রোববার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

নানা উদ্যোগেও কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কিশোর গ্যাং?

ঢাকা মেইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১ এপ্রিল ২০২৪, ০৬:১৪ পিএম

শেয়ার করুন:

নানা উদ্যোগেও কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কিশোর গ্যাং?
কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত দিন দিন বেড়েই চলেছে। ছবি: সংগৃহীত

পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনী নানা উদ্যোগ নিলেও ‘কিশোর গ্যাং’ এর তৎপরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং বড় শহরগুলোর গণ্ডি ছড়িয়ে এই সমস্যা এখন বিস্তৃত হচ্ছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও। এমনকি অনেক জায়গায় একাধিক কিশোর গ্যাং একে অন্যের সাথে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে।

গত শুক্রবার চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় আহত হওয়া চিকিৎসক কোরবান আলী বুধবার মারা গেছেন। ছেলেকে ওই গ্যাংয়ের হামলা থেকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন কোরবান আলী।

পুলিশ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত কিছু রাজনৈতিক নেতার পৃষ্ঠপোষকতাই কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী। মাদক বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্তৃত্ব তৈরির জন্য এলাকার শিশু কিশোরদের নিয়ে গ্যাং তৈরি করে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেন ওই ধরনের নেতারা।

‘পুলিশ প্রতিনিয়ত ব্যবস্থা নিচ্ছে। বছরে ৪/৫শ আটক হচ্ছে। মামলা হচ্ছে। সংশোধনাগারে দেওয়া হচ্ছে অনেককে। কিন্তু শিশু কিশোরদের নিয়ে এ ধরনের কিশোর গ্যাং তারপরও বন্ধ হচ্ছে না মূলত কথিত কিছু বড় ভাই ও কিছু পলিটিক্যাল নেতার কারণে,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র ফারুক হোসেন।

অন্যদিকে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলছেন, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও সমাজ ব্যবস্থায় ঘাটতির কারণেই কিশোর অপরাধ বা গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।

বুধবার (১০ এপ্রিল) পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ চট্টগ্রামেই সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় বলেছেন, কিশোর গ্যাংগুলোর পেছনে যাদের মদদ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ‘দেশে এটি (কিশোর গ্যাং) নতুন সমস্যা, এটিকে দূরীভূত করার জন্য সরকার কাজ করছে। কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্যে যেই থাকুক বা সে যে দলেরই হোক তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং হচ্ছে,’ বলছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন

‘কিশোর গ্যাং’ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনা

কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বন্ধের তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর

এর আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও আলোচনায় এসেছে কিশোর গ্যাং ইস্যুটি এবং এ নিয়ে কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

ওই বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘কিশোর অপরাধীদের সংশোধনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন সরকার প্রধান।’

কিশোর গ্যাংয়ে সংখ্যা কত? কারা জড়িত হচ্ছে?

বাংলাদেশে রাজধানী ঢাকার উত্তরায় ২০১৭ সালে স্কুল শিক্ষার্থী আদনান খুনের ঘটনায় প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিল কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তখন বেশ কয়েকজন কিশোরকে আটক করেছিল র‍্যাব যারা একই গ্রুপের সদস্য ছিল। সে সময় আলোচনায় এসেছিল উত্তরা ডিসকো বয়েজ ও বিগ বস কিশোর গ্যাং নামের দুটো গ্রুপ। কিন্তু এরপর থেকে নিয়মিতই ঢাকাসহ নানা জায়গায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে খবরাখবর প্রকাশ হচ্ছিল গণমাধ্যমে।

Gang2

২০১৯ সালে বরগুনায় রিফাত শরীফ নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার পর আলোচনায় আসে 'বন্ড ০০৭' নামের একটি গ্রুপ।

ঢাকার উত্তরার ১২ নম্বরে সেক্টরে বসবাস করেন নাহিদ হোসেন। উত্তরা এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে প্রায়শই খবর আসে গণমাধ্যমে।

ফারুক হোসেন বলছেন, ‘এরা হুট করে এসে একেকটা ঘটনা ঘটায়। আর তাতে তাৎক্ষণিক কারও ক্ষতি হয়ে যায়। যেমন কারও সাথে এদের আরও একটু কথা কাটাকাটি হলো, কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা যাবে ৩০/৪০ জন এসে হামলা শুরু করল। এলাকায় বস্তিগুলোতে থাকে এমন কিশোরদের পাশাপাশি পড়ালেখা করে এমন কিশোরদেরও দেখতে পাচ্ছি এসব গ্রুপগুলোতে।’ বলছিলেন তিনি।

কিন্তু ঢাকাসহ সারাদেশে এমন কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা কত বা কত কিশোর তরুণ এ ধরনের অপরাধে জড়িত তার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া কঠিন।

তবে ২০২২ সালে পুলিশের এক প্রতিবেদনে সারাদেশে ১৭৩টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছিল। এতে বলা হয়েছিল, ঢাকাতেই ৬৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় আছে। আর এসব দলগুলোতে ১০ থেকে ৪০/৫০ জন পর্যন্ত সদস্য আছে।

গাংচিল, ম্যাক্স পলু, বাট্টু বাহিনী, পটেটো, কবজি কাটা গ্রুপ, লাল বাহিনী- এমন সব বাহারি নামের কিশোর গ্যাংগুলোর সদস্যরা ছিনতাই, নারীদের উত্ত্যক্ত করা, জমি দখলে সহায়তাসহ নানা ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ার তথ্য এসেছে গণমাধ্যমে।

তবে চলতি বছর জানুয়ারিতে ঢাকার মধুবাগে ব্যাডমিন্টন খেলাকে কেন্দ্র করে দু'দল কিশোরের সংঘর্ষে একজন নিহত হবার পর র‍্যাব জানায়, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে এক হাজার ১২৬ জনকে শুধুই র‍্যাবই আটক করেছে কিশোর গ্যাংয়ের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে। এর মধ্যে ২০২৩ সালেই আটক হয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশ।

আরও পড়ুন

কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় পুলিশ, তালিকায় হাজার নাম

পল্লবীজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের দাপট, গ্যাং লিডাররা পুলিশের সোর্স!

টাকার বিনিময়ে মারামারি দখলবাজি ছিনতাইয়ে কিশোর গ্যাং

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নানা ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচিও হাতে নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ ও র‍্যাব।

কিন্তু তারপরও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েই চলেছে কেন এমন প্রশ্নের উত্তরে ডিএমপির মুখপাত্র ফারুক হোসেন বলছেন, কিছু রাজনৈতিক নেতা এ জন্য দায়ী।

‘তারাই কিশোর তরুণদের বিপথগামী করছে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের জন্য। আমরা রাজনৈতিক নেতা বিশেষ করে কাউন্সিলর ও অন্যদের সাথে নিয়মিত মতবিনিময় করছি এবং উৎসাহিত করছি যাতে কিশোর গ্যাংকে কেউ প্রশ্রয় না দেয়,’ বলছিলেন তিনি।

আবার অনেক মামলায় কিশোর গ্যাংয়ের ‘বড় ভাই বা মদদদাতা’ হিসেবে অনুসন্ধানে যাদের নাম উঠে এসেছে তাদেরও আসামি করা হয়েছে, বলছিলেন তিনি।

এর আগে, পুলিশের প্রতিবেদনেও ঢাকার ২১ জন কাউন্সিলের নাম উঠে এসেছিল কিশোর গ্যাংয়ের প্রশ্রয়দাতা হিসেবে। যদিও তাদের কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

পুলিশ বলছে, মূলত পাড়া মহল্লার কিশোরদের দলবদ্ধ হয়ে চলাফেরা করার যে প্রবণতা সেটিকেই ব্যবহার করে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি এসব গ্যাং তৈরি করেন।

‘১৫/১৬ বছর বা কাছাকাছি বয়সের কিশোরদের মধ্যে একটা হিরোইজম কাজ করে। সেটাকেই ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি তাদের ভুল পথে ঠেলে দেয়। এভাবেই তারা জড়িয়ে পড়ে নানা অপরাধমূলক কার্যক্রমে,’ বলছিলেন ফারুক হোসেন।

যদিও সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলছেন, কিশোর অপরাধীরা যেসব অপরাধ করে এবং এর মাধ্যমে যে অর্থ সংগ্রহ হয় তার ভাগবাটোয়ারা অনেক দূর পর্যন্ত যায় এবং এমনকি যাদের প্রতিরোধ করার কথা তারাও কেউ কেউ সুবিধা নিয়ে এসব কিশোর গ্যাংকে সুযোগ করে দেয়।

থামানো যাচ্ছে না কেন

তৌহিদুল হক বলছেন, কিশোর অপরাধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয় সেটি একপক্ষীয় এবং সংশোধনাগারগুলোও মানসম্মত নয়, অর্থাৎ কিশোর অপরাধীদের সংশোধন করে ভালো নাগরিক করার জন্য সক্ষম নয়। ‘এখানে যে অপরাধ করছে শুধু তাকেই ধরা হচ্ছে। যারা কিশোরদের সংঘবদ্ধ করে অপরাধ করাচ্ছে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ মদদদাতা বড় ভাই বা রাজনৈতিক নেতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

যদিও পুলিশের মুখপাত্র ফারুক হোসেন বলছেন, এর আগের মামলাগুলোর তদন্ত পর্যায়ে মদদদাতা হিসেবে যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের মামলার আসামি করা হয়েছে।

Gang3

তবে পুলিশ ও সমাজ অপরাধ গবেষকরা সবসময়ই বলে আসছেন, পরিবারের তরুণ সদস্যদের সঠিক নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে সব পিতা মাতা কিংবা পরিবার সবসময় ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিশেষ করে দরিদ্র অর্থাৎ প্রান্তিক পরিবারগুলোতে সঠিক অভিভাবকত্ব দেখা যায় না বলে সেসব পরিবারের কিশোররা সহজে ভুল পথে যায়, এমন অনেক উদাহরণের কথা জানাচ্ছেন তারা।

‘অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকের সাথে সন্তানের দূরত্ব, সঠিক নির্দেশনা বা সঠিক প্যারেন্টিং না থাকার সুযোগে অপরাধের সাথে কিশোর বয়সেই অনেকের পরিচয় ঘটে যায়। আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে ধরা পড়লে যেসব সংশোধনাগারে পাঠানো হয় সেগুলো খুবই সেকেলে। পাশাপাশি সামাজিক অনুশাসন একেবারেই ঢিলেঢালা পর্যায়ে চলে যাওয়ার কারণেই কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার থামানো যাচ্ছে না,’ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তৌহিদুল হক।

আরও পড়ুন

কিশোর গ্যাংদের জামিনে সুপারিশ করলেই ব্যবস্থা: ডিবিপ্রধান

কিশোর গ্যাং নিয়ে একজন চিকিৎসকের ভাবনা

ফারুক হোসেন বলেন, শুধু কয়েকজনকে শাস্তি দিয়ে বা আইনের প্রয়োগ করেই কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বন্ধ করা অসম্ভব, বরং এজন্য সবার সহযোগিতা জরুরি। ‘সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কিশোর তরুণরা যেন ভুল পথে না যায় সেজন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্ব পরিবার থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি সবার। পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা করছে সবাইকে মোটিভেট করার যাতে অল্প বয়সী বাচ্চারা ব্যবহৃত না হয়,’ বলছিলেন তিনি।

ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকার বাইরেও

গত ৩০ মার্চ দক্ষিণাঞ্চলীয় পিরোজপুর জেলায় তরুণীকে জিম্মি করে টাকা আদায়ের ঘটনায় ১৮ জনকে আটক করে সেখানকার পুলিশ সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, আটককৃতরা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, যাদের বয়স ১৫ থেকে সতের বছরের মধ্যে। ওই সংবাদ সম্মেলনে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুকিত হাসান খান জানান, পিরোজপুর শহর ও এর আশেপাশে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেড়েই চলেছে।

এর আগে, ১৫ মার্চ মাদারীপুরে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয় এবং পুলিশ দুজনকে আটক করতে সক্ষম হয়।

ভোলার দৌলতখান উপজেলায় গত ফেব্রুয়ারিতে কিশোর গ্যাংয়ের হাতে খুন হন এক যুবক। ক্রিকেট খেলার সময় কথা কাটাকাটির জের ধরে এ ঘটনা ঘটে। ওই মাসেই জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলায় কিশোর গ্যাংয়ে ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করে র‍্যাব।

৩০ জানুয়ারি কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের অস্ত্রের মহড়া ও গুলি করার ঘটনা বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অনেক ঘটনায় উঠে এসেছে কিশোর গ্যাংয়ের নাম। -বিবিসি বাংলা

জেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর