দেশের বাজারব্যবস্থা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ভেজাল, প্রতারণামূলক বাণিজ্য এবং সিন্ডিকেটের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক এস এম নাজের হোসাইন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে সরব থেকেছেন এবং ভোক্তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়মিত মতামত তুলে ধরছেন।
বর্তমানে তিনি কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সহ-সভাপতি এবং আইএসডিই বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন ভাড়া, খাদ্য নিরাপত্তা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা—এসব বিষয়ে তার ধারাবাহিক বক্তব্য গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। তিনি মনে করেন, দেশে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রায়ই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থের পরিবর্তে সীমিতসংখ্যক ব্যবসায়ীর স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ ক্রমশ অসহায় হয়ে পড়ছে এবং বাজারে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্যাবের প্রধান কার্যালয়ে ঢাকা মেইলকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ভোক্তা অধিকার, বাজার সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ, পৃথক ভোক্তা মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ঢাকা মেইলের নিজস্ব প্রতিবেদক মহিউদ্দিন রাব্বানি।
ঢাকা মেইল: আমাদের দেশের ভোক্তারা পদে পদে ঠকছেন—বিষয়টি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
এস এম নাজের হোসাইন: বাংলাদেশের ভোক্তারা বর্তমানে একটি কঠিন বাস্তবতার মধ্যে রয়েছেন। প্রতিদিনই তারা পণ্য ও সেবাখাতে নানা ধরনের প্রতারণা, অতিরিক্ত মূল্য আদায়, মানহীন পণ্য সরবরাহ এবং সেবার ক্ষেত্রে অবহেলার শিকার হচ্ছেন। কিন্তু এসব সমস্যার প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—ভোক্তাদের পক্ষে শক্তভাবে কথা বলার মতো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অনেক ক্ষেত্রে যথেষ্ট সক্রিয় নয়, আবার কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে। আমরা দেখছি, ভোগ্যপণ্যের বাজারে ছোট ছোট অনিয়ম ধীরে ধীরে বড় অপরাধে পরিণত হচ্ছে। পেঁয়াজ, চিনি, সয়াবিন তেলের মতো পণ্যে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা অন্য ব্যবসায়ীদের মধ্যেও একই প্রবণতা তৈরি করছে। ফলে বাজারে এক ধরনের নেতিবাচক সংস্কৃতি জন্ম নিচ্ছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নীতিনির্ধারণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ব্যবসা পেশার সঙ্গে যুক্ত। এতে করে অসাধু ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা দেখা দেয়। একজন সাধারণ মানুষের আয় যখন স্থির থাকে, কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বারবার বাড়ে—তখন তার পারিবারিক বাজেট ভেঙে পড়ে। এই অবস্থায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় প্রশ্ন হওয়া উচিত—১৮ কোটি মানুষের স্বার্থ দেখা হবে, নাকি ১–২ লাখ ব্যবসায়ীর? বাস্তবে দেখা যায়, ব্যবসায়ীদের প্রভাব বেশি থাকায় তাদের স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে ভোক্তারা ক্রমেই অসহায় হয়ে পড়ছেন।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মেইল: বাজারে সিন্ডিকেটের কারণ কী? নিয়ন্ত্রণে আপনার পরামর্শ কী?
এস এম নাজের হোসাইন: আমরা যখন বাজার সিন্ডিকেটের কথা বলি, তখন প্রায়ই বলা হয়—সিন্ডিকেট নেই। কিন্তু এই অস্বীকারই সিন্ডিকেটকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। সিন্ডিকেট কোনো দৃশ্যমান কাঠামো নয়। এটি বোঝা যায় বাজারের আচরণ থেকে। যেমন—দেশের এক প্রান্তে দাম বাড়লে একই সময়ে অন্য প্রান্তেও দাম বেড়ে যায়। টেকনাফে বাড়লে তেঁতুলিয়াতেও বাড়ে। এটি বাজারের স্বাভাবিক আচরণ নয়—এটি সমন্বিত প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার সত্যিই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতে চায় কি না। অনেক সময় দেখা যায়, সরকার নিজেই সিন্ডিকেটের চাপে পড়ে যায় বা কখনো কখনো স্বেচ্ছায় ছাড় দেয়। কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন প্রয়োগ করা হলে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে গেলে সমস্যার সমাধান হয় না—বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
আরও পড়ুন
সিন্ডিকেটের খপ্পরে ভোজ্যতেলের বাজার
ঢাকা মেইল: সড়কে চাঁদাবাজির অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়ানো হয়—বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?
এস এম নাজের হোসাইন: পণ্যের দামের ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—বগুড়ায় ২০ টাকার সবজি ঢাকায় এসে ১০০ টাকা হয়ে যায়। চাঁদাবাজি অবশ্যই একটি সমস্যা। তবে অনেক সময় এটি একমাত্র কারণ নয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ইস্যুকে বড় করে দেখিয়ে মূল্যবৃদ্ধির যৌক্তিকতা তৈরি করার চেষ্টা করেন। আমরা বলছি না যে সড়কে চাঁদাবাজি নেই। কোথাও কোথাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বা পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু কোথায় কতটা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে—তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা দরকার। চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অযৌক্তিকভাবে দাম বাড়ানোর সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে। এতে ভোক্তারা সরাসরি উপকৃত হবেন।
ঢাকা মেইল: ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে কী পদক্ষেপ প্রয়োজন?
এস এম নাজের হোসাইন: প্রথমত, ভোক্তাদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের দেশে ব্যবসায়ী সংগঠনের বক্তব্য দ্রুত বিবেচনায় নেওয়া হয়, কিন্তু ভোক্তাদের বক্তব্য অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—আঞ্চলিক সড়ক পরিবহন কমিটিতে ১১ সদস্যের মধ্যে ৪–৫ জনই ব্যবসায়ী প্রতিনিধি। সেখানে ১৮ কোটি ভোক্তার প্রতিনিধি মাত্র একজন। এই কাঠামোয় ভোক্তাদের স্বার্থ স্বাভাবিকভাবেই দুর্বল অবস্থানে থাকে। নীতিনির্ধারণের প্রতিটি পর্যায়ে ভোক্তাদের সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে নিরপেক্ষ রেফারির ভূমিকা পালন করতে হবে। ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—দুই পক্ষই থাকবে, কিন্তু সরকার থাকবে ভারসাম্য রক্ষার দায়িত্বে।
ঢাকা মেইল: ভোক্তার অধিকার রক্ষার্থে সরকারের প্রতি আপনার প্রধান পরামর্শ কী?
এস এম নাজের হোসাইন: আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তা স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানিয়ে আসছি। বর্তমানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান কাজ ব্যবসা প্রসার করা। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কাজ ভোক্তার অধিকার রক্ষা করা। এই দুটি দায়িত্বের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই একটি কাঠামোগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা হলে ভোক্তাদের সমস্যাগুলো দ্রুত নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে পৌঁছানো সহজ হবে এবং বাস্তবসম্মত সমাধান নেওয়া সম্ভব হবে। পার্শ্ববর্তী অনেক দেশেই এমন ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশেও সময় এসেছে এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার।
ঢাকা মেইল: নতুন সরকারের কাছে ভোক্তা অধিকার বিষয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?
এস এম নাজের হোসাইন: বর্তমানে বাজারে অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে দাম বাড়ানো হচ্ছে। সরকার চাইলে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। দাম বাড়ানোর আগে যৌক্তিকতা যাচাই এবং আলোচনার সংস্কৃতি তৈরি করা প্রয়োজন। বাজার তদারকি মানে ব্যবসায়ীকে হয়রানি করা নয়। বরং এটি নিশ্চিত করা—পণ্যের দাম যৌক্তিক কি না, ওজনে কম দেওয়া হচ্ছে কি না, মান বজায় রাখা হচ্ছে কি না। কোনো ভোক্তা প্রতারিত হলে তার প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরাও যাতে ন্যায্য পরিবেশে ব্যবসা করতে পারেন—সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আচরণ করতে হবে। কেউ অপরাধ করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই বাজারে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা হবে এবং ভোক্তা ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।
এমআর/জেবি

