জুলাই আন্দোলনে ইট-লাঠির জবাবে মারণাস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ‘মগজ উড়িয়ে দেওয়া’ কোনোভাবেই আত্মরক্ষা হতে পারে না বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন। অন্যদিকে, রাষ্ট্রনিযুক্ত আসামি পক্ষের দাবি, ওবায়দুল কাদেরসহ আসামিদের বিরুদ্ধে সরাসরি হত্যার নির্দেশ বা জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ প্রসিকিউশন দিতে পারেনি, ফলে তারা খালাস পাবেন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (CAV) রেখেছেন।
শুনানি শেষে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম বলেন, স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরা দাবি করেছেন যে আন্দোলন ঠেকাতে গিয়ে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ হয়েছে এবং তারা ‘প্রোপোরশনেট ফোর্স’ বা আনুপাতিক বলপ্রয়োগ করেছেন। কিন্তু আমরা দেখিয়েছি যে আন্দোলনকারীদের হাতে ছিল কেবল ইট-লাঠি। এর বিপরীতে মারণাস্ত্র ব্যবহার করে গুলি চালিয়ে মগজ উড়িয়ে দেওয়া কখনোই প্রোপোরশনেট হতে পারে না। এটা তারা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে করেননি।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩-এর ২ ধারায় হত্যা যেমন অপরাধ, তেমনি হত্যায় সহায়তা, নির্দেশ, উসকানি বা ষড়যন্ত্র করাও পৃথক অপরাধ। যারা মাঠপর্যায়ে হত্যা করেছে তারা যেমন দায়ী, তেমনি ‘মারো না কেন, পিটাও না কেন, ছাত্রলীগই যথেষ্ট’— এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যারা অপরাধ সংঘটিত করেছেন, তারাও সমান অপরাধী। কারণ আমাদের আইনে এসব অপরাধের শাস্তি সমান।
জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ নিয়ে আইনি ব্যাখ্যায় তামিম বলেন, একাধিক ব্যক্তি একই উদ্দেশ্যে আন্দোলন দমনে সম্পৃক্ত থাকলে প্রত্যেকেই অপরাধী হবেন। বসনিয়ার একটি গ্রামের মামলার নজির টেনে আমরা ট্রাইব্যুনালে যুক্তি দিয়েছি যে, উদ্দেশ্য যাই থাকুক, মাঠপর্যায়ে যদি অপরাধ সংঘটিত হয়, তবে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে যারা ছিলেন তারাও সমভাবে দায়ী হবেন।
অন্যদিকে আসামিদের খালাস পাওয়ার আশা প্রকাশ করে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম ও ব্যারিস্টার ইসরাত জাহান অনি পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন।
ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী এম হাসান ইমাম বলেন, মামলায় মোট ২৮ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে ১৬ জন ফরমাল সাক্ষী এবং বাকি ১২ জন প্রত্যক্ষ সাক্ষী। কিন্তু সাক্ষীদের কেউই ওবায়দুল কাদের বা অন্য আসামিদের গুলি বা হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত করে কোনো সাক্ষ্য দেননি।
কমান্ড রেসপনসিবিলিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওবায়দুল কাদের কোনো যুদ্ধের কমান্ডার ছিলেন না, তিনি ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক। আন্দোলন দমনে যেসব আদেশ-নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলো শেখ হাসিনার কাছ থেকেই এসেছে। ওবায়দুল কাদের বা আরাফাতকে এ ঘটনায় দায়ী করা যায় না। তারা খালাস পাওয়ার যোগ্য।
যুবলীগ ও ছাত্রলীগের চার নেতার (পরশ, নিখিল, সাদ্দাম ও ইনান) পক্ষে আইনজীবী ইসরাত জাহান অনি বলেন, আমার চার আসামি আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতাকে হত্যার কোনো নির্দেশ দেননি। তাদের বিরুদ্ধে হত্যায় সহায়তা, প্ররোচনা বা উসকানি দেওয়ারও কোনো প্রমাণ নেই। প্রসিকিউশন অভিযোগগুলো ‘বিয়ন্ড রিজনেবল ডাউট’ বা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই তাদের খালাস দেওয়ার আবেদন জানিয়েছি।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন— আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। তারা সবাই বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
আরএনবি/এফএ




