মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

অন্তত দুজন স্থানীয় সাক্ষী ছাড়া তল্লাশি ও জব্দ বেআইনি: হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৫ পিএম

শেয়ার করুন:

অন্তত দুজন স্থানীয় সাক্ষী ছাড়া তল্লাশি ও জব্দ বেআইনি: হাইকোর্ট
হাইকোর্ট। ফাইল ছবি

ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট এলাকার অন্তত দুজন স্থানীয় বাসিন্দার উপস্থিতি ছাড়া পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তল্লাশি ও কোনো বস্তু জব্দ করার প্রক্রিয়া বেআইনি বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত স্পষ্ট করেছেন, তল্লাশির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সাক্ষীদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। এই বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ না করে পরিচালিত যেকোনো তল্লাশি ও জব্দ আইনগতভাবে অবৈধ গণ্য হবে এবং তা ফৌজদারি বিচারে প্রমাণের ক্ষেত্রে বিবেচনার বাইরে থাকবে।

মাদক আইনের মামলায় দণ্ডিত রত্না খাতুন নামের এক নারীর সাজা বাতিল করে তাকে খালাস দিয়ে ‘রত্না খাতুন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় বিচারপতি মো. সেলিমের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

অধস্তন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি রিভিশন আবেদনের রুল যথাযথ ঘোষণা করে গত ১৭ জুলাই এ রায় দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি ১৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

আদালতে রত্না খাতুনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. ইলিয়াস আহমেদ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মন্জরুল আলম সুজন, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ আকতারুল ইসলাম ও তৌহিদুল ইসলাম।

মামলার পটভূমি

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানার কাছারিপাড়া গ্রামে রত্না খাতুনের বাড়িতে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. ফারুক সুলতানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে রত্না খাতুনকে আটক করা হয়। পরে এক নারী কনস্টেবলের মাধ্যমে তল্লাশি চালিয়ে তার কাছ থেকে কাগজে মোড়ানো ২৫ পুরিয়া (আনুমানিক ৩ গ্রাম) হেরোইন উদ্ধারের দাবি করা হয়।

এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার সারণি ১(ক) অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়। তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে মামলাটি বিচারের জন্য কুষ্টিয়ার দায়রা আদালতে পাঠানো হয়।

বিচার শেষে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার তৃতীয় যুগ্ম দায়রা জজ আদালত রত্না খাতুনকে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।

ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের সাজা বহাল রাখেন। এরপর বিচারিক আদালতের ওই দণ্ডাদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন রত্না খাতুন।

আদালতে আইনজীবীদের যুক্তি

শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. ইলিয়াস আহমেদ যুক্তি তুলে ধরে বলেন, আসামির কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের অভিযোগ নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ দিয়ে প্রমাণ করা যায়নি। মামলার বাদী নিজেই এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া জব্দতালিকার সাক্ষীরাও আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মাদক উদ্ধারের বিষয়টি সমর্থন করেননি। এসব বিষয় বিবেচনা না করেই নিম্ন আদালত সাজা দিয়েছেন এবং আপিল আদালতও তা যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে বহাল রেখেছেন।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ আখতারুল ইসলাম যুক্তি দেখান, বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন এবং আপিল আদালতও সেই সিদ্ধান্ত আইন অনুযায়ী বহাল রেখেছেন।

সাক্ষ্য পর্যালোচনায় যা পেলেন আদালত

নথি ও সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দেখতে পান, অভিযানের সময় উদ্ধারকাজে যুক্ত অধিদপ্তরের পরিদর্শক ফারুক সুলতান নিজেই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

কিন্তু তার জবানবন্দি ছাড়া প্রসিকিউশনের অন্য কোনো সাক্ষী মাদক উদ্ধারের বিষয়টি সমর্থন করতে পারেননি। এমনকি অধিদপ্তরের সদস্য হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়া কনস্টেবলও মাদক উদ্ধারের বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেননি।

পাশাপাশি জব্দতালিকার দুই সাক্ষীর বক্তব্য পর্যালোচনায় বড় ধরনের অসংগতি উঠে আসে।

সাক্ষীদের একজন জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দেখতে পান এবং তাদের কথামতো জব্দতালিকায় সই করেন। মাদক উদ্ধারের বিষয়ে তার কোনো প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছিল না।

অপর সাক্ষী জানান, তল্লাশির সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। ভেড়ামারা মোটর শ্রমিক কার্যালয়ে বসে থাকার সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তার স্বাক্ষর নিয়েছিলেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও রায়

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার ১ ও ২ উপধারা অনুযায়ী, পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তল্লাশি চালাতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট এলাকার অন্তত দুজন সম্মানিত স্থানীয় বাসিন্দার উপস্থিতিতে তা পরিচালনা করতে হবে। একইভাবে মামলার সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। তল্লাশির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি তাদের সামনেই সম্পন্ন হতে হবে।

আদালত আরও বলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই যদি তল্লাশি বা জব্দের কাজ শেষ করা হয়, কিংবা তারা চলে যাওয়ার পর তা করা হয়, তবে আইনের শর্ত পূরণ হয় না। এসব আইনি বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ না করে পরিচালিত যেকোনো তল্লাশি ও জব্দ বেআইনি হিসেবে গণ্য হবে এবং ফৌজদারি বিচারে প্রমাণ হিসেবে তা বিবেচনায় নেওয়া যাবে না।

সার্বিক পর্যালোচনায় হাইকোর্ট রুল মঞ্জুর করে কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিলের রায় বাতিল ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে রত্না খাতুনকে অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিয়ে নিম্ন আদালতের নথিপত্র অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আরএনবি/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর