পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল হলে ‘বাকশাল’ ব্যবস্থাপনায় ফিরে যাব বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত আপিল মামলার শুনানিতে অংশ নিয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি।
শিশির মনির বলেন, ‘পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী যদি আপিল বিভাগ বাতিল করে দেন, তাহলে আমরা অনিবার্যভাবে ‘বাকশাল’ ব্যবস্থাপনায় ফিরে যাব। আমাদের বিচার বিভাগ বা দেশের জনগণ একদলীয় সিস্টেমে ফিরে যেতে রাজি নয়। তাই সব কিছু বাতিল করে দিলে গণতন্ত্র বলতে আর কিছু থাকবে না।’
পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল না করে, আংশিক বাতিলের পক্ষে মত দেন তিনি।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে ‘সংবিধান পুনর্লিখন’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী বা রাজনৈতিক বিষয়গুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। আদালতের কাজ কেবল সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামোর’ সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি করা।’
প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে দীর্ঘ ছয় মাস পর সোমবার থেকে এই সাংবিধানিক বিতর্কের শুনানি ফের শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে শুনানি শেষ করেন আইনজীবী শরীফ ভুঁইয়া। এরপর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন শিশির মনির।
এ ছাড়া এদিন মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেনের পক্ষে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির পক্ষে আইনজীবী এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিকী শুনানিতে অংশ নেন।
আজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক এবং আরশাদুল রউফ উপস্থিত ছিলেন। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপক্ষ এখনও তাদের আইনি যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেনি।
আদালত ও সংসদের ক্ষমতার সীমারেখা টেনে এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ‘আদালত কখনো ‘সুপার লেজিসলেটর’ বা আইনপ্রণেতার ভূমিকা পালন করতে পারে না। রাজনৈতিক বা নীতি-নির্ধারণী বিতর্কে জড়ানো আদালতের কাজ নয়। সরকার ও বিরোধী দল সংসদে বিতর্ক করে ঠিক করবে কোনটি সঠিক আর কোনটি বেঠিক।’
পঞ্চদশ সংশোধনীর বিষয়গুলোকে ‘রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি’ এবং ‘সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ’—এই দুই ভাগে ভাগ করে আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে জামায়াত।
শিশির মনির বলেন, ‘অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১০, ১১, ১২ এবং ২৫ এর ২-এ যা আছে, সেগুলো মূলত নীতি-নির্ধারণী ব্যাপার। একটি রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সমাজতন্ত্র থাকবে কি থাকবে না—এই সিদ্ধান্ত আদালত নেবে না, নেবে পার্লামেন্ট। এগুলোকে বলা হয় ‘পোলস্টার’ বা গাইডিং প্রিন্সিপাল। এগুলো সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত।”
অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে বিষয়গুলো ‘বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন’ বা সংবিধানের মূল নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করা—সেগুলোর ব্যাপারে উচ্চ আদালত রায় প্রদান করবে। কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকলে গণতন্ত্র থাকে না, আর গণতন্ত্র না থাকলে রাষ্ট্র ব্যাহত হয়।’
অতীতের উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘যখনই রাজনৈতিক বিতর্ক আদালত সেটেল করতে গিয়েছে, তখনই আদালত নিজেই বিতর্কিত হয়েছে। বিচার বিভাগ তার সীমানার বাইরে গিয়ে দায়িত্ব পালন করলে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের ব্যালেন্স (ভারসাম্য) নষ্ট হবে।’
গত বছরের ১৯ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিল হাইকোর্ট। পরবর্তীতে বিভিন্ন পক্ষ এই রুলে যুক্ত হয়।
চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট এক রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণা করে।
ওই রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত ২০ ও ২১ ধারা, অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকে রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা ৭(ক) অনুচ্ছেদ, মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য করার ৭(খ) অনুচ্ছেদ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়ে বাতিল করা হয়। পাশাপাশি গণভোট বাতিলসংক্রান্ত ৪৭ ধারা বাতিল করে সংবিধানে ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয়।
তবে হাইকোর্ট পুরো আইনটি বাতিল না করে, বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদকে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন বা পরিমার্জনের সুযোগ দেয়।
হাইকোর্টের ওই রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফেরার পথ তৈরি হলেও, পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে আপিল বিভাগে যায় রিটকারী পক্ষ। এই মামলায় পক্ষভুক্ত হয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও আলাদাভাবে আপিল করেন। বর্তমানে এই তিনটি আপিলের শুনানিই একসঙ্গে চলছে আপিল বিভাগে।
আরএনবি/এমআই




