বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

আবরার হত্যা: আপিল শুনানি না হওয়ায় হতাশ পরিবার, রাষ্ট্রপক্ষের আশ্বাস

রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি
প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৯ এএম

শেয়ার করুন:

আবরার হত্যা: আপিল শুনানি না হওয়ায় হতাশ পরিবার, রাষ্ট্রপক্ষের আশ্বাস
ছবি: এআই

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রিনক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ৭ বছর পেরিয়ে গেলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এখনও মামলাটির শুনানি শুরু হয়নি। 

নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে আসামিদের সাজা বহাল থাকলেও আপিল শুনানি ঝুলে থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছে আবরারের পরিবার। 

তবে রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, আপিল বিভাগে শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা এক সেকেন্ডও বিলম্ব করবে না। 

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি, সিরিয়াল অনুযায়ী মামলা কার্যতালিকায় এলে শুনানি হবে এবং তাদের কেউ কেউ নির্দোষ প্রমাণিত। 

মামলার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে আবরারের ভাই ও বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাইয়াজ। তার দাবি মামলাটি অন্ততপক্ষে কার্যতালিকায় এগিয়ে এনে তাড়াতাড়ি আপিল শুনানিটা শেষ করা হোক এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক। কিন্তু বর্তমান সরকারেরও প্রায় পাঁচ মাস পার হয়ে গেল, আপিল বিভাগে কী চলছে না চলছে সেটাও জানেন না বলে জানান তিনি।

আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পদক্ষেপ না নিলেও সংশ্লিষ্টদের কাছে কনসার্ন জানিয়েছেন উল্লেখ করে ফাইয়াজ ঢাকা মেইলকে বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের সাথেও কথা বলা হয়েছে। অন্যান্য মামলায় আসামিরা ফাঁকফোকর দিয়ে বাইরে থাকে, কিন্তু আমাদের এখানে আসামিরা সবাই জেলেই আছে। তারপরও কেন বিচারটা শুরু করে না, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

পূর্বের অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির সরকারের  প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তারা তো এই শহীদদের রক্তের ওপর ভর করেই ক্ষমতায় এসেছে। তাদের প্রথম দায়িত্ব ছিল এই শহীদদের বিচারগুলো নিশ্চিত করা। কিন্তু তারা এখনও পর্যন্ত সেটা পারছে না।

এক সেকেন্ডও বিলম্ব করবে না রাষ্ট্রপক্ষ

অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল আবরার হত্যাকাণ্ডকে ‘বিগত ফ্যাসিবাদের চরম একটি উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার ভাষ্য, বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজা হাইকোর্ট বহাল রাখায় রাষ্ট্রপক্ষের আপিল করার প্রয়োজন হয়নি। এখন সংক্ষুব্ধ আসামিরাই আপিল দায়ের করবে এবং দ্রুত শুনানির দায়িত্ব প্রাথমিকভাবে তাদেরই।

রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থানের কথা জানিয়ে রুহুল কুদ্দুস কাজল ঢাকা মেইলেকে বলেন, আমাদের অবস্থান হচ্ছে, আমরা কোনো মামলায় বিলম্ব ঘটাতে চাই না। আপিল বিভাগে যখনই শুনানি হোক, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো মুলতবি প্রার্থনা করা হবে না, এক সেকেন্ডও বিলম্ব ঘটানো হবে না। আপিল দায়ের হওয়া মাত্রই ডেডিকেটেড ল অফিসারদের অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে দিব, আমি নিজেও থাকব, যাতে পূর্ণ প্রস্তুতি রাখতে পারি।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, হাজারটা অপরাধীর সাজা হোক, কিন্তু একজন নিরপরাধ ব্যক্তিও যেন অবিচারের শিকার না হয়, সেটি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যেহেতু এটি মৃত্যুদণ্ডের মামলা, তাই সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এটি সরাসরি আপিল হিসেবে দায়ের হবে এবং রাষ্ট্রপক্ষ কনসাইজ স্টেটমেন্ট দিয়ে জোরালোভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।

এ মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ইশতিয়াক আহমেদ মুন্নার এই আইনজীবী বলেন, আমার ক্লায়েন্টের সাজা হয়েছে একেবারেই অন্যায়ভাবে। এভিডেন্সে আছে ঘটনার সময় সে ঘটনাস্থলেই ছিল না, সে হবিগঞ্জে বন্ধুর বিয়ে খাচ্ছিল। ভোরবেলায় সে এসে পৌঁছায়। আইও এবং অন্য সাক্ষীরাও এটা প্রমাণ করেছে। তারপরও তাকে খামোখা যাবজ্জীবন দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

আপিল বিভাগ ‘ঠান্ডা মাথায়’ রায় দিলে এই মামলায় তার মক্কেল শতভাগ খালাস পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।  মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির  আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু জানান, মামলার প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক তৈরি হয়েছে। 

তিনি ঢাকা মেইলেকে বলেন, মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন থাকলেও কার্যতালিকায় আসেনি। আপিল বিভাগের মামলা সন-তারিখের ভিত্তিতে শুনানি হয়। প্রধান বিচারপতি চাইলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনতে পারেন, তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য আসামিপক্ষের উদ্যোগ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

মামলার প্রেক্ষাপট ও বর্তমান অবস্থা

২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের শেরে বাংলা হলে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আবরার ফাহাদকে। এ ঘটনায় তার বাবা বরকত উল্লাহ ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় মামলা করেন। মাত্র ৩৭ দিনের মাথায় ১৩ নভেম্বর ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান ২০ আসামির সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টে পেপারবুক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শুনানি শুরু হয় এবং গত বছর ১৬ মার্চ রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। রায়ে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখা হয়। 

হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করে, বিচারিক আদালতের রায়ে হস্তক্ষেপ করার মত কোনো উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা ২০ আসামিই বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তারা হলেন- মেহেদী হাসান রাসেল, মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মেফতাহুল ইসলাম, মো. মাজেদুর রহমান, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল জেমি, মো. শামসুল আরেফিন, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ, মোর্শেদ-উজ-জামান মণ্ডল, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদ।

আর যে পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রয়েছে তারা হলেন মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা এবং ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না।

এর মধ্যে মোর্শেদ-উজ-জামান, এহতেশামুল রাব্বি ও মুজতবা রাফিদশুরু থেকেই পলাতক। 

আরেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি ২০২৪ সালের ৬ অগাস্ট গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে পালিয়ে গেলেও, গত ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন এবং আদালত তাকে পুনরায় কারাগারে পাঠায়।

বর্তমানে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ১৬ জন সরাসরি আপিল করেছেন এবং যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ৫ জন লিভ টু আপিল করেছেন।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আবরার ফাহাদকে মরণোত্তর দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ প্রদান করে।

‘হত্যাকাণ্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ’

হাইকোর্ট তার রায়ের পর্যবেক্ষণে আবরার হত্যাকাণ্ডকে ‘পূর্বপরিকল্পিত’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। রায়ে বলা হয়, এটি হঠাৎ ঘটেনি; ৫ অক্টোবর একটি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়।

আবরারকে ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে পিটিয়ে মারা হয়েছিল উল্লেখ করে আদালত বলেছে, নির্মম নির্যাতন করে কাউকে পিটিয়ে মারার ক্ষেত্রে এটি কোনো কারণ হতে পারে না। ভিন্নমত পোষণ কোনো অপরাধ হতে পারে না। রাজনৈতিক তকমা বা সন্দেহের অজুহাতে পরিকল্পিতভাবে পিটিয়ে হত্যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত আসামিদের কেউই আবরারকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। চিকিৎসকদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, তার শরীরের আঘাতগুলো ছিল প্রাণঘাতী।

আবরার অজ্ঞান ছিলেন এবং চিকিৎসা পেলে বেঁচে যেতেন—আসামিপক্ষের এমন দাবিকে মামলার প্রেক্ষাপটে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বলেছে আদালত।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও হলের ‘গেস্টরুম টর্চারের’ নৃশংস সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরিহার্য বলে আদালত মত দেয়। একইসঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে এ নৃশংসতা চললেও বিশ্ববিদ্যালয় ও হল প্রশাসনের এগিয়ে না আসাকে ‘সামগ্রিক ব্যর্থতা’ হিসেবে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরএনবি/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর