শিক্ষার লক্ষ্য কি শুধু চাকরি পাওয়া, নাকি মানুষকে কর্মজীবনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত করা? ডিগ্রি অর্জনের পরও দক্ষতার ঘাটতি ও কর্মসংস্থান সংকটের বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে। প্রচলিত ‘চাকরিমুখী শিক্ষা’ ধারণা কি যথেষ্ট, নাকি প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি’ এ নিয়েই কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা মেইলের নিজস্ব প্রতিবেদক মাহফুজুর রহমান।
ঢাকা মেইল: ‘চাকরিমুখী শিক্ষা’ ধারণাটি কীভাবে দেখছেন?
বিজ্ঞাপন
অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান: আমাদের সমাজে সাধারণভাবে মনে করা হয়, শিক্ষা অর্জনের মূল উদ্দেশ্য চাকরি পাওয়া। কিন্তু এই ধারণাটি খুব সীমিত। কর্মজীবন মানে শুধু সরকারি বা বেসরকারি চাকরি নয়, উদ্যোক্তা হওয়াও এর অংশ। একজন শিক্ষার্থী শিক্ষা শেষে নিজেই কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে। তাই শিক্ষার লক্ষ্য এমন হওয়া উচিত, যা মানুষকে কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করবে, শুধু চাকরির জন্য নয়।
ঢাকা মেইল: শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকার পরেও অনেক তরুণের কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়ার কারণ কী?
অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান: এখন শুধু ডিগ্রি থাকলেই চাকরি পাওয়া সহজ নয়। বাস্তব দক্ষতা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমাদের দেশে অনেকেই অনার্স-মাস্টার্স পাস করেও চাকরি পাচ্ছেন না। কারণ তাদের শিক্ষার সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনীয় দক্ষতার মিল নেই। আবার অনেকে এমন চাকরি করছেন, যার সঙ্গে তাদের পড়াশোনার সরাসরি সম্পর্ক নেই। তাই শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা জরুরি।
ঢাকা মেইল: সব বিষয়ে পড়াশোনা কি চাকরিমুখী হওয়া উচিত?
বিজ্ঞাপন
অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান: সব শিক্ষা চাকরিমুখী হতে পারে না। কিছু বিষয় নির্দিষ্ট পেশার জন্য প্রস্তুত করে। যেমন ব্যাংকিং বা বিজনেস স্টাডিজে পড়লে ব্যবসা বা ব্যাংকিং খাতে কাজের সুযোগ বেশি থাকে। আবার ইংরেজি, দর্শন বা ইতিহাসের মতো বিষয় মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানসিক বিকাশে বড় ভূমিকা রাখে। এসব বিষয় সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট চাকরির জন্য তৈরি করে না। তাই শিক্ষাকে শুধু চাকরির মানদণ্ডে বিচার করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হারিয়ে যাবে।
ঢাকা মেইল: শিক্ষার মূল লক্ষ্য কী হওয়া উচিত?
অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান: শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সামগ্রিক বিকাশ। মানসিক বিকাশ, শারীরিক বিকাশ, চিন্তাশক্তি, মূল্যবোধ সবকিছুই শিক্ষার অংশ। যদি শুধু চাকরিমুখী শিক্ষা হয়, তাহলে দর্শন, ইতিহাস বা সাহিত্য পড়ার গুরুত্ব কমে যাবে। অথচ এসব বিষয় মানুষকে চিন্তাশীল ও মানবিক করে তোলে।
ঢাকা মেইল: সব শিক্ষার্থীর অনার্স বা মাস্টার্স পড়ার যৌক্তিকতা কতটুকু?
অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান: না, সবাইকে অনার্স বা মাস্টার্স পড়তে হবে এমন কোনো কথা নেই। একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা বাধ্যতামূলক হতে পারে। এরপর শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ও দক্ষতা অনুযায়ী কারিগরি বা পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো দরকার। কেউ যদি মাছ চাষ করতে চায়, তাকে সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। কেউ ড্রাইভার হতে চাইলে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নিতে পারে। সব পেশারই মূল্য আছে।
ঢাকা মেইল: বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার বড় সমস্যা কোথায়?
অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান: সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট নয়। একজন শিক্ষার্থী কেন পড়বে, কী ধরনের জীবন বা পেশার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দরকার। আমাদের দেশে অনেক উচ্চশিক্ষিত তরুণ বিদেশে গিয়ে অদক্ষ শ্রমিকের কাজ করছেন। এর মানে শিক্ষা ও কর্মদক্ষতার মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে।
ঢাকা মেইল: এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কী হতে পারে?
অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান: শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবতার সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত করতে হবে। একদিকে সাধারণ শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। সবাইকে একই ধরনের শিক্ষার পথে না নিয়ে গিয়ে যোগ্যতা ও আগ্রহ অনুযায়ী বিভিন্ন পথ তৈরি করা প্রয়োজন। তাহলেই শিক্ষা সত্যিকারের অর্থে কর্মজীবন ও জীবনের জন্য কার্যকর হবে।
এম/এমআর




