পাস্পারিক ভালোবাসা আর যত্ন একটি সম্পর্ককে আরও গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলে। তবে কখনো কখনো সম্পর্কের মানসিক ও সামাজিক দায়িত্বটা আর পারস্পারিক থাকে না, হয়ে যায় একতরফা। তখন সম্পর্কের ভার একজনের কাঁধে বেশি পড়ে, বিশেষ করে নারীদের উপর। আর অপরজন, মানে পুরুষ সঙ্গী দায়িত্ব এড়িয়ে যান। সাম্প্রতিক সময়ে সমাজবিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের দুনিয়ায় সম্পর্কের এই অবস্থাটি ‘ম্যানকিপি’ হিসেবে বেশ চর্চিত।
ম্যানকিপিং কী

স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক অ্যাঞ্জেলিকা ফেরেরা এই ধারণাটি প্রথম সামনে আনেন। তিনি বলেন, ম্যানকিপিং মূলত সম্পর্কের অদৃশ্য এক মানসিক ও সামাজিক শ্রম। এই শ্রম নারীরা তাদের পুরুষ সঙ্গীর জন্য একতরফাভাবে দিয়ে থাকেন। মানে, একজন নারী অবচেতনভাবেই তার পুরুষ সঙ্গীর আবেগ, মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক জীবন একাই পরিচালনা করতে বাধ্য হন। কারণ সঙ্গীটি সে দায়িত্ব এড়িয়ে যান। এই অবস্থাকেই বলা হয় ‘ম্যানকিপিং’।
আরও পড়ুন: প্রিয়জনের পাশে বসেও ফোনের স্ক্রিনে চোখ- ফাবিংয়ে ভুগছেন না তো?
ম্যানকিপিং ঘর গোছানো বা রান্না করার মতো শারীরিক কোনো শ্রম নয় যা দৃশ্যমান। এটি নারীর উপর সম্পূর্ণ একটি মানসিক চাপ। প্রতিনিয়তই আমাদের চারপাশে এমন অনেক ঘটনা ঘটছে যা আদতে স্বাভাবিক মনে হলেও আসলে তা ম্যানকিপিংয়েরই অংশ-

অদৃশ্য থেরাপিস্ট: সহজাতভাবেই পুরুষেরা মনের কথা সহজে কথা বলতে পারেন না। ফলে নারীকে থেরাপিস্টের মতো নানা উপায়ে সঙ্গীর সেসব না বলা কথা বের করে আনতে হয় যা মানসিকভাবে তাকে ক্লান্ত করে ফেলে।
আরও পড়ুন: ভুক্তভোগী নিজেই কেন টক্সিক আচরণ করেন?
সামাজিকতার চাপ: অধিকাংশ সম্পর্কেই নারীকে পুরুষের ব্যক্তিগত দায়িত্বগুলোও পালন করতে দেখা যায়। যেমন পুরুষ সঙ্গীর পরিবার বা বন্ধুদের জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী বা অন্যান্য অনুষ্ঠান কবে, কাকে কখন শুভেচ্ছা জানাতে হবে বা কী ধরনের উপহার দিতে হবে সেসব দায়িত্বও নারীর ঘাড়ে চাপানো হয়।এ বিষয়ে পুরুষ কোনো দায়িত্বই নিতে চান না।

আবেগের ভার: অনেক পুরুষ তাদের সব ধরণের মানসিক চাপ বা হতাশার কথা শুধু স্ত্রীর কাছেই বলেন। ফলে নারী সঙ্গীটিকে নিজের মানসিক চাপের পাশাপাশি তোর সঙ্গীর বিষন্নতাও বয়ে বেড়াতে হয়।
আরও পড়ুন: আপনিও কি প্যাসেঞ্জার পেরেন্টের শিকার? জেনে নিন পরিত্রাণের উপায়
ম্যানকিপিংয়ের পেছনে আমাদের সামাজিক কাঠামোকেই বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কেননা, সমাজই পুরুষকে ‘আবেগহীন’ হতে শেখায় আর নারীকে শেখায় ‘অতিরিক্ত যত্নশীল’ ও ‘সহনশীল’ হতে। ফলে নারী প্রতিনিয়তই অতিরিক্ত মানসিক চাপ বহন করে চলে এবং ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। এই একতরফা মানসিক শ্রমের কারণে একসময় নারীদের মধ্যে ‘ইমোশনাল বার্নআউট’ বা চরম মানসিক অবসাদ তৈরি হয় যা সম্পর্কের প্রতি তাদের আগ্রহ হারিয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী।

সমাধান: এই অদৃশ্য দেয়াল ভাঙতে প্রয়োজন খোলামেলা আলোচনা। পুরুষ সঙ্গীদের আবেগ প্রকাশে উৎসাহ দিতে হবে। সামাজিক দায়িত্ব ও যোগাযোগের বিষয়গুলো দুজনে মিলে ভাগ করে নিতে হবে।
ভালোবাসা মানে একে অপরের পাশে থাকা। তার মানে এই নয় যে একজনের মানসিক বোঝার পুরোটাই অন্যজনকে বয়ে বেড়াতে হবে। সমতাই সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ করে।
এএ




