বদহজম, গ্যাস কিংবা বুক জ্বালাপোড়া, সমস্যা যাইহোক না কেন সমাধান একটাই- গ্যাসের ওষুধ। সবসময় এন্টাসিড বা পিপিআই জাতীয় ওষুধ খাওয়া তো অনেকের জন্য প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ এগুলো কিডনি ও লিভারের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসকরা। প্রতিদিন এ জাতীয় ওষুধ সেবনে পাকস্থলীর স্বাভাবিক হজম ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাকৃতিকভাবে গ্যাস ও বদহজমের সমস্যার স্থায়ী সমাধানে গ্যাসের ওষুধের বিকল্প এমন ১২টি ঘরোয়া উপায় জেনে নিন আজকের প্রতিবেদনে-
১. কাঁচা পেঁপে: গ্যাসের সমস্যা সমাধানে কাঁচা পেঁপের তরকারি বা সেদ্ধ করে খেতে পারেন। এতে রয়েছে ‘পাপাইন’ নামক শক্তিশালী পরিপাককারী এনজাইম যা মাছ-মাংসের মতো জটিল প্রোটিন সহজেই ভেঙে হজমে সহায়তা করে। আর খাবার দ্রুত হজম হয়ে গেলে পেটে গ্যাস বা পেট ফাঁপার সমস্যা হয় না।

২. কাঁচা কলা: কাঁচা কলায় প্রচুর পরিমাণে ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ এবং ‘পেকটিন’ নামক আঁশ রয়েছে যা পরিপাকতন্ত্রে ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করে। ফলে পরিপাকতন্ত্রে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরি হলেও বুকে বা পেটে জ্বালাপোড়া হয় না। কাঁচা কলা সেদ্ধ করে ভর্তা বানিয়ে বা তরকারি হিসেবে খেতে পারেন।
৩. দারচিনি ও জিরার চা: পাকস্থলীর অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং পেটের গ্যাস কমাতে জিরা এবং দারচিনির চা খান। এক গ্লাস পানিতে এক চামচ জিরা ও সামান্য দারচিনি ১০ মিনিট ফুটিয়ে নিন। এই চা কুসুম গরম অবস্থায় পান করুন।
আরও পড়ুন: মেদ ঝরাবে ভেষজ চা
৪. ঠান্ডা দুধ: গ্যাস্ট্রিকের কারণে বুকে বা পেটে তীব্র জ্বালাপোড়া হলে ঠান্ডা দুধ খেতে পারেন। আধা গ্লাস ঠান্ডা দুধ চায়ের মতো চুমুক দিয়ে ধীরে ধীরে পান করুন। দুধে থাকা ক্যালসিয়াম পাকস্থলীতে অতিরিক্ত অ্যাসিড তৈরিতে বাধা দেয়। তবে যাদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স রয়েছে তারা এটি এড়িয়ে চলুন। নয়তো হিতে-বিপরীত হতে পারে।

৫. আদা/আদা চা: খাবার খাওয়ার পর এক টুকরো কাঁচা আদা চিবিয়ে খেতে পারেন। অথবা ফোটানো পানিতে আদা কুচি দিয়ে চা বানিয়ে পান করতে পারেন। আদায় অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান রয়েছে, যা হজম প্রক্রিয়াকে সহজ করে এবং গ্যাসের চাপ কমায়।
৬. মৌরি বা মিষ্টি জিরা: ভারী খাবার খাওয়ার পর আধা চামচ কাঁচা মৌরি চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করুন। কেননা, মৌরিতে থাকা উদ্বায়ী তেল পাকস্থলীর পেশিকে শিথিল করে এবং মেটাবলিজম বাড়িয়ে গ্যাস ও পেট ফাঁপা দূর করে।
আরও পড়ুন: খালি পেটে জিরা ভেজানো পানি পান করলে কি হয়?
৭. জোয়ান: জনপ্রিয় ভেষজ এই মশলায় ‘থাইমল’ গ্যাস্ট্রিক জুস নিঃসরণ বাড়ায় এবং বদহজম ও পেটের মোচড়ানোর মতো ব্যথা দ্রুত কমায়। আধা চামচ জোয়ানের সঙ্গে সামান্য পরিমাণ লবণ মিশিয়ে চিবিয়ে নিন। এরপর কুসুম গরম পানির সঙ্গে এটি গিলে ফেলুন।
৮. অ্যাপেল সিডার ভিনেগার: বদহজম ও গ্যাসের সমস্যা মূলত পাকস্থলীতে প্রয়োজনীয় অ্যাসিডের অভাবে হয়। এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে এক চামচ খাঁটি অ্যাপেল সিডার ভিনেগার মিশি নিন। সকালের খাবারের আগে এটি পান করুন। এই পানীয় পাকস্থলীর পিএইচ ভারসাম্য ঠিক রাখে।
৯. পুদিনা পাতা/পুদিনা পাতার চা: কয়েকটি পুদিনা পাতা সরাসরি চিবিয়ে খেতে পারেন। অথবা গরম পানিতে কয়েকটি পুদিনা পাতা কয়েক মিনিট ফুটিয়ে নিয়ে চা বানিয়ে পান করতে পারেন। এটি পরিপাকতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও গ্যাসের অস্বস্তি কমায়। পেটকে রাখে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা।
আরও পড়ুন: গ্রিন টি ও মাচা টি একই জিনিস?
১০. ডাবের পানি: প্রাকৃতিকভাবে ক্ষারীয় ডাবের পানি পাকস্থলীর অতিরিক্ত অ্যাসিডকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। শরীরকে রাখে হাইড্রেটেড। তাই প্রতিদিন সকালে খালি পেটে ডাবের পানি পান করতে পারেন। অথবা গ্যাসের অস্বস্তি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি ডাবের পানি পান করুন। এতে আরাম পাবেন।
১১. টক দই বা প্রোবায়োটিক খাবার: হজমের সমস্যায় টক দই বা প্রোবায়োটিক খাবার খুবই কার্যকরী। এতে থাকা ল্যাকটোব্যাসিলাস পেটের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে। ফলে পেটে গ্যাস তৈরি হওয়া স্থায়ীভাবে বন্ধ হয় এবং হজম ক্ষমতা বাড়ে। দুপুরের খাবারের পর ২ থেকে ৩ চামচ ঘরোয়া টক দই খাওয়ার অভ্যাস করুন।
১২. পর্যাপ্ত পানি ও সঠিক নিয়মে খাওয়া: অনেকেরই পানি পানে অনীহা রয়েছে বা খুবই কম পানি পান করেন। একইসঙ্গে খাবারও খান বেশ তাড়াহুড়ো করে। এতে পেটে খাবারের সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত বাতাস ঢুকে পড়ে। ফলসরূপ পাকস্থলীতে গ্যাস তৈরি হয়। তাই এই অভ্যাসগুলো ছাড়তে হবে।
প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে এবং খাবার সবসময় সময় নিয়ে ভালোমতো চিবিয়ে খেতে হবে। একবারে পেট ভরে অতিরিক্ত না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খান এবং খাবার খাওয়ার পর পরই শুয়ে পড়বেন না।
এএ




