শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ: পলাতকদের বিচার নিয়ে বিতর্ক

রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি
প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধ: পলাতকদের বিচার নিয়ে বিতর্ক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদেরসহ কয়েকজন আসামি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত সাতটি রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এসব রায়ে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ মোট ৬৮ জন আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন ২২ জন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে ১৮ জনই পলাতক, কারাগারে বন্দি মাত্র ৪ জন। এছাড়া যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৪৬ আসামিকে।

সাতটি মামলার রায় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি দণ্ড পেয়েছেন পুলিশের সাবেক সদস্যরা। তবে আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচারের যৌক্তিকতা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা ও আইন অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

সাতটি রায়ে কার কী দণ্ড

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতন হয়। এরপর ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। বিচার কার্যক্রমে গতি আনতে গত বছরের ৮ মে গঠন করা হয় ট্রাইব্যুনাল-২। বিগত ১৮ মাসে এই দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি রায় এসেছে।

প্রথম রায় (১৭ নভেম্বর ২০২৫)

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম রায়ে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১। দুজনই পলাতক।

দ্বিতীয় রায় (২৬ জানুয়ারি ২০২৬)

রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, পুলিশের সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী ও রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ্ আলম মো. আখতারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১। তিন আসামিই পলাতক।

তৃতীয় রায় (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

সাভারের আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার দায়ে ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–২। দণ্ডিতরা হলেন- সাভারের সাবেক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, আশুলিয়া থানার সাবেক ওসি এ এফ এম সায়েদ, সাবেক এসআই আবদুল মালেক, সাবেক এএসআই বিশ্বজিৎ সাহা, সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদার ও নিষিদ্ধ ঘোষিত যুবলীগের নেতা রনি ভূঁইয়া। এদের মধ্যে মালেক ও মুকুল কারাগারে থাকলেও বাকি চারজন পলাতক।

চতুর্থ রায় (৯ এপ্রিল ২০২৬)

রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–২। দুজনই কারাগারে আছেন। এছাড়া এই মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদ, সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলামসহ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

পঞ্চম রায় (২৮ জুন ২০২৬)

রাজধানীর রামপুরার বনশ্রী এলাকায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান (দ্বিতীয়বার), খিলগাঁওয়ের সাবেক এডিসি মো. রাশেদুল ইসলাম ও রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো. মশিউর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১। তিনজনই পলাতক।

ষষ্ঠ রায় (৩০ জুন ২০২৬)

জাসদ সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

সপ্তম রায় (১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা শীর্ষ নেতৃত্বের দায়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তারা হলেন- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান এবং নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। এই মামলায় মৃত্যুদণ।ডাদেশ পাওয়া সাতজনই পলাতক। 

সপ্তম রায়ে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দণ্ডিত পাঁচ নেতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রি করে জুলাই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে শহীদ পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও সবচেয়ে বেশি দণ্ডিত পুলিশ

তিনটি মামলার রায়ে মোট ১১ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যারা সবাই পুলিশের সাবেক সদস্য। এদের মধ্যে ৮ জন পলাতক ও তিনজন কারাগারে আছেন।

আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় যাবজ্জীবন সাজা পেয়েছেন সাতজন। তারা হলেন- ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক এসপি মো. আসাদুজ্জামান রিপন, সাভার সার্কেলের সাবেক অতিরিক্ত এসপি মো. শহিদুল ইসলাম, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত এসপি আবদুল্লাহিল কাফী, সাবেক পরিদর্শক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান, নির্মল কুমার দাস ও ডিবি পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন। এদের মধ্যে কাফী, শহিদুল ও আরাফাত কারাগারে আছেন।

আবু সাঈদ হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন পেয়েছেন রংপুর মহানগর পুলিশের সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান, সাবেক পরিদর্শক রবিউল ইসলাম ও সাবেক এসআই বিভূতিভূষণ রায়। তিনজনই পলাতক। এছাড়া রামপুরার মামলায় সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়াকে (পলাতক) যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে দণ্ডিতদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৪ জনই পুলিশের সাবেক সদস্য। এর মধ্যে ১১ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১১ জনের যাবজ্জীবন হয়েছে। দুটি মামলায় রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং আশুলিয়া থানার সাবেক এসআই শেখ আবজালুল হককে খালাস দেওয়া হয়েছে।

পলাতক আসামিদের বিচার: বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি যুক্তি

