বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

দেনমোহর না দিলে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে পারবেন আদালত: হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০২ পিএম

শেয়ার করুন:

দেনমোহর না দিলে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিতে পারবেন আদালত: হাইকোর্ট

স্বামীর আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও দেনমোহর পরিশোধ না করে স্ত্রীকে তা আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য করা হলে, পারিবারিক আদালত বিবেচনাধিকার প্রয়োগ করে স্ত্রীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

রায়ে বলা হয়েছে, মুসলিম পারিবারিক আইনে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া নিকাহনামায় ‘বিলম্বিত দেনমোহর’ চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং স্ত্রী দাবি করামাত্রই তা ‘তৎক্ষণাৎ প্রদেয় দেনমোহর’ হিসেবে গণ্য করতে হবে, যা অবিলম্বে পরিশোধযোগ্য।

দেনমোহর ও খোরপোষ সংক্রান্ত পারিবারিক আদালতের এক রায়ের বিরুদ্ধে স্বামীর করা দেওয়ানি রিভিশন আবেদন খারিজ করে বিচারপতি মো. আব্দুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়।

‘ইয়াকুব আলী বনাম সানজিদা নাসরিন’ মামলায় গত ৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এই রায় দেয়। 

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৩২ পৃষ্ঠার ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।

আদালতে স্বামীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. নাজের উদ্দিন। স্ত্রীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ইশরাত হাসান ও তানজিলা রহমান জুঁই; তাদের সঙ্গে ছিলেন ইফফাত হাসান শাম্মী।

মামলার পূর্বাপর

২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর শরিয়াহ মোতাবেক ২২ লাখ টাকা দেনমোহরে ইয়াকুব আলীর সঙ্গে তানজিদা নাসরিনের বিয়ে হয়। তাদের সংসারে এক কন্যাসন্তান রয়েছে।

যৌতুকের দাবি ও পারিবারিক মনোমালিন্যের জেরে ২০১৭ সালে তানজিদাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং পরে স্বামী তাকে তালাক দেন। 

তালাক কার্যকর হওয়ার পর ২০১৯ সালে বকেয়া দেনমোহর, ইদ্দতকালীন খোরপোষ ও সন্তানের খোরপোষ দাবি করে চট্টগ্রামের পারিবারিক আদালতে মামলা করেন স্ত্রী।

আরও পড়ুন:

২০২২ সালের ২৫ মে চট্টগ্রামের জ্যেষ্ঠ সহকারী জজ আদালত (পারিবারিক আদালত) স্ত্রীর পক্ষে রায় দেয়। রায়ে দেনমোহর বাবদ ১৮ লাখ টাকা, ইদ্দতকালীন খোরপোষ বাবদ ৩০ হাজার এবং কন্যাসন্তানের বকেয়া খোরপোষ বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকাসহ মোট ২০ লাখ ৪০ হাজার টাকা ৬০ দিনের মধ্যে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পাশাপাশি কন্যাসন্তানের বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে ৭ হাজার টাকা করে (বার্ষিক ১০ শতাংশ বৃদ্ধিসহ) খোরপোষের আদেশ দেওয়া হয়।

এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে স্বামী আপিল করলে চলতি বছরের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রামের পঞ্চম অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত তা খারিজ করে অধস্তন আদালতের রায় বহাল রাখে। এরপর স্বামী হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করেন।

আদালতে যুক্তিতর্ক

হাইকোর্টে শুনানিতে স্বামীর আইনজীবী যুক্তি দেন, তার মক্কেল ইতোমধ্যে ডিক্রিকৃত টাকার একটি বড় অংশ (৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা) পরিশোধ করেছেন। ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে অবশিষ্ট টাকা এককালীন পরিশোধের সামর্থ্য তাঁর নেই। তাই মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বকেয়া দেনমোহর ও খোরপোষ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চাওয়া হয়।

অন্যদিকে স্ত্রীর আইনজীবী ইশরাত হাসান রিভিশন আবেদনের বিরোধিতা করে বলেন, স্বামী সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী ও সন্তানের আইনি অধিকার বিলম্বিত করছেন। অধস্তন আদালতের রায় তথ্যপ্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে, ফলে এতে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ হাইকোর্টের নেই।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ

পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসা (আয়াত: ৪, ২০, ২১, ২৪, ২৫) ও সূরা আল-বাকারার (আয়াত: ২৩৬, ২৩৭) সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ এবং প্রচলিত মুসলিম আইন বিশ্লেষণ করে হাইকোর্ট রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেছে, দেনমোহরের কোনো অংশ মওকুফ বা মাফ করার কোনো এখতিয়ার আদালতের নেই। তবে স্ত্রী চাইলে স্বেচ্ছায় তাঁর দেনমোহরের পুরো বা কিছু অংশ মাফ করতে পারেন।

এ ধরনের মওকুফ বৈধ হতে হলে তা সচেতনভাবে, সুনির্দিষ্টভাবে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে করা হয়েছে মর্মে পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ থাকতে হবে। বলপ্রয়োগ, অনুচিত প্রভাব বা প্রবঞ্চনার মাধ্যমে পাওয়া তথাকথিত মওকুফকে বৈধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

আরও পড়ুন:

আদালত আরও বলে, বর্তমান মামলার দেনমোহর বর ও কনের আর্থিক সামর্থ্য বা সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী ধার্য করা হয়নি- এমন কথা বলে লিখিত চুক্তির শর্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই।

খোরপোষের বিষয়ে রায়ে বলা হয়, অধস্তন আদালতগুলো ইদ্দতকালীন খোরপোষ এবং নাবালিকা সন্তানের খোরপোষের বিষয়ে একমত হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন স্কুলগামী নাবালিকা সন্তানের অর্থনৈতিক মূল্যস্ফীতি, আবাসন এবং উৎসব পালনের বিষয়টি বিবেচনা করে ওই খোরপোষ দেওয়া প্রয়োজন।

সার্বিক বিবেচনায় অধস্তন আদালতের রায়ে কোনো আইনি ত্রুটি, অসম্পূর্ণতা বা এখতিয়ারগত ভুল পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে হাইকোর্ট স্বামীর রিভিশন আবেদনটি খারিজ করে দেয়। একইসঙ্গে অবিলম্বে রায়ের প্রতিলিপিসহ অধস্তন আদালতের নথি ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আরএনবি/এসআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর