গত প্রায় এক যুগ আগে রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে হাসিনা-আজিজ-বেনজীরসহ ৩১ জনের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও ১০ জনকে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন।
প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে অভিযোগ তুলে ধরেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি এই মামলায় আনা দুটি অভিযোগ তুলে ধরেন। এর মধ্যে প্রথম অভিযোগে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে ঢাকায় ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা আনা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে আনা হয়েছে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনা।
শুনানি শেষে অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেফতারকৃতদের আগামী ১৬ আগস্ট হাজিরের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, মঈনুল করিম, জহিরুল আমিন, তারেক আবদুল্লাহ, মার্জিনা রায়হানসহ অন্যরা।
শেখ হাসিনা ছাড়া অপর আসামিরা হলেন— তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, সাংবাদিক ফারজানা রুপা, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দফতর ও প্রশাসন) মো. আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এস এম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বি এম ফরমান আলী।
বর্তমানে এই মামলায় গ্রেফতার রয়েছেন— ডা. দীপু মনি, শামসুল হক টুকু, জিয়াউল আহসান, এ কে এম শহিদুল হক, শাহরিয়ার কবির, আবদুল জলিল মণ্ডল, ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবু।
অন্য মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন হাসানুল হক ইনু। এ ছাড়া আবদুর রাজ্জাকও গ্রেফতার আছেন। বাকিরা পলাতক।
এর আগে এদিন বেলা পৌনে ১১টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেন প্রসিকিউশন।
শাপলা চত্বরে নারকীয় এই ঘটনাকে বর্বর ও অমানবিক আখ্যায়িত করে চিফ প্রসিকিউটর জানান, ঘটনাটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ ছিল। সরকারের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
তিনি ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে জানান, এই ঘটনায় তারা ৫৮ জন নিহতের সন্ধান পেয়েছে। এর মধ্যে নাবালক তিন জন। এই ঘটনায় পুলিশ-র্যাব-বিজিবি ঐ রাতের ঘটনায় নিজেরা আলাদা আলাদা অপারেশনের নাম নির্ধারণ করে অভিযান চালান বলেও দাবি তার।
চিফ প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালে বলেন, এমনকি শাপলা চত্বরে গ্রেনেড, মারণাস্ত্র ব্যবহারের জন্য মন্ত্রী-প্রশাসনের একটি বৈঠকও হয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিশুসহ হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের হত্যা করা হয়। ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে আনা দুটি অভিযোগ আমলে নেওয়া হোক।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ঢাকাসহ চারটি স্থানে মোট ৫৮ জন নিহতের পরিচয় শনাক্ত করেছে তদন্ত সংস্থা। এর মধ্যে ঢাকাতেই ৩২ জন নিহত হন। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে ২০ জন, চট্টগ্রামে ৫ জন এবং কুমিল্লায় একজন নিহতের তথ্য মিলেছে।
২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ১৩ দফা দাবিতে অবস্থান নিয়েছিল হেফাজতে ইসলাম। গভীর রাতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান চালানো হয়।
আরএনবি/এফএ