পলাতক আসামিদের বিচার নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রশ্ন তুলেছে। গত ১৮ আগস্ট ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির বিরুদ্ধে মামলার যুক্তিতর্কে প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম বিষয়টি ট্রাইব্যুনালের নজরে আনেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করে, আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার হলে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হয়। কারণ আসামি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান না।

এর জবাবে ট্রাইব্যুনাল-২–এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘তাহলে কী ব্যবস্থা আছে বলেন। যদি কোনো ব্যবস্থা থাকে, তাহলে ওই দিকে যাবো। না হলে এভাবেই চলবে। রাস্তাটা কী? যারা সমালোচনা করেন তাদের বলা উচিত, দিস ইজ দ্য ওয়ে আউট। তারা না দেখাতে পারলে তাদের কথা আমরা শুনব না।’

সদস্য বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ বলেন, ‘রোম সংবিধির ৬১ নম্বর ধারায় বলা আছে, অভিযুক্ত স্বেচ্ছায় আসলেন, শুনলেন। পরে যদি অভিযুক্ত না আসেন, আইনজীবীও না দেন, তখন অনুপস্থিতিতে বিচার করা যাবে। এই বিধান মানতে গেলে অপরাধীদের বিচার হবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতদের বিচার পাওয়ার অধিকার আছে।’

চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, ‘আসামিরা জেনেশুনেই ইচ্ছাকৃতভাবে পলাতক আছেন, তাই আইনে যেভাবে বিধান আছে, সেভাবেই বিচারকার্য পরিচালিত হয়েছে। এখানে মানবাধিকার সংগঠনের মন্তব্যের কোনো অবকাশ নেই।’

তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী এম লিটন আহমেদ ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগে আসামিদের অনুপস্থিতিতে বিচার ট্রাইব্যুনালের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।’

তিনি যুক্তি দেন, সাধারণ আদালতের আইনি প্রক্রিয়া আর আন্তর্জাতিক মানের ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়া এক হওয়া উচিত নয়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আসামিদের পরবর্তীতে উপস্থিত হয়ে ‘রি-ট্রায়াল’ বা পুনর্বিচারের সুযোগ থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন। স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ করা হলেও আসামিরা সরাসরি নিজেদের পক্ষে এভিডেন্স উপস্থাপন করার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

একই বিষয়ে ‘জাস্টিসইনফো ডট নেট’-এ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান লিখেছেন, লেবাননের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল (এসটিএল) ছাড়া আধুনিক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালগুলোতে অনুপস্থিত আসামির বিচারের অনুমতি নেই। এসটিএল-এ অনুমতি থাকলেও আসামি ফিরে এলে পুনর্বিচারের অধিকার এবং নিজস্ব আইনজীবী নিয়োগের অধিকার ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের আইসিটিতে পলাতক আসামির জন্য রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীর সঙ্গে আসামির কোনো যোগাযোগ থাকে না, ফলে তিনি তথ্য যাচাই বা সাক্ষ্য চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না। 

এছাড়া শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানের মামলায় একই আইনজীবীকে দুজনের পক্ষে নিয়োগ দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আদালত অবমাননার তিন মামলা

আদালত অবমাননার দায়ে এরই মধ্যে দুটি রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ২ জুলাই শেখ হাসিনাকে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ছাত্রলীগের নেতা শাকিল আকন্দ বুলবুলকে ২ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। গত ১২ এপ্রিল এম এইচ পাটোয়ারী নামের যুবলীগের এক নেতাকেও ২ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল–১।

এছাড়া ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ আখ্যা দেওয়া ও রায় নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী হাসানুজ্জামান তুষার ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হাসান চৌধুরীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলার শুনানি চলমান। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) তারা ট্রাইব্যুনাল-২ এ হাজির হলেও এক সদস্য অসুস্থ থাকায় আগামী ২৬ অক্টোবর শুনানির নতুন দিন ধার্য করা হয়েছে।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত গুম, খুন ও নির্যাতনের ঘটনায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও হচ্ছে ট্রাইব্যুনালে। হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্র্বতী সরকার ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অপরাধের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য বাংলাদেশে ২০১০ সালের মার্চে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। তখন জামায়াতের পাঁচজন এবং বিএনপির একজন- দুই দলের মোট ছয়জন শীর্ষস্থানীয় নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। 

আরএনবি/এএইচ

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর