ্যই সমাধানযোগ্য। এ বিষয়ে সরকার ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। যেহেতু বিটিআরসি নীতিমালা ও রুলস-রেগুলেশন সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখছে এবং সিটি করপোরেশনেরও নিজস্ব দায়িত্ব রয়েছে, তাই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই টেকসই সমাধান সম্ভব।

আসাদুজ্জামান বলেন, নিরাপত্তার দিক থেকে বিবেচনা করলে আন্ডারগ্রাউন্ড কেবল ব্যবস্থাই সবচেয়ে ভালো বিকল্প। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের আগ্রহের কোনো ঘাটতি নেই এবং ভবিষ্যতে পরিকল্পিতভাবে এ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

এএইচ/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর