আজকাল যেকোনো ডেন্টাল ক্লিনিকে গেলেই আপনি ক্রমবর্ধমান সংখ্যক রোগীকে দাঁতের সংবেদনশীলতা, এনামেল ক্ষয় বা দাঁতের কিনারা ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যা নিয়ে অভিযোগ করতে দেখবেন। যে সমস্যাগুলোকে একসময় বার্ধক্য বা অবহেলার ফল বলে মনে করা হতো।
তবে দন্তচিকিৎসকরা একটি ভিন্ন প্রবণতা লক্ষ্য করছেন। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, প্রায় ২৭% দন্ত রোগীর দাঁতের এনামেল ক্ষয়ের লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে এবং এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ক্ষতির বেশিরভাগই রোগীর অভ্যাসগত কারণে হচ্ছে- যত্নের অভাবে নয়। বরং আপাতদৃষ্টিতে যেগুলো ক্ষতিকর নয়, এমনকি আমাদের দায়িত্ব মনে হওয়া দৈনন্দিন অভ্যাসগুলোর নীরব পুনরাবৃত্তির ফলে।
এতে অবাক হবার কিছুই নেই, মূলত দৈনন্দিন জীবনের সাথে জড়িয়ে থাকা চিরাচরিত অভ্যাসগুলোই এনামেলের সুরক্ষা-আবরণ ধীরে ধীরে দূর্বল করে দেয়।
আমাদের দাঁত ব্রাশের নিয়ম থেকে শুরু করে খাবার গ্রহণের পদ্ধতি, এই ছোটো ছোটো ধারাবাহিক কাজগুলোর মাঝেই দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব থাকতে পারে। চলুন এরকম কয়েকটি কারণ জেনে নেওয়া যাক।
ভুলভাবে দাঁত ব্রাশ করা
অনেকের দিন শুরু হয় জোরালোভাবে দাঁত ব্রাশ করার মাধ্যমে, যা আমাদের কাছে যত্নের মতোই মনে হয়। কিন্তু জোরে ব্রাশ করলে দাঁত বেশি পরিষ্কার হয়- এই ধারণাটি একেবারেই ভুল। অতিরিক্ত জোরে ব্রাশ করলে, বিশেষ করে শক্ত ব্রাশ দিয়ে, এনামেল ক্ষয় হয়ে যেতে পারে। এনামেল হলো দাঁতের একটি পাতলা কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তর, যা দাঁতকে ক্ষয় ও সংবেদনশীলতা থেকে রক্ষা করে।
পরিচ্ছন্নতার প্রতি যে প্রবল আগ্রহ সময়ের সাথে সাথে তা অপরিবর্তিত ক্ষয়ে রূপ নেয়। ক্ষয় দৃশ্যমান হওয়ার অনেক আগে থেকেই এনামেল দুর্বল হতে থাকে।
অ্যাসিড, চিনি এবং আধুনিক খাদ্যাভ্যাস
আধুনিক উচ্চমানের খাদ্যাভ্যাস অ্যাসিড ও চিনিযুক্ত খাবার ও পানীয়ের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্রিজি ড্রিঙ্কস, এনার্জি ড্রিঙ্কস, লেবুজাতীয় ফলের রস, চা, কফি এবং নানা ধরনের মিষ্টি। আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলেও প্রতিটি চুমুক বা কামড় দাঁতকে এমন অ্যাসিডের সংস্পর্শে আনে যা ধীরে ধীরে এনামেল ক্ষয় করে দেয়।

যারা নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করেন, তারাও এই ধরনের খাবারের ক্ষতিকর সংস্পর্শের প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেন না। অ্যাসিডযুক্ত পানীয় পানের পর পানি দিয়ে মুখ ধোয়া বা স্ট্র ব্যবহার করার মতো সাধারণ অভ্যাসগুলো এর অ্যাসিড থেকে এনামেলের শক্তি রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে।
পর্যাপ্ত পানিপানের অভাব
লালা হলো মুখের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা অ্যাসিডকে প্রশমিত করে এবং এনামেলকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহ করে। কিন্তু, ক্যাফেইন-নির্ভর ও দ্রুতগতির জীবনযাত্রায় পানিশূন্যতা এই সুরক্ষাকে দুর্বল করে দেয়। অপর্যাপ্ত পানিপান এবং ঘন ঘন কফি বা অ্যালকোহল সেবনের ফলে লালার প্রবাহ কমে যায় এবং এনামেল অরক্ষিত হয়ে পড়ে।

সারাদিন শরীরে পানির পরিমাণ ঠিক রাখার মতো একটি সাধারণ বিষয়ও দাঁত সুরক্ষিত রাখার অন্যতম কার্যকর উপায়, অথচ প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়।
দাঁত উজ্জ্বল করার ক্ষতি
হাসি আকর্ষণীয় দেখানোর প্রয়াসে সোশ্যাল মিডিয়া লেবুর রস ও বেকিং সোডা থেকে শুরু করে অ্যাক্টিভেটেড চারকোল পর্যন্ত এমন সব ঘরোয়া টোটকা জনপ্রিয় করেছে যা তাৎক্ষণিকভাবে দাঁত উজ্জল করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
যদিও এগুলো সাময়িকভাবে দাঁতকে উজ্জ্বল করে, কিন্তু এসব টোটকার অম্লীয় প্রকৃতি এনামেলের ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করে। পরিহাসের বিষয় হলো, সৌন্দর্য বাড়ানোর প্রচেষ্টাই দাঁতকে আরও হলুদ ও সংবেদনশীল করে তোলে। এর চেয়ে নিরাপদ উপায় হলো দন্তচিকিৎসকের অনুমোদিত হোয়াইটেনিং ট্রিটমেন্ট অথবা মৃদু, ফ্লোরাইড-ভিত্তিক টুথপেস্ট ব্যবহার করা, যা দাঁতকে মসৃণ করার পাশাপাশি সুরক্ষাও দেয়।

যখন দৈন্দিন ব্যবহৃত টুথপেস্ট যথেষ্ট নয়
আমরা অনেকেই মনে করে থাকি দাঁত সুরক্ষিত রাখার জন্য ক্যাভিটি থেকে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া যেকোনো টুথপেস্টই যথেষ্ট। কিন্তু সাধারণ টুথপেস্টের ফর্মুলেশনগুলো প্রায়শই দাঁতের এনামেলকে রক্ষা করার পরিবর্তে দাঁত সাদা করার জন্যই কাজ করে থাকে। সময়ের সাথে সাথে, অ্যাসিডিক খাবার ও পানীয়ের সংস্পর্শে এসে এই স্তরটি নরম হয়ে যেতে পারে, ফলে দাঁত আরও বেশি সংবেদনশীল ও ক্ষয়প্রবণ হয়ে পড়ে। এখানেই এনামেল সুরক্ষার জন্য বিশেষভাবে তৈরি টুথপেস্ট বেছে নেওয়াটা আসল পার্থক্য চোখে পড়ে। এই ধরনের ফর্মুলেশনগুলো এনামেলকে শক্তিশালী করার জন্য তৈরি করা হয়, যা প্রতিদিনের অ্যাসিডের আক্রমণের বিরুদ্ধে এর স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ফিরিয়ে আনে।
আরও পড়ুন: দাঁতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর যেসব খাবার
এনামেলের ক্ষয় প্রায়শই নিরবে হয়। এর কোনো সতর্কবার্তা আকস্মিক কোনো লক্ষণ থাকে না। শুরু হয় ছোট ছোট, দৈনন্দিন অভ্যাস থেকে, যেমন একটু বেশি জোরে ব্রাশ করা, অতিরিক্ত এক কাপ কফি পান করা, অথবা এমন সাধারণ টুথপেস্ট ব্যবহার করা যা কেবল পরিষ্কার করে কিন্তু দাঁতের সুরক্ষা নিশ্চিত না। সময়ের সাথে সাথে, এই অভ্যাসগুলো এনামেলের শক্তি ক্ষয় করে দেয়, ফলে দাঁত সংবেদনশীলতা, বিবর্ণতা এবং ক্ষয়ের ঝুঁকিতে পড়ে। মনে রাখা জরুরি যে, এনামেল একবার ক্ষয় হয়ে গেলে তা আর পুনরায় তৈরি হয় না।
এজেড




