শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪, ঢাকা

আপনারা কি আমাদের মেরে ফেলবেন, বায়ু দূষণ প্রসঙ্গে হাইকোর্ট

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ৩১ জানুয়ারি ২০২৩, ০৫:২৬ পিএম

শেয়ার করুন:

আপনারা কি আমাদের মেরে ফেলবেন, বায়ু দূষণ প্রসঙ্গে হাইকোর্ট
ফাইল ছবি

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি শহরে বায়ু দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। গত প্রায় এক মাস ধরে রাজধানী ঢাকার বায়ু বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বায়ুর তালিকায় রয়েছে। এতে মেগা সিটি ঢাকা সারা বিশ্বে দূষিত শহরের তালিকার প্রথমে অবস্থান করছে। এই বায়ু দূষণ নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষ মাথা ঘামাচ্ছে না জানিয়ে উচ্চ আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পরিবেশ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে হাইকোর্ট প্রশ্ন রেখেছেন- আপনারা কি আমাদের মেরে মেলবেন?

মঙ্গলবার (৩১ জানুয়ারি) এ বিষয়ে শুনানি করে বিচারপতি কেএম কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মাদ আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই মন্তব্য করেন।


বিজ্ঞাপন


আরও পড়ুন: শীতে বাড়ছে বায়ু দূষণ: নাকমুখ চেপে পথ চলতে হয় নগরবাসীর

এদিন নির্দেশনা অনুসারে ঢাকার বায়ু দূষণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে আদালতে একটি লিখিত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

এ সময় আদালত বলেন, ‘আপনারা কি আমাদের মেরে ফেলবেন নাকি। নির্দেশনা বাস্তবায়নে বারবার আপনাদের ডাকতে হয়। আমরা নিজেরাই লজ্জা পাচ্ছি। পরিবেশ দূষণ রোধে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন তা আগামী ৫ জানুয়ারি রোববার জানান।’

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আপিল বিভাগের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনিই আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা মেইলকে বলেন, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন চেয়ে আমরা একটি আবেদন করেছিলাম। সেই আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত পরিবেশ অধিদফতর, সিটি করপোরেশনসহ সব পক্ষের কাছে জানতে চেয়েছেন। বায়ু দূষণরোধে আপনারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। বারবার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। আপনারা কি আমাদের সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চান। পরে বায়ু দূষণরোধে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন তা আগামী রোববারের মধ্যে জানাতে নির্দেশ দেন।


বিজ্ঞাপন


TT2

এ সময় পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষে আইনজীবী আমাতুল করিম, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষে সাঈদ আহমেদ রাজা উপস্থিত ছিলেন।

ঢাকার বায়ু দূষণ রোধে উচ্চ আদালতের যে নয় দফা নির্দেশনা রয়েছে বাস্তবায়নের নির্দেশনা চেয়ে গতকাল হাইকোর্টে আবেদন করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

আরও পড়ুন: বায়ু দূষণ রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি, ৯ প্রস্তাব

এই আইনজীবী বলেন, আপনারা জানেন, কয়েক দিন ধরে রিপোর্ট হচ্ছে- বিশ্বের সর্বোচ্চ বায়ু দূষণকারী শহর হচ্ছে ঢাকা। বায়ু দূষণে ঢাকার এই অবস্থান ধারাবাহিক হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। এটি যদি অব্যাহত থাকে তাহলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। যেটা দিল্লিতেও করা হয়েছিল। কিন্তু আমাদের এখানে কারো কোনো খবর নেই। এখন পর্যন্ত ঢাকা শহর বায়ু দূষণে এক নম্বরে আছে, অথচ কেউ কোনো পাত্তা দিচ্ছেন না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত এ বিষয়ে বলে যাচ্ছেন।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ার সবশেষ সোমবার (৩০ জানুয়ারি) দূষিত শহরের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে প্রথম স্থানে রয়েছে ঢাকা। এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) স্কোর ২৬৩। এর পরের অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর, যার স্কোর ১৯০।

একিউআই সূচক অনুসারে, বায়ুদূষণের মাত্রা ০ থেকে ৫০ পিএম২.৫ হলে সেটি ভালো, ৫১ থেকে ১০০ হলে তা সহনীয়, ১০১ থেকে ১৫০ বিশেষ শ্রেণির জন্য অস্বাস্থ্যকর, ১৫১ থেকে ২০০ হলে সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর, ২০১ থেকে ৩০০ খুবই অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০০-এর বেশি হলে তা মানবস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়।

ঢাকার বাতাসে দূষণে মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণহীন ধুলা, যানবাহনের ধোঁয়া ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির অবাধ চলাচল, মোটরসাইকেলসহ ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যার মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি, ইটভাটার ধোঁয়া, সড়কের নিয়ন্ত্রণহীন খোঁড়াখুঁড়ি, অবকাঠামো ও মেগা প্রজেক্টের নির্মাণযজ্ঞ, শিল্পকারখানার ধোঁয়া ও বর্জ্য, কঠিন বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য পোড়ানো প্রভৃতি। এছাড়া ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার জলাভূমি ভরাট এবং সবুজ এলাকা ও সবুজায়ন কমে যাওয়া, নিয়ন্ত্রণহীন অবকাঠামো ও ভবন নির্মাণ, নগর ও পরিবেশের ভারবহন ক্ষমতার মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা, অবকাঠামো ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, পার্ক-উদ্যান-খেলার মাঠে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে দিয়ে কংক্রিটনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ, যানবাহনের নিয়ন্ত্রণহীন গতি প্রভৃতি কারণে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণহীন মাত্রায় চলে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।

TT3

এর আগে বায়ু দূষণরোধে নয় দফা নির্দেশনা দিয়ে ২০২০ সালে রায় দেন উচ্চ আদালত। সেই নয় দফা নির্দেশনায় ছিল-

১. ঢাকা শহরের মধ্যে বালি বা মাটি বহনকারী ট্রাকগুলোকে ঢেকে পরিবহন করতে হবে।

২.যে সব জায়গায় নির্মাণকাজ চলছে সেসব জায়গার কনট্রাকটররা তা ঢেকে রাখবে।

আরও পড়ুন: বায়ু দূষণে প্রতি বছর ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু

৩. এছাড়া ঢাকার সড়কগুলোতে পানি ছিটানোর যে নির্দেশ ছিল, সে নির্দেশ অনুযায়ী যেসব জায়গায় এখনো পানি ছিটানো হচ্ছে না, সেসব এলাকায় পানি ছিটানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. সড়কের মেগা প্রজেক্টের নির্মাণ কাজ এবং কার্পেটিং যেসব কাজ চলছে, যেসব কাজ যেন আইন কানুন এবং চুক্তির টার্মস এন্ড কন্ডিশন মেনে করা হয় সেটা নিশ্চিত করার নির্দেশ।

৫. গাড়ির কলো ধোঁয়া ছাড়ে সেগুলো জব্দ করতে বলা হয়েছে।

৬. সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির ইকোনোমিক লাইফ নির্ধারণ করতে হবে এবং যেসব গাড়ি পুরাতন হয়ে গেছে সেগুলো চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্দেশ।

৭. যেসব উটভাটা লাইসেন্সবিহীনভাবে চলছে, সেগুলোর মধ্যে যেগুলো এখনো বন্ধ করা হয়নি, সেগুলো বন্ধ করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ।

৮. পরিবেশ অধিদফতরের অনুমতি ছাড়া টায়ার পোড়ানো এবং ব্যাটারি রিসাইকিলিং বন্ধের নির্দেশ।

৯. মার্কেট এবং দোকানের বর্জ্য প্যাকেট করে রাখতে এবং তা মার্কেট ও দোকান বন্ধের পরে সিটি করপোরেশনকে ওই বর্জ্য অপসারণের নির্দেশ।

এআইএম/জেবি

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর