মামলার দীর্ঘ জট, বিচারপতির সংকট আর ধীরগতির বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যে বছরের প্রায় অর্ধেক দিন নিয়মিত বিচারকাজ বন্ধ থাকছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে। ২০২৬ সালের বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, সাপ্তাহিক ছুটি, সরকারি ছুটি ও অবকাশ মিলিয়ে এ বছর আদালতে নিয়মিত বিচারকাজ বন্ধ থাকবে ১৮২ দিন। এত দীর্ঘ ছুটিতে বিচারপ্রক্রিয়ার গতি কতটা ব্যাহত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল। অন্যদিকে, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, বিচারকদের রায় লেখা ও অনিষ্পন্ন কাজের চাপ সামলাতে এই অবকাশের প্রয়োজন রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের ২০২৬ সালের বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, এ বছর সর্বোচ্চ আদালতে মোট অবকাশকালীন ছুটি রয়েছে ৬৩ দিন (সাপ্তাহিক ও সাধারণ ছুটি ব্যতীত)। এর সঙ্গে ১০৪ দিনের সাপ্তাহিক ছুটি (শুক্রবার ও শনিবার) এবং বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত ১৫ কার্যদিবসের সাধারণ ছুটি যোগ হয়ে সব মিলিয়ে নিয়মিত বিচারকাজ বন্ধের দিন দাঁড়িয়েছে ১৮২ দিন।
বিধি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (আপিল বিভাগ) রুলস, ১৯৮৮-এর অর্ডার-২, রুল-৩ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট বিভাগ) রুলস, ১৯৭৩-এর তৃতীয় অধ্যায়ের রুল-২ মোতাবেক এই অবকাশকালীন ছুটি নির্ধারিত হয়। প্রতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত বর্ষপঞ্জিতে নীল রঙে অবকাশ, লাল রঙে সাপ্তাহিক ছুটি এবং লাল তারকা চিহ্নে সরকারি ছুটি নির্দেশ করা থাকে।
বর্ষপঞ্জি বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুলাই ও নভেম্বর ছাড়া বছরের বাকি ১০ মাসেই অবকাশকালীন ছুটি রয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও আগস্ট মাসে ১ দিন করে; মার্চে ৮ দিন, এপ্রিলে ১১ দিন, মে মাসে ২ দিন, জুনে ৪ দিন এবং ডিসেম্বরে ১০ দিনের অবকাশ রয়েছে। তবে সবচেয়ে দীর্ঘ অবকাশ সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসজুড়ে। এই অবকাশ ১৬ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে চলবে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত (মোট ২৫ দিন)।
এর পরের দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় আগামী ২৫ অক্টোবর থেকে পুরোদমে আদালতের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হবে। সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটি মিলিয়ে মোট ৪১ দিন পর নিয়মিত বিচারকাজে ফিরছে সর্বোচ্চ আদালত।
একই বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী, দেওয়ানি আদালতগুলো ২০২৬ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া উল্লিখিত ছুটির বাইরে সরকার অন্য কোনো দিন ছুটি ঘোষণা করলে এবং সুপ্রিম কোর্ট তা অনুমোদন করলে ওই দিনগুলোতেও আদালত বন্ধ থাকবে।
পূজার ছুটি ও ১৭ অক্টোবর অফিস খোলা
এদিকে, আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম ২০ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। সোমবার (১২ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসন শাখা থেকে জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-৬ শাখা থেকে গত ৭ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনে দুর্গাপূজা উপলক্ষে সব প্রতিষ্ঠানে ২০ থেকে ২২ অক্টোবর ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। ছুটির সমন্বয়ে ১৭ অক্টোবর শনিবার অফিস খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে আদালতের বিষয়ে সিদ্ধান্তের ভার সুপ্রিম কোর্টের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।
ওই প্রজ্ঞাপনের আলোকে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে, ২০ থেকে ২২ অক্টোবর কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ছুটির সমন্বয় করতে আগামী ১৭ অক্টোবর শনিবার আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের দাপ্তরিক কার্যক্রম স্বাভাবিক নিয়মে চালু থাকবে।
অবকাশে জরুরি বিচারিক কার্যক্রম
অবকাশকালীন সময়ে নিয়মিত আদালত বন্ধ থাকলেও জরুরি মামলার শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতির নির্দেশনায় ভ্যাকেশন বেঞ্চ ও চেম্বার আদালত পরিচালিত হয়।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের নিয়মিত কার্যতালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেদিন মোট ৬৩টি বেঞ্চ এবং আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চ সক্রিয় ছিল। এরপর ১৫ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী অবকাশকালীন বিচারকাজ পরিচালনার জন্য হাইকোর্ট বিভাগে ১৩টি বেঞ্চ গঠন করেন। এর মধ্যে ৯টি দ্বৈত ও ৪টি একক বেঞ্চ ছিল। এসব বেঞ্চে দায়িত্ব পালন করেন ২০ জন বিচারপতি।
তবে সোমবার (১২ অক্টোবর) হাইকোর্ট বিভাগে এ ধরনের ১৩টি বেঞ্চে ২২ জন বিচারপতি বিচারকাজ পরিচালনা করেছেন। এর আগের দিন রোববার ৬টি বেঞ্চে ৮ জন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করেন।
অন্যদিকে, আপিল বিভাগের জরুরি বিষয়াদি নিষ্পত্তির জন্য গত ২৯ সেপ্টেম্বর জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রধান বিচারপতি ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত অবকাশে চেম্বার আদালতের দায়িত্ব বণ্টন করেছেন। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৬ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এবং ১৭ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর বিচারপতি এস, এম, এমদাদুল হক ভ্যাকেশন জজের দায়িত্ব পালন করেন।
আর ১ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত মনোনীত হয়েছেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক। তিনি ১, ৪, ৫, ৬, ৭, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৮ ও ১৯ অক্টোবর সকাল ১১টায় চেম্বার কোর্ট-১-এ সশরীর উপস্থিত থেকে জরুরি বিষয়ের শুনানি গ্রহণ করছেন।
ছুটি নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের আপত্তি
সুপ্রিম কোর্টের এই দীর্ঘ ছুটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, সুপ্রিম কোর্টের ক্যালেন্ডার দেখলে মনে হবে, ৩৬৫ দিনের প্রায় অর্ধেকই ছুটি। সরকারি ছুটির পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব ছুটিও রয়েছে। তিনি যখন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ছিলেন, তখন এই ছুটি কমিয়ে আনার পক্ষে যারা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে তিনি অন্যতম।
তিনি বলেন, এই দীর্ঘ অবকাশের কারণে বিচারব্যবস্থায় শ্লথগতি আসছে এবং মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আমাদের অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়। লম্বা অবকাশের মধ্যে অনেক বিচারক তাঁদের অসম্পূর্ণ রায় লিখবেন—এই প্রত্যাশার জায়গাটিও পূরণ হচ্ছে না। অনেকে আছেন, যাঁরা এক মাসের মধ্যে একটি রায়ও লেখেন না। তাহলে তাঁরা অবকাশে কী করবেন? এটা কাজের সদিচ্ছার বিষয়।
ছুটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমার মনে হচ্ছে, সময় এসেছে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার। আমি মনে করি, এই দীর্ঘ ছুটি বিচারব্যবস্থার গতি আনার ক্ষেত্রে এবং মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। আমি প্রত্যাশা করব, প্রধান বিচারপতি এটি পুনর্বিবেচনা করবেন। কারণ, রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত ছুটির বাইরে সুপ্রিম কোর্টের এই অতিরিক্ত ছুটি নিজস্ব হিসেবে চলে আসে। অনিষ্পন্ন মামলা নিষ্পত্তির স্বার্থে ছুটি কমিয়ে বিচারকদের আরও কাজে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তবে এ কথা সব বিচারকের জন্য প্রযোজ্য নয়।
অন্যদিকে, দীর্ঘ অবকাশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোর্শেদ বলেন, ভ্যাকেশনের সময় আদালত পুরোপুরি অবরুদ্ধ বা বন্ধ হয়ে যায় না। ভ্যাকেশনের মধ্যেও অনেক কোর্ট চালু থাকে, কাজ চলতে থাকে। বিচারকদের যে অনিষ্পন্ন কাজ থাকে, সেগুলো তাঁরা এই সময়ে সারতে পারেন। আপনি যদি এই দীর্ঘ অবকাশ বাদ দিয়ে দেন, তবে পুরো বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়ে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি তৈরি হবে।
ছুটি কমানোর প্রস্তাব যৌক্তিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ মনে করেন, আদালতের কাজ শেষ করে বিচারকেরা ঘোরাঘুরি করেন। কিন্তু অন্য সরকারি কর্মচারীদের মতো তাঁরা ঘুরে বেড়াতে পারেন না। বিচারকদের চেম্বারে গেলে বোঝা যাবে, তাঁদের কাজের চাপ কতটা; রাতেও তাঁদের কাজ করতে হয়।
বিচার বিভাগে দীর্ঘ অবকাশের একটি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রয়েছে জানিয়ে এই আইনজীবী বলেন, তবে ছুটির ধরনও বদলেছে। আগে ছুটি ছয় সপ্তাহ ছিল, তা কমিয়ে এখন পাঁচ সপ্তাহ করা হয়েছে। প্রতি বছর ফুল কোর্ট মিটিংয়ে বিচারকেরা বসে ঠিক করেন, ছুটি কবে থাকবে। বিচারকদের কাজের সুবিধার জন্যই ছুটিগুলো বহাল রাখা হয়েছে। তবে আমি মনে করি, ভ্যাকেশন কোর্টে বেঞ্চের সংখ্যা আরও বাড়ানো যায়। এখন যেখানে ১০টি কোর্ট দেওয়া হচ্ছে, সেখানে ১৫টি বেঞ্চ করে দেওয়া হলে আরও বেশি মামলার নিষ্পত্তি সম্ভব হবে।
আরএনবি/এআর




