জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে হামলার ঘটনায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ সাত নেতার সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায় তুলে ধরেছে প্রসিকিউশন।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ মামলার পঞ্চম দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের একটি ফোনালাপ বাজিয়ে শোনানো হয়।
ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে এই কল রেকর্ড প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার যুক্তিতর্কের পঞ্চম দিনে অডিও রেকর্ডটি উপস্থাপন করা হয়। এদিন প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম অডিও রেকর্ড ও সিআইডির ফরেনসিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন।
প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, যুবলীগের সভাপতি শেখ পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের দায়বদ্ধতা আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই চার নেতা সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের কর্মীদের সশস্ত্রভাবে রাস্তায় নামিয়েছিলেন এবং নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ চালিয়েছিলেন বলে তারা আদালতে দেখিয়েছেন।
আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণ অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ পরশের মধ্যে টেলিফোনে কথোপকথন হয়। ওই সময় পরশ দেশের বাইরে থাকলেও নিয়মিত কর্মীদের নির্দেশনা দিচ্ছিলেন বলে অডিওতে শোনা যায়।
কথোপকথনের একপর্যায়ে ওবায়দুল কাদের পরশকে জিজ্ঞেস করেন, কাকা, তুমি তো খালি বাইরে বাইরে থাকলে কেন? জবাবে পরশ বলেন, আমি বাইরে থাকলেও আমি সার্বক্ষণিক প্রতিটা ঘণ্টায় আপনাদের সঙ্গে... আমি টেলিফোনে তাদের নিয়মিত নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছি।
পরবর্তী কর্মসূচিতে সর্বোচ্চ উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের। জবাবে পরশ বলেন, হ্যাঁ, আমরা ওটার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি এখনই ফোন দিচ্ছি সব জায়গায়।
প্রসিকিউটর জি এইচ তামিম জানান, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অডিও রেকর্ডটি সংগ্রহ করেছেন। পরে সিআইডিতে এর ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়। ফরেনসিক মতামতে কথোপকথনের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, এই কথোপকথন থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ পরিকল্পিতভাবে এবং সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিরপরাধ ছাত্র-জনতার ওপর আক্রমণ চালিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে। তারা শীর্ষ নেতৃত্বে থাকায় এই অপরাধের দায় সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি হিসেবে তাদের ওপর বর্তায়।
পরশ ও কাদেরের কথোপকথন
পরশ: হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম, কাকা।
ওবায়দুল কাদের: কাকা, তুমি তো খালি বাইরে বাইরে থাকলে কেন?
পরশ: না, আমি আসছি তো। আমি বাইরে থাকলেও আমি সার্বক্ষণিক প্রতিটা ঘণ্টায় আমি আপনাদের সঙ্গে। আপনি সেক্রেটারিকেও দেখতে পারেন। আপনি জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন, আমি তো অনেক আগেই গেছি, চাচা। আমি গেছি ২৫ তারিখ। কিন্তু তারপরেও প্রত্যেকটা দিন আমি আপনাদের সঙ্গে ছিলাম।
ওবায়দুল কাদের: দেশের বাইরে তো আর ফিজিক্যালি... ফিজিক্যালি থাকা ভিন্ন।
পরশ: জি, বলুন, আবার বলুন?
ওবায়দুল কাদের: ফিজিক্যালি থাকাটা হলো—
পরশ: হ্যাঁ, না, তা তো অবশ্যই। তা তো অবশ্যই। সেই জন্য চলে আসছি। অবশ্যই, অবশ্যই, অবশ্যই।
ওবায়দুল কাদের: এখন কালকের র্যালিতে ম্যাক্সিমাম যাতে প্রেজেন্স থাকে।
পরশ: হ্যাঁ, আমরা ওটার প্রস্তুতি নিচ্ছি। জি, অবশ্যই।
ওবায়দুল কাদের: এই জন্য তোমাকে ফোন করেছি।
পরশ: না না, থ্যাংক ইউ। ঠিক আছে। জি, আমি ফোন দিচ্ছি সব জায়গায়। জি, জি, জি, চাচা। থ্যাংক ইউ।
ওবায়দুল কাদের ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনান। আসামিরা সবাই পলাতক।
বর্তমানে মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। এর আগে গত ২ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়।
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
আরএনবি/এআর




