মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ঢাকা

রাড্ডাকাণ্ডে বিএনপির বার্তা, অপরাধে জড়ালেই রাজনীতি শেষ

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫০ এএম

শেয়ার করুন:

রাড্ডাকাণ্ডে বিএনপির বার্তা, অপরাধে জড়ালেই রাজনীতি শেষ
কোলাজ: ঢাকা মেইল

• বহিষ্কারেও লাগাম টানা যাচ্ছে না নেতাকর্মীদের 
• দখল-চাঁদাবাজি ঠেকাতে কড়া বার্তা, প্রমাণ মিললেই ব্যবস্থা
• ছাড় পাচ্ছেন না সংসদ সদস্যও, কপাল পুড়ছে প্রভাবশালীদের
• রাড্ডা কাণ্ডের পর নড়েচড়ে বসেছে হাইকমান্ড

দল ও সরকারের নাম ভাঙিয়ে দখল, চাঁদাবাজি, হামলা-ভাঙচুর কিংবা আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি ঠেকাতে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও দলটির নীতিনির্ধারকেরা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই দলের হাইকমান্ড থেকে অন্যায়-অপকর্মে না জড়ানোর কড়া বার্তা দেওয়া হয়। 

কিন্তু এই বার্তা আমলে নেয়নি তৃণমূলের একাংশ। একের পর এক আলোচিত ঘটনায় নেতাকর্মীদের নাম আসায় সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার ও দল। তাই এবার দলের দুষ্কৃতকারীদের লাগাম টানতে সরাসরি ‘হার্ডলাইনে’ যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও দখলের ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগ করেছেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য। পাশাপাশি সাংগঠনিকভাবেও নেওয়া হয়েছে কঠোর ব্যবস্থা।

সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের সদস্য ও বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, যে কোনো মূল্যে তারা সরকার ও দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে চান। যে কারণে অপরাধে জড়ানোর প্রমাণ মিললেই পদ-পদবি বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে নেওয়া হচ্ছে কঠোর সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা। প্রয়োজনে দেশজুড়ে 'শুদ্ধি অভিযান' চালানোরও সিদ্ধান্ত রয়েছে হাইকমান্ডের।

বিএনপি নেতাদের মতে, অপরাধের সঙ্গে নাম উঠে আসায় সংসদ সদস্যকে পদত্যাগের নির্দেশনার মধ্য দিয়ে সারাদেশে অপকর্মে জড়ানো নেতাকর্মীদের প্রতি সতর্কবার্তা দিতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

মিরপুরের রাড্ডা মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তোপের মুখে পড়ে শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে গত ১ অক্টোবর পদত্যাগ করেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদ সচিবালয় তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করেছে। এর পরপরই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। পাশাপাশি একই দিনে দল ও সহযোগী সংগঠনের ১৪ জন নেতাকর্মীকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়।

এর আগেও বরিশাল, গাজীপুর, খুলনা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত অপকর্ম আমলে নিয়ে দল ও সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর থাকবে বলেও জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক প্রভাবশালী ভাইস চেয়ারম্যান ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘অন্যায়-অপকর্মে নাম আসবে আর দিব্যি ঘুরে বেড়াবে-সেই দিন এখন আর নেই। অপকর্মের প্রমাণ মিললে প্রথমে বহিষ্কার, পরে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যত বড়ই হোক, দল কোনো অপকর্মের দায় নেবে না। সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে শুরু করেছে এবং এটি অব্যাহত থাকবে।’

রাড্ডা কাণ্ডে ক্যারিয়ার শেষ মিষ্টির

ঘটনার সূত্রপাত গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে। মিরপুর-১ নম্বর এলাকার রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে দুই শতাধিক সশস্ত্র ব্যক্তি হামলা চালায়। অভিযোগ অনুযায়ী, দেশীয় অস্ত্র ও ভারী সরঞ্জাম নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঢুকে নিরাপত্তারক্ষীদের জিম্মি করা হয়। এরপর চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা ও নগদ টাকা লুটের পর একটি পাকা ও তিনটি আধা-পাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সেখানে একটি সমবায় সমিতির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দখলের চেষ্টা চালানো হয়।

এ ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মীর নাম মামলায় উঠে আসে, যাদের একটি অংশ সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। যদিও মিষ্টি এতে নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছিলেন, কিন্তু দলের ভাবমূর্তি রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে হাইকমান্ড।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সত্যতা ও তদন্ত পর্যালোচনার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে অবিলম্বে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। গত ১ অক্টোবর নির্দেশ পাওয়ার পরপরই সংসদ ভবনে গিয়ে স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র তুলে দেন তিনি। পরে জাতীয় সংসদ সচিবালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আসনটি শূন্য ঘোষণা করে।

উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৩ থেকে এমপি নির্বাচিত হন মিষ্টি। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। তিনি বিএনপির প্রয়াত নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন এবং মিরপুরের সাবেক কাউন্সিলর প্রয়াত সাইদুর রহমান নিউটনের স্ত্রী।

রাড্ডায় কপাল পুড়েছে প্রভাবশালীদের, বহিষ্কার ১৪

রাড্ডা কাণ্ডের জের ধরে রাজধানীর দলীয় সংগঠনে বড় ধাক্কা আসে বিএনপিতে। ঘটনার পরপরই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপির ৩ জন, ছাত্রদলের ৫ জন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ জন এবং শ্রমিক দলের ৪ জনসহ মোট ১৪ জন নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ও সাংগঠনিক কারণ উল্লেখ করা হলেও ভেতরে ভেতরে মিরপুরের সহিংসতা ও দখলের ঘটনার কারণেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

বহিষ্কারেও লাগাম টানা যাচ্ছে না নেতাকর্মীদের 

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে শুরু করে গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর পর্যন্ত-বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সহস্রাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে দলটি।

বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত সারাদেশে ১ হাজার ২৩ জন নেতার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫২৩ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ), ৪৩৭ জনকে বহিষ্কার, ২৪ জনের পদ স্থগিত, ৩৫ জনকে সতর্ক এবং ৪ জনকে চূড়ান্ত শৃঙ্খলাভঙ্গের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

কোথাও কোথাও দলের স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শীর্ষ নেতারাও অপরাধে জড়ানো কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও আইনি ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে সহযোগিতা করেছেন। তবে এত শাস্তির পরও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের পুরোপুরি বাগে আনা যাচ্ছে না বলে স্বীকার করছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।

এদিকে শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় পরিচয়ে অপকর্ম চালানো ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি বরিশালের গৌরনদীতে এক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে একাধিক নেতাকে দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়। অন্যদিকে জমি ও দোকান দখলের অভিযোগে সাবেক এক যুবদল নেতাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

সাম্প্রতিক সময়ে টঙ্গী ও গাছা এলাকায় তৈরি পোশাক কারখানা ঘিরে চাঁদাবাজি ও কারখানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছে একাধিক বিএনপি নেতাকর্মী। খুলনায় ব্যবসায়ী অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে মহানগর বিএনপির নেতা পিয়ারু ও সাদাতকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। চট্টগ্রামে সরকারি জমি দখল এবং সিরাজগঞ্জে চেম্বার অব কমার্স কার্যালয় দখলের অভিযোগে একাধিক নেতাকে শোকজ করা হয়েছে। নোয়াখালীতে সুনির্দিষ্ট তদন্তের পর দখল ও চাঁদাবাজিতে জড়িত তিন নেতাকে দেওয়া হয়েছে স্থায়ী অব্যাহতি।

সবশেষ ঢাকায় সোমবার রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে এক ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কড়া বার্তা

দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজি, দখল ও সন্ত্রাসের অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাফ জানিয়েছেন, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের হালনাগাদ তালিকা পুলিশের কাছে রয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে চলমান এই সাঁড়াশি অভিযান সামনে আরও জোরদার করা হবে।

রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে অপরাধীকে কেবলই অপরাধী হিসেবে দেখা হচ্ছে দাবি করে সম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘চাঁদাবাজদের তালিকা করা পুলিশের নিয়মিত কাজ। সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী, মাদক ব্যবসায়ী ও চাঁদাবাজদের তথ্য পুলিশের ডেটাবেজে সংরক্ষিত থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী তা নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়। এখানে নতুন আলাদা তালিকার বিষয় নয়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান আগেও চলেছে, এখনো চলছে এবং সামনে এটি আরো জোরদার করা হবে।’

এদিকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে সাংগঠনিক 'শুদ্ধি অভিযান' চালানোর প্রয়োজনীয়তা দেখছেন বিএনপি নেতারা।

দলটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘অন্যায়-অপকর্মে জড়ালে দল কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না। এরপরও কিছু বিপথগামী নেতাকর্মী অন্যায়ে জড়াচ্ছে, যার মধ্যে নতুন করে বিএনপিতে ভেড়া কিছু লোকও রয়েছে। তাই দলের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে ও এদের লাগাম টানতে প্রয়োজনে সারাদেশে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান চালানো দরকার।’

বিইউ/এআরএম

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর