বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ঢাকা

আদালত অবমাননা: আওয়ামীপন্থী দুই আইনজীবীর মামলার শুনানি ২৬ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৭ পিএম

শেয়ার করুন:

আদালত অবমাননা: আওয়ামীপন্থী দুই আইনজীবীর মামলার শুনানি ২৬ অক্টোবর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ আখ্যা দেওয়া দুই আইনজীবী। ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ আখ্যা দেওয়া এবং রায় নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলার শুনানি পেছানো হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের এক সদস্য অসুস্থ থাকায় আগামী ২৬ অক্টোবর শুনানির নতুন দিন ধার্য করা হয়েছে।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার পর তলব আদেশে হাজির হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ উপস্থিত হন অভিযুক্ত দুই আইনজীবী- হাসানুজ্জামান তুষার ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী।

এদিন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এই বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা ছিল।

তলব করা দুই আইনজীবীর পক্ষে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন- জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, নুরুন্নবী বুলবুল ও এ লিটন আহমেদসহ একাধিক আইনজীবী। অন্যদিকে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও জি এইচ তামিমসহ অন্যান্যরা।

এদিন এই দুই আইনজীবীকে তলবের ঘটনায় ট্রাইব্যুনাল গেইটের বাইরে শতাধিক আইনজীবীকে অবস্থান নিতে দেখা যায়।

শুনানি পেছাল যে কারণে
শুনানি শেষে প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক প্যানেলের সদস্য মনজুরুল বাসিত অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তিনি কোর্টে উপস্থিত হতে না পারায় আদালত আগামী ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করেছেন।

প্রসিকিউটর মিজানুল বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত এক আসামির রায়ের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের প্রতি কটূক্তি করে একজন আইনজীবী কর্তৃক ফেসবুক পোস্ট এবং আরেকজন আইনজীবী কর্তৃক সেটার সমর্থনে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে প্রসিকিউশন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। এর প্রেক্ষিতে কেন তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কার্যক্রম বা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে তাদের তলব করা হয়েছিল।’

নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে পারেন অভিযুক্তরা
প্রসিকিউটর মিজানুল জানান, অভিযুক্ত আইনজীবীরা ট্রাইব্যুনালের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘মনসুরুল হক সাহেবের (জ্যেষ্ঠ আইনজীবী) বক্তব্য শুনেছি। তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, ওনারা আনকন্ডিশনাল অ্যাপোলজি (নিঃশর্ত ক্ষমা) দিতেই চাচ্ছেন। কারণ ওনারা বলেছেন যে ঐ স্ট্যাটাস বা পোস্টটি ডিলিট করে দিয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, "আদালত অবমাননার কার্যক্রমে অভিযুক্তরা নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলে তা ক্ষমা করার একটা রেওয়াজ চলে আসছে। এ ক্ষেত্রে আমরাও কোনো বক্তব্য দিই নাই। অবশ্য আমাদের বক্তব্য দেওয়ার কোনো পর্যায় এখনো আসে নাই।"

ফেসবুকে যা লিখেছিলেন তারা
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ সেপ্টেম্বর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরপরই আইনজীবী হাসানুজ্জামান তুষার তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে রায়ের একটি সংবাদ শেয়ার করেন।
সেখানে তিনি লেখেন, ‘অবৈধ ক্যাঙ্গারু কোর্টের অবৈধ মিথ্যা, বানোয়াট, ভিত্তিহীন রায়ের তীব্র নিন্দা জানাই। প্রতিবাদ জানাই এবং ঘৃণা ভরে এই রায় প্রত্যাখ্যান করি। রাজপথে সবকিছুর ফয়সালা হবে।’

তার ওই স্ট্যাটাসের নিচে মোহাম্মদ হাসান চৌধুরী নামে আরেক আইনজীবী মন্তব্য করেন, ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টের অবৈধ রায়ের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এই ফরমায়েশি রায় প্রত্যাখ্যান করছি।

পরে হাসানুজ্জামান তুষার আরও একটি স্ট্যাটাস দিয়ে একই ধরনের কথা লেখেন এবং তাদের কিছু ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করেন।

এর আগে তলবের খবর প্রকাশ হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্টের আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের একাংশ এই দুই আইনজীবীর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে সংহতি প্রকাশ করেন।

নিজের দেওয়া ওই ফেসবুক স্ট্যাটাসের বিষয়টি স্বীকার করে আইনজীবী হাসানুজ্জামান তুষার আগেই জানিয়েছিলেন, ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে আইনিভাবেই বিষয়টি মোকাবিলা করবেন। এটিকে একটি ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত’ আখ্যা দিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

প্রসিকিউশন কেন ব্যবস্থা নিল
শুনানিতে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালকে জানানো হয়, রায় নিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ এমনকি আইনজীবীরাও ফেসবুকে মন্তব্য করেছেন। চিফ প্রসিকিউটরের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রসিকিউশন সাধারণত এসব সমালোচনা উপেক্ষা করে থাকে। কিন্তু এই দুই আইনজীবীর বিষয়টি ধর্তব্যে নেওয়া হয়েছে, কারণ তারা আইন জানেন।

এ বিষয়ে প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম বলেন, ‘তারা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। একটা রায়ের বিরুদ্ধে বা আদালতের বিরুদ্ধে কী বলা যায় বা যায় না—এটা ওনারা জানেন। এই ফেসবুক স্ট্যাটাসটি অনেক শেয়ার ও কমেন্ট হয়েছে।’

ব্যবস্থা নেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষ যখন দেখবে একজন আইনজীবী একটা আদালত সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য প্রকাশ করছেন, তখন তাদের মনে হতে পারে যে এটি বৈধ। মানুষের কাছে যেন এই বিভ্রান্তি পৌঁছে না যায়, সেজন্যই আমরা ট্রাইব্যুনালের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।’

প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালকে আরও জানায়, হাসানুজ্জামান তুষার ট্রাইব্যুনালকে ‘অবৈধ ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ এবং রায়কে ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলার পাশাপাশি ‘রাজপথে ফয়সালা’ করার কথা বলে হুমকি দিয়েছেন।

আইনে যা আছে
আবেদনে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ১১(৪) ধারার কথা উল্লেখ করেছে প্রসিকিউশন।

এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালের কোনো কার্যক্রমে বাধা দিলে, কোনো পক্ষ বা সাক্ষীকে হুমকি দিলে অথবা আদালত অবমাননার শামিল কোনো কাজ করলে বা ট্রাইব্যুনালের রায় অমান্য করলে ট্রাইব্যুনাল তাকে এক বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার আদেশ দিতে পারবেন।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশনের এক আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ অভিযুক্ত দুই আইনজীবীকে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

আরএনবি/এমআই

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর