পবিত্র ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহার উৎসবে হরেক পদের মিষ্টি আর মুখরোচক মাংসের আয়োজন এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। তবে এই কয়েক দিনের অনিয়মিত খাওয়া-দাওয়ার প্রভাব এখন অনেকের শরীরে স্পষ্ট। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার বা সুগারের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেখা দিচ্ছে নানা শারীরিক জটিলতা।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় ডায়াবেটিস আক্রান্তের হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় (পাকিস্তানের পরেই)। বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ এই রোগে ভুগছেন, যা সংখ্যার দিক থেকে এই অঞ্চলে তৃতীয় সর্বোচ্চ। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, বাংলাদেশে অধিকাংশ ডায়াবেটিস রোগীই টাইপ-২ ক্যাটাগরির, যা মূলত জীবনযাত্রা পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ করা সম্ভব। ঈদ-পরবর্তী এই সময়ে সুগার নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে ১০টি জরুরি গাইডলাইন নিচে তুলে ধরা হলো-
বিজ্ঞাপন
১. খাবারের পরিমাণ ও সময়জ্ঞান
প্রতি বেলার খাবার সময়মতো খাওয়ার অভ্যাস পুনরায় শুরু করুন। কী খাচ্ছেন তার চেয়েও জরুরি কতটা খাচ্ছেন। অনেক সময় ভাতের বদলে রুটি খেতে বলা হয়, কিন্তু রুটির আকার বা পরিমাণ বেশি হলে রক্তে শর্করা বেড়ে যেতে পারে। তাই খাবারের পরিমাণের দিকে কড়া নজর দিন।
আরও পড়ুন: কিডনি ভালো রাখতে কী খাবেন, কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন?
২. আলু উচ্চ শর্করাযুক্ত সবজি
অনেকেই আলুকে সাধারণ সবজি মনে করে প্রচুর পরিমাণে খান। কিন্তু আলু একটি উচ্চ শর্করাযুক্ত (স্টার্চি) সবজি। তাই এটি ভাত বা রুটির বিকল্প হিসেবে সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। অর্থাৎ পাতে আলু থাকলে ভাত বা রুটির পরিমাণ সেই অনুপাতে কমিয়ে দিন।

৩. আঁশযুক্ত ও গোটা শস্যের প্রাধান্য
সাদা চাল বা ময়দার তৈরি খাবারের বদলে লাল আটার রুটি বা ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত খাওয়ার অভ্যাস করুন। আঁশযুক্ত ও গোটা শস্য রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এটি রক্তে সুগার শোষণের গতি ধীর করে দেয়।
৪. লবণ, চর্বি ও ফাস্ট ফুড বর্জন
ঈদে প্রচুর রেড মিট বা চর্বিযুক্ত মাংস খাওয়া হয়েছে। এখন অতিরিক্ত লবণ ও চর্বিজাতীয় খাবার পুরোপুরি পরিহার করুন। ফাস্ট ফুড ও কোমল পানীয়ের বদলে প্রতিদিন পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি পান করুন।
আরও পড়ুন: এক মাস ফাস্টফুড থেকে দূরে থাকলে শরীরে যা ঘটবে
৫. স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস নির্বাচন
অফিসের কাজে বা অবসরে হুটহাট ক্ষুধা লাগলে চিপস বা বিস্কুট না খেয়ে শসা বা কম ক্যালরিযুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিন। টিভি দেখতে দেখতে স্ন্যাকস খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন। শসা পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে এবং এটি রক্তে শর্করা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় না।

৬. একটানা বসে থাকার অভ্যাস ত্যাগ
অফিস বা কর্মস্থলে একটানা দীর্ঘ সময় বসে কাজ করবেন না। কম্পিউটার ব্যবহার বা কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে উঠে দাঁড়ান, একটু পায়চারি করুন। অলসতা কাটাতে লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহারের চেষ্টা করুন।
৭. শারীরিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি
ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রম (যেমন দ্রুত হাঁটা) নিশ্চিত করুন। এটি ক্যালরি পোড়াতে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন: শরীর চর্চার আগে ও পরে কী খাবেন?
৮. ধূমপান বর্জন ও ওজন নিয়ন্ত্রণ
ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ধূমপান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি হার্ট ও কিডনির জটিলতা বাড়িয়ে দেয়। তাই সুস্থ থাকতে ধূমপান বর্জন করুন এবং শরীরের ওজন লক্ষ্যমাত্রায় রাখার চেষ্টা করুন।

৯. নিয়মিত পরীক্ষা ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
রক্তের গ্লুকোজ, লিপিড প্রোফাইল ও রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করুন। ঈদ পরবর্তী জটিলতা এড়াতে প্রয়োজনে একজন এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট বা ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। বিশেষজ্ঞের দেওয়া উপদেশ ও ওষুধের সঠিক ডোজ মেনে চলুন।
১০. সামাজিক অনুষ্ঠানে সতর্কতা
বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে পরিবেশিত অস্বাস্থ্যকর ও অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাদ্য বর্জন করার মানসিকতা তৈরি করুন। মনে রাখবেন, ডায়াবেটিস চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করাই বাঞ্ছনীয়।
বিশেষজ্ঞের অভিমত
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, ‘ডায়াবেটিস বর্তমানে একটি নীরব মহামারি। তবে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এবং নিয়মিত এই টিপসগুলো মেনে চললে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তনই এর প্রধান সমাধান।’
উৎসবের আনন্দ শেষ হলেও স্বাস্থ্যের যত্ন যেন থেমে না থাকে। ঈদের অনিয়ম কাটিয়ে দ্রুত সুশৃঙ্খল জীবনে ফেরাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। আপনার সচেতনতাই পারে ডায়াবেটিসের মতো নীরব ঘাতককে নিয়ন্ত্রণে রেখে আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা উপহার দিতে।
তথ্যসূত্র
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) সর্বশেষ প্রতিবেদন
ডা. শাহজাদা সেলিম, সহযোগী অধ্যাপক, এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

